ঢাকা,  শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, কার্তিক ৭ ১৪৩৩

বিদেশি বিনিয়োগের হিসাবে প্রবৃদ্ধি, বাস্তবে কী ঘটছে?

বিনিয়োগ

ডিএসজে প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২১:১৭,১১ অক্টোবর ২০২৬

আপডেট: ২০:৫২,১২ অক্টোবর ২০২৬

সর্বশেষ

বিদেশি বিনিয়োগের হিসাবে প্রবৃদ্ধি, বাস্তবে কী ঘটছে?

ডিএসজে

বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে—পরিসংখ্যান বলছে এমনটাই। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধির আড়ালে রয়েছে ভিন্ন চিত্র। নতুন বিদেশি মূলধন আসছে কম, বাড়ছে আগে থেকেই দেশে ব্যবসা করা বিদেশি কোম্পানিগুলোর মুনাফা পুনর্বিনিয়োগ। ফলে মোট বিনিয়োগের অঙ্ক বাড়লেও নতুন পুঁজি আকর্ষণে দুর্বলতা কাটছে না। উল্টো সর্বশেষ তিন মাসে মোট নিট বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ২২ শতাংশের বেশি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের (এফডিআই) পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে এই বৈপরীত্য উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে দেশে নিট বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ৩৪ কোটি ৬৯ লাখ ৪০ হাজার ডলার। এক বছর আগে একই সময়ে এসেছিল ৩০ কোটি ৭৬ লাখ ২০ হাজার ডলার।

অর্থাৎ বার্ষিক হিসাবে বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে ১২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। কিন্তু আগের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকের সঙ্গে তুলনা করলে চিত্র উল্টো। ওই সময়ে নিট এফডিআই ছিল ৪৪ কোটি ৭৩ লাখ ১০ হাজার ডলার। তিন মাসের ব্যবধানে তা কমেছে ১০ কোটি ৩ লাখ ৭০ হাজার ডলার বা ২২ দশমিক ৪৪ শতাংশ।

বিদেশি বিনিয়োগের এই হিসাব মূলত তিনটি অংশ নিয়ে তৈরি—ইক্যুইটি মূলধন, পুনর্বিনিয়োগকৃত মুনাফা এবং আন্তঃকোম্পানি ঋণ। কোন খাত থেকে কত অর্থ আসছে, তা বিশ্লেষণ করলেই সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির প্রকৃত চিত্র পরিষ্কার হয়।

এর মধ্যে ইক্যুইটি হলো বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সরাসরি মূলধন বিনিয়োগ। নতুন কোম্পানি প্রতিষ্ঠা কিংবা বিদ্যমান কোম্পানির মালিকানায় নতুন মূলধন যোগ করা—দুই ধরনের বিনিয়োগই এতে থাকতে পারে। তাই নতুন বিদেশি পুঁজির প্রবাহ বোঝার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে নিট ইক্যুইটি বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৭ কোটি ৭৪ লাখ ২০ হাজার ডলারে। আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৮ কোটি ১৩ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরে নতুন ইক্যুইটি মূলধনের নিট প্রবাহ কমেছে ৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ।

আগের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকেও নিট ইক্যুইটি বিনিয়োগ ছিল ৭ কোটি ৮২ লাখ ৬০ হাজার ডলার। সেই তুলনায় জুন প্রান্তিকে কমেছে আরও ১ দশমিক ০৭ শতাংশ। ফলে সাম্প্রতিক দুই প্রান্তিকের তুলনায় নতুন মূলধন প্রবাহে উন্নতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

তবে মোট ইক্যুইটি বিনিয়োগ এবং নিট বিনিয়োগ এক নয়। জুন প্রান্তিকে ইক্যুইটি খাতে বিদেশ থেকে এসেছে ১১ কোটি ৫০ লাখ ৬০ হাজার ডলার। বিপরীতে এ খাত থেকে বেরিয়ে গেছে ৩ কোটি ৭৬ লাখ ৪০ হাজার ডলার। দুই অঙ্কের পার্থক্যই নিট ইক্যুইটি বিনিয়োগ।

অন্যদিকে বিদেশি বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় অংশ এসেছে পুনর্বিনিয়োগকৃত মুনাফা থেকে। অর্থাৎ বাংলাদেশে আগে থেকেই ব্যবসা করা বিদেশি কোম্পানিগুলো তাদের অর্জিত মুনাফার একটি অংশ দেশে রেখে আবার বিনিয়োগ করেছে।

২০২৬ সালের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে এ খাতে নিট বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ২৬ কোটি ৯ লাখ ১০ হাজার ডলারে। আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১৬ কোটি ৮২ লাখ ৪০ হাজার ডলার। অর্থাৎ এক বছরে পুনর্বিনিয়োগ বেড়েছে ৫৫ দশমিক ০৮ শতাংশ।

এই প্রবৃদ্ধিই সামগ্রিক বিদেশি বিনিয়োগের বার্ষিক বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। জুন প্রান্তিকের মোট নিট এফডিআইয়ের প্রায় ৭৫ শতাংশ এসেছে পুনর্বিনিয়োগকৃত মুনাফা থেকে। বিপরীতে ইক্যুইটি মূলধনের অবদান প্রায় ২২ শতাংশ।

অর্থাৎ প্রতি ১০০ ডলার নিট বিদেশি বিনিয়োগের প্রায় ৭৫ ডলারই এসেছে আগে থেকে ব্যবসা করা কোম্পানিগুলোর মুনাফা পুনর্বিনিয়োগের মাধ্যমে। এটি বিদ্যমান বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ব্যবসায় অর্থ ধরে রাখার ইতিবাচক দিক দেখালেও নতুন মূলধন প্রবাহের দুর্বলতা দূর করছে না।

তবে পুনর্বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও আগের প্রান্তিকের তুলনায় পতন হয়েছে। জানুয়ারি-মার্চ সময়ে এ খাতে নিট বিনিয়োগ ছিল ৩৪ কোটি ২৯ লাখ ২০ হাজার ডলার। জুন প্রান্তিকে তা কমেছে ২৩ দশমিক ৯২ শতাংশ।

বিদেশি বিনিয়োগের তৃতীয় উপাদান আন্তঃকোম্পানি ঋণ। সাধারণত বিদেশি মূল কোম্পানি ও বাংলাদেশে তাদের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঋণ লেনদেন এই হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয়।

এ খাতে সবচেয়ে বড় পতন ঘটেছে। জুন প্রান্তিকে নিট আন্তঃকোম্পানি ঋণ দাঁড়িয়েছে মাত্র ৮৬ লাখ ১০ হাজার ডলারে। আগের মার্চ প্রান্তিকের তুলনায় কমেছে ৬৭ দশমিক ০৪ শতাংশ। আর এক বছর আগের একই সময়ের তুলনায় কমেছে ৮৫ দশমিক ১৭ শতাংশ।

জুন প্রান্তিকে আন্তঃকোম্পানি ঋণ হিসেবে ৩৩ কোটি ৩৮ লাখ ডলার দেশে এলেও বিপরীতে বেরিয়ে গেছে ৩২ কোটি ৫১ লাখ ৯০ হাজার ডলার। ফলে নিট হিসাবে এ খাতের অবদান ছিল সামান্য।

এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে তিন খাত মিলিয়ে মোট বিদেশি বিনিয়োগ প্রবাহ ছিল ১১১ কোটি ৩২ লাখ ১০ হাজার ডলার। কিন্তু একই সময়ে বিভিন্ন উপাদানে বহিঃপ্রবাহ হয়েছে ৭৬ কোটি ৬২ লাখ ৭০ হাজার ডলার। ফলে নিট বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৩৪ কোটি ৬৯ লাখ ৪০ হাজার ডলারে।

অর্থাৎ দেশে বিদেশি বিনিয়োগ হিসেবে যত অর্থ আসে, তার পুরোটাই নিট হিসাবে থেকে যায় না। মূলধন প্রত্যাহার, মুনাফাসংক্রান্ত বহিঃপ্রবাহ এবং আন্তঃকোম্পানি ঋণ পরিশোধসহ বিভিন্ন লেনদেনের পর অবশিষ্ট অংশই নিট এফডিআই হিসেবে গণনা করা হয়।

সার্বিক পরিসংখ্যানে তাই দুটি ভিন্ন বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে। একদিকে বিদ্যমান বিদেশি কোম্পানিগুলো তাদের মুনাফার একটি বড় অংশ বাংলাদেশে পুনর্বিনিয়োগ করছে। অন্যদিকে নতুন ইক্যুইটি মূলধনের নিট প্রবাহ কমছে এবং আন্তঃকোম্পানি ঋণও সংকুচিত হচ্ছে।

বাংলাদেশের জন্য এখন গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো বিদ্যমান বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ধরে রাখার পাশাপাশি নতুন মূলধন প্রবাহ বাড়ানো। কারণ নতুন শিল্প স্থাপন, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও কর্মসংস্থান সম্প্রসারণে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানের পুনর্বিনিয়োগের পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগও প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব তাই শুধু বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে কি কমেছে, সেই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। বরং বড় প্রশ্ন হলো—যে প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, তার কতটা নতুন মূলধন থেকে আসছে? সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, প্রবৃদ্ধির প্রধান ভরসা এখনো পুরোনো কোম্পানিগুলোর পুনর্বিনিয়োগকৃত মুনাফা।
 

সর্বশেষ