ডিএসজে
পণ্য বিক্রি বাড়লেও মুনাফা ধরে রাখতে পারছে না পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বহুজাতিক সিমেন্ট কোম্পানি লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে কোম্পানিটির বিক্রি ৬ শতাংশ বাড়লেও নিট মুনাফা কমেছে ২১ শতাংশ। জ্বালানি, পরিবহন ও কাঁচামালের বাড়তি ব্যয়ে বিক্রির প্রবৃদ্ধির সুফল মুনাফায় ধরে রাখা সম্ভব হয়নি।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) প্রকাশিত কোম্পানিটির জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৬ সময়ের আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের নিট বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ৩০১ কোটি ৬০ লাখ টাকা। গত বছরের একই সময়ে বিক্রি হয়েছিল ২ হাজার ১৬৬ কোটি ১০ লাখ টাকা। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে বিক্রি বেড়েছে ১৩৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা বা প্রায় ৬ দশমিক ২৬ শতাংশ।
কিন্তু বিক্রি বৃদ্ধির বিপরীতে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা কমে দাঁড়িয়েছে ২৭৯ কোটি ৭০ লাখ টাকায়। গত বছরের একই সময়ে নিট মুনাফা ছিল ৩৫৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা। সেই হিসাবে মুনাফা কমেছে ৭৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা বা প্রায় ২১ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
কোম্পানিটির ব্যবসায়িক ফলাফলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে বিক্রি ও মুনাফার বিপরীতমুখী প্রবণতা। বিক্রির পরিমাণ বাড়লেও সেই বাড়তি আয় থেকে আগের মতো মুনাফা অর্জন করা যাচ্ছে না।
আর্থিক প্রতিবেদনের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে প্রতি ১০০ টাকা বিক্রির বিপরীতে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী মুনাফা ছিল প্রায় ১৬ টাকা ৪০ পয়সা। চলতি বছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১২ টাকা ২০ পয়সায়।
অর্থাৎ, প্রতি ১০০ টাকা বিক্রিতে কোম্পানিটির নিট মুনাফা কমেছে প্রায় ৪ টাকা ২০ পয়সা। নিট মুনাফার হার কমেছে ৪ দশমিক ২ শতাংশ পয়েন্ট।
এটি শুধু মুনাফার মোট অঙ্ক কমার বিষয় নয়; বরং কোম্পানিটির বিক্রয় আয়ের বিপরীতে লাভ করার সক্ষমতাও দুর্বল হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
পরিচালন মুনাফার ক্ষেত্রেও একই চিত্র পাওয়া গেছে। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে কোম্পানিটির কর ও সুদের আগের পরিচালন মুনাফা হয়েছে ৩৪৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। গত বছরের একই সময়ে এই মুনাফা ছিল ৪২৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
এক বছরের ব্যবধানে পরিচালন মুনাফা কমেছে ৭৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা বা প্রায় ১৮ দশমিক ৬০ শতাংশ।
পরিচালন মুনাফার হার গত বছরের ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে কমে চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে ১৫ দশমিক ২ শতাংশে নেমেছে। অর্থাৎ, এই হার কমেছে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ পয়েন্ট।
পরিচালন মুনাফার এই পতন দেখাচ্ছে, কোম্পানিটির মূল ব্যবসায়িক কার্যক্রমেই ব্যয়ের চাপ বেড়েছে। বিক্রির প্রবৃদ্ধি দিয়ে সেই চাপ পুরোপুরি সামাল দেওয়া সম্ভব হয়নি।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মুনাফা কমার অন্যতম প্রধান কারণ জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি। এর পাশাপাশি পরিবহন খরচ ও কাঁচামালের দাম বৃদ্ধিও কোম্পানিটির আর্থিক ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতার কারণে ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে মন্থরতার ফলে চাহিদায় চাপ তৈরি হওয়ার কথা উল্লেখ করেছে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ।
লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইকবাল চৌধুরী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় ব্যয় বৃদ্ধি এবং দেশের অর্থনৈতিক মন্দায় চাহিদা কমার পরও উদ্ভাবনী উদ্যোগ ও দক্ষ পরিচালনার মাধ্যমে ব্যবসায়িক ধারাবাহিকতা ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে।
তিনি জানান, সামষ্টিক অর্থনীতির দুর্বলতা কোম্পানিটির মুনাফার ওপর চাপ সৃষ্টি করলেও বিশেষায়িত পণ্যগুলোর বাজারে শক্তিশালী অবস্থান বজায় রয়েছে।
কোম্পানিটির বিশেষায়িত পণ্যের মধ্যে রয়েছে হলসিম ওয়াটার প্রোটেক্ট, সুপারক্রিট প্লাস ও কোস্টাল গার্ড। এসব পণ্যের বাজারে চাহিদা এবং কৌশলগত মূল্য নির্ধারণের মাধ্যমে বিক্রি বাড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
এ ছাড়া কোম্পানিটির অ্যাগ্রিগেটস বা পাথরজাত নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসাও ইতিবাচক অবদান রেখেছে। এই খাতে চাহিদা বৃদ্ধির পাশাপাশি পণ্যের দাম বাড়ায় ব্যবসায়িক ফলাফল ভালো হয়েছে বলে জানিয়েছে লাফার্জহোলসিম।
বিক্রি বাড়লেও মুনাফা কমার প্রভাব পড়েছে শেয়ারপ্রতি আয়েও। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) দাঁড়িয়েছে ২ টাকা ৪১ পয়সা। গত বছরের একই সময়ে ছিল ৩ টাকা ৬ পয়সা।
মুনাফা ও শেয়ারপ্রতি আয় কমলেও সোমবার বিনিয়োগকারীদের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন নগদ লভ্যাংশের সুপারিশ করেছে কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসের জন্য ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এ জন্য কোম্পানিটি মোট ১১৬ কোটি টাকা বিতরণ করবে বলে জানিয়েছে।
হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে অর্জিত ২৭৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা নিট মুনাফার প্রায় ৪১ দশমিক ৪৭ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থ অন্তর্বর্তীকালীন নগদ লভ্যাংশ হিসেবে বিতরণের পরিকল্পনা রয়েছে।
লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের আর্থিক প্রতিবেদনে পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমের অগ্রগতিও তুলে ধরা হয়েছে।
কোম্পানিটি জানিয়েছে, তাদের ‘জিওসাইকেল’ কার্যক্রমের মাধ্যমে চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে ৩১ হাজার টনের বেশি পুনর্ব্যবহার-অযোগ্য বর্জ্য সহপ্রক্রিয়াজাত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রায় ১০ শতাংশ জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছে কোম্পানিটি।
সিমেন্ট উৎপাদন জ্বালানিনির্ভর একটি শিল্প। ফলে বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো দীর্ঘমেয়াদে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় পরিবেশগত সুবিধাও তৈরি হতে পারে।
কোম্পানিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বর্তমান বাজার পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যয় সংকোচন এবং কৌশলগত মূল্য নির্ধারণের উদ্যোগ অব্যাহত রাখা হয়েছে।
লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সামষ্টিক অর্থনীতির চাপ এবং জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে চলতি বছরের বাকি সময়ও ব্যবসায়িক পরিবেশ চ্যালেঞ্জপূর্ণ থাকতে পারে। কোম্পানিটি এসব পরিস্থিতি মোকাবিলা করে ২০২৭ সালের জন্য শক্তিশালী ব্যবসায়িক ভিত্তি গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।
সামগ্রিকভাবে কোম্পানিটির নয় মাসের আর্থিক ফলাফল নির্মাণসামগ্রী খাতে ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব তুলে ধরছে। বিক্রির প্রবৃদ্ধি বজায় থাকলেও জ্বালানি, পরিবহন ও কাঁচামালের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে মুনাফার হার ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সেই চিত্র স্পষ্ট। ফলে আগামী সময়ে কোম্পানিটির আর্থিক ফলাফল অনেকাংশে নির্ভর করবে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, বিশেষায়িত পণ্যের চাহিদা এবং অ্যাগ্রিগেটস ব্যবসার প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার ওপর।













