ডিএসজে
দুই বছরের বেশি সময় ধরে পুঁজিবাজারে নতুন আইপিও (প্রাথমিক গনপ্রস্তাব) আসেনি। এমন পরিস্থিতিতে বড় কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আকৃষ্ট করতে উদ্যোক্তাদের বিদ্যমান শেয়ার বিক্রির সুযোগ দিতে যাচ্ছে বিএসইসি। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় যোগ্য কোম্পানি মাত্র ৫ শতাংশ নতুন শেয়ার ছেড়ে তালিকাভুক্ত হতে পারবে। পাশাপাশি উদ্যোক্তা ও বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডাররা নিজেদের শেয়ার বিক্রি করে বিনিয়োগের একটি অংশ নগদায়ন করতে পারবেন।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) রোববার (১৮ অক্টোবর) ‘পাবলিক অফার অব ইকুইটি সিকিউরিটিজ রুলস, ২০২৫’ সংশোধনের খসড়া প্রকাশ করেছে। খসড়ায় ৯০টি সংশোধনী প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে উদ্যোক্তাদের শেয়ার বিক্রি, বড় কোম্পানির তালিকাভুক্তির শর্ত শিথিল, মুনাফার যোগ্যতায় ছাড় এবং আইপিওতে লটারি ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ উল্লেখযোগ্য।
দীর্ঘদিন ধরে নতুন আইপিও না আসার পাশাপাশি পুঁজিবাজারের পরিস্থিতিরও উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। বর্তমান কমিশন নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তি বাড়াতে উদ্যোগী হলেও বেসরকারি কোম্পানিগুলোর প্রত্যাশিত আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে তালিকাভুক্তিকে আকর্ষণীয় করতে নতুন বিধিমালায় একাধিক সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
খসড়ায় আইপিওর মাধ্যমে নতুন মূলধন সংগ্রহের পাশাপাশি বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডারদের শেয়ার বিক্রির সমন্বিত ব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়েছে। এর নাম ‘অফার ফর সেল’ বা ওএফএস।
প্রচলিত আইপিওতে নতুন শেয়ার বিক্রির অর্থ কোম্পানির মূলধনে যুক্ত হয়। কিন্তু ওএফএসের মাধ্যমে বিদ্যমান শেয়ার বিক্রির অর্থ পাবেন সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা বা শেয়ারহোল্ডার। ফলে তালিকাভুক্তির মাধ্যমে কোম্পানির মূলধন সংগ্রহের পাশাপাশি পুরোনো মালিকদের বিনিয়োগ নগদায়নের সুযোগ তৈরি হবে।
এ ব্যবস্থা সরাসরি তালিকাভুক্তি বা ডিরেক্ট লিস্টিং নয়। কারণ এতে আইপিওর মাধ্যমে নতুন শেয়ার ইস্যু বাধ্যতামূলক। তবে বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডারদের শেয়ার বিক্রির সুযোগ থাকায় সরাসরি তালিকাভুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য এতে যুক্ত হচ্ছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, আইপিওর আগে অন্তত ৫০০ কোটি টাকা নিট সম্পদ থাকা কোম্পানি নির্দিষ্ট শর্তে আইপিও-পরবর্তী পরিশোধিত মূলধনের মাত্র ৫ শতাংশের সমপরিমাণ নতুন শেয়ার ছেড়ে তালিকাভুক্ত হতে পারবে। সাধারণ নিয়মে অন্তত ১০ শতাংশ শেয়ার ছাড়ার শর্ত রয়েছে।
অন্যদিকে বিদেশি সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানাধীন কোম্পানি, বিটিআরসিতে নিবন্ধিত ও অন্তত ৩০০ কোটি টাকা নিট সম্পদ থাকা প্রতিষ্ঠান এবং বার্ষিক আয় বা মোট সম্পদ ৫০০ কোটি টাকার বেশি—এমন যোগ্য কোম্পানির জন্য আইপিও ও ওএফএসের সমন্বিত ব্যবস্থা প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে অন্তত ৫ শতাংশ নতুন শেয়ার ছাড়তে হবে। ওএফএসসহ মোট প্রস্তাবিত শেয়ার হবে আইপিও-পরবর্তী পরিশোধিত মূলধনের অন্তত ১০ শতাংশ। প্রথম বছরে ওএফএসের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শেয়ার বিক্রির সীমাও রাখা হয়েছে।
ওএফএসের আওতায় প্রতিশ্রুত শেয়ারের অন্তত ২৫ শতাংশ তালিকাভুক্তির প্রথম কার্যদিবসেই বিক্রির জন্য দিতে হবে। অবশিষ্ট শেয়ার পরবর্তী ২৯ কার্যদিবসের মধ্যে ছাড়তে হবে। শেয়ার বিক্রেতারা তালিকাভুক্তির পর এক বছর সংশ্লিষ্ট কোম্পানির শেয়ার কিনতে পারবেন না।
এ ব্যবস্থায় নতুন মূলধনের প্রয়োজন সীমিত থাকা বড় কোম্পানিগুলোও তালিকাভুক্তিতে আগ্রহী হতে পারে। তবে উদ্যোক্তাদের শেয়ার বিক্রির অর্থ কোম্পানিতে না যাওয়ায় উৎপাদন, ব্যবসা সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থানে সরাসরি নতুন বিনিয়োগ কতটা বাড়বে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তালিকাভুক্তির পরপরই বিপুল শেয়ার বিক্রির সুযোগ বাজারে বিক্রির চাপও তৈরি করতে পারে।
বড় কোম্পানিকে আকৃষ্ট করতে মুনাফার যোগ্যতায় ছাড়ের প্রস্তাবও রয়েছে। অন্তত ৫০০ কোটি টাকার সম্পদ থাকা নির্দিষ্ট মূলধননির্ভর কোম্পানি বিএসইসির অনুমোদন ও স্টক এক্সচেঞ্জের সুপারিশ সাপেক্ষে এ সুবিধা পেতে পারে। তবে মুনাফায় পৌঁছানোর পরিকল্পনা প্রকাশ করতে হবে, যেখানে দুই বছরের মধ্যে মুনাফা অর্জনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
এ ধরনের ছাড় দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য সহায়ক হতে পারে। তবে সম্পদ বেশি থাকলেই ভবিষ্যৎ মুনাফা নিশ্চিত হয় না। ফলে এসব কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা ও নগদ প্রবাহ যাচাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বরাদ্দ পাওয়া শেয়ারের ৫০ শতাংশ প্রথম লেনদেনের দিন থেকেই বিক্রির সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। বাকি ২৫ শতাংশ ৬০ দিন এবং শেষ ২৫ শতাংশ ৯০ দিন অবরুদ্ধ থাকবে। শেয়ারদর নির্ধারণে অংশ নেওয়া বিনিয়োগকারীদের দ্রুত বিক্রির সুযোগ বাজারে মূল্যচাপ ও স্বার্থের সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি করতে পারে।
শেয়ারদর নির্ধারণে অন্তত চারটি মূল্যায়ন পদ্ধতি ব্যবহারের প্রস্তাব রয়েছে। যোগ্য বিনিয়োগকারীরা নিজ নিজ প্রস্তাবিত দরে শেয়ার পাবেন। অন্য নির্ধারিত শ্রেণির জন্য প্রযোজ্য হবে কাট-অফ মূল্য।
সাধারণ বিনিয়োগকারী ও প্রবাসীদের আইপিওর শেয়ার বরাদ্দে লটারি ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। অতিরিক্ত আবেদন হলে নির্ধারিত মূল্য ও বুক বিল্ডিং—উভয় পদ্ধতিতে লটারি হবে। স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার অ্যালগরিদম যাচাই করবে বুয়েট।
নির্ধারিত মূল্য পদ্ধতিতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য ৬৫ শতাংশ এবং বুক বিল্ডিংয়ে ৪০ শতাংশ শেয়ার বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। বুক বিল্ডিংয়ে যোগ্য বিনিয়োগকারীরা পাবেন ৩৫ শতাংশ, মিউচুয়াল ফান্ড ১০ শতাংশ, স্থায়ী কর্মীরা ৫ শতাংশ এবং প্রবাসীরা ১০ শতাংশ।
আইপিওর আগে কোম্পানির আর্থিক তথ্য স্বতন্ত্র নিরীক্ষকের মাধ্যমে যাচাই বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রয়েছে। তবে সংশোধনী কার্যকর হওয়ার আগে জমা দেওয়া আবেদনগুলো এ যাচাই থেকে অব্যাহতি পাবে। এতে পুরোনো ও নতুন আবেদনকারীদের জন্য ভিন্ন যাচাইমানদণ্ড তৈরি হওয়ার প্রশ্ন রয়েছে।
এ ছাড়া আইপিওর অর্থের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ নির্দিষ্ট শর্তে বিদ্যমান ঋণ পরিশোধে ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে খেলাপি বা পুনঃতফসিল করা ঋণ পরিশোধ করা যাবে না। ঋণ পরিশোধে সুদব্যয় কমলেও নতুন বিনিয়োগে সরাসরি অর্থের ব্যবহার সীমিত হতে পারে।
বিএসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহি পরিচালক মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেন, পুঁজিবাজারের গভীরতা বাড়াতে এবং ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তি উৎসাহিত করতে নতুন বিধিমালায় বিশেষ সুবিধা রাখা হয়েছে। আইপিওতে ন্যূনতম ১০ শতাংশ শেয়ার ছাড়ার শর্ত বহাল থাকলেও নির্দিষ্ট যোগ্যতার কোম্পানির উদ্যোক্তারা সরাসরি বাজারে বিদ্যমান শেয়ার বিক্রি করতে পারবেন। তবে তাঁরা সব শেয়ার বিক্রি করে বেরিয়ে যেতে পারবেন না; অবশিষ্ট শেয়ার নির্ধারিত মেয়াদে অবরুদ্ধ থাকবে।
তিনি জানান, এ সুবিধা কেবল বহুজাতিক বা বিদেশি প্রতিষ্ঠান, বিটিআরসি লাইসেন্সপ্রাপ্ত কোম্পানি এবং অন্তত ৫০০ কোটি টাকার সম্পদ বা বার্ষিক আয় থাকা প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য। অতীতে দীর্ঘ লক-ইনের কারণে বড় কোম্পানির অনাগ্রহ তৈরি হয়েছিল। তাই এটিকে ছাড় নয়, বরং প্রণোদনা হিসেবে দেখছেন তাঁরা।
আবুল কালাম আরও বলেন, আইপিওর অর্থে খেলাপি বা পুনঃতফসিলকৃত ঋণ পরিশোধ করা যাবে না। অর্থ ব্যবহারের প্রতিবেদন বাধ্যতামূলক থাকবে। অনুমোদন দ্রুত করতে প্রাক্-আইপিও যাচাইও চালু হচ্ছে।
বিএসইসির প্রস্তাবিত ছাড় বড় কোম্পানির তালিকাভুক্তিতে আগ্রহ বাড়াতে পারে। তবে উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ নগদায়ন, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের দ্রুত শেয়ার বিক্রি এবং মুনাফার শর্ত শিথিলের বিপরীতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা কতটা নিশ্চিত হবে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে দীর্ঘদিনের আইপিও-শূন্যতা কাটাতে নতুন কোম্পানি আনার পাশাপাশি শেয়ারের যৌক্তিক মূল্য ও আর্থিক তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় শুধু তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা বাড়িয়ে বাজারে আস্থা ফেরানো কঠিন হতে পারে।
বিএসইসি খসড়ার ওপর দুই সপ্তাহের মধ্যে মতামত ও আপত্তি আহ্বান করেছে। জনমত পর্যালোচনার পর সংশোধনী চূড়ান্ত করা হবে।














