ঢাকা,  শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, কার্তিক ৭ ১৪৩৩

৭০ পৌরসভায় ব্যবসা বাড়াতে ৩০০ কোটি টাকার প্রকল্প

রোববার একনেকে উঠছে প্রস্তাব; স্থানীয় অর্থনীতি চাঙা করতে ১৯৭ কোটি টাকা, ডিজিটাল সেবা ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে বিশেষ উদ্যোগ

দেশ ও প্রবৃদ্ধি

ডিএসজে প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২০:৪৮,২১ অক্টোবর ২০২৬

আপডেট: ২০:১৬,২২ অক্টোবর ২০২৬

সর্বশেষ

৭০ পৌরসভায় ব্যবসা বাড়াতে ৩০০ কোটি টাকার প্রকল্প

প্রতীকী ছবি (এআই দ্বারা তৈরী)

দেশের ৭০টি পৌরসভায় ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও কর্মসংস্থান বাড়াতে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি পৌরসভার নিজস্ব আয় বাড়ানো এবং নাগরিক সেবা ডিজিটাল করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ লক্ষ্যে নেওয়া প্রকল্পটি আগামী রোববার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হচ্ছে।

পরিকল্পনা কমিশনের নথি অনুযায়ী, ‘প্রাবৃদ্ধি: নির্বাচিত পৌরসভায় স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২৯৯ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ২৫৪ কোটি ৯৯ লাখ টাকা এবং সুইজারল্যান্ডের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা সুইস এজেন্সি ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কো-অপারেশনের (এসডিসি) অনুদান ৪৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রকল্পের প্রায় ৮৫ শতাংশ অর্থ দেবে সরকার এবং বাকি ১৫ শতাংশ আসবে বিদেশি অনুদান থেকে।

প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সভাপতিত্বে আগামী রোববারের সভায় প্রকল্পটি উপস্থাপনের কথা রয়েছে। অনুমোদন পেলে স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতায় ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০৩০ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন বছরে এটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো পৌরসভাগুলোকে শুধু নাগরিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে সীমাবদ্ধ না রেখে স্থানীয় ব্যবসা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির কার্যকর কেন্দ্রে পরিণত করা। এ জন্য স্থানীয় অর্থনৈতিক সম্ভাবনা চিহ্নিত করা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা, ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

প্রকল্পের সবচেয়ে বড় বরাদ্দ রাখা হয়েছে স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন কাঠামো বাস্তবায়নে। নির্বাচিত ৭০টি পৌরসভায় এ খাতে অনুদান হিসেবে ব্যয় হবে ১৯৬ কোটি ৯১ লাখ টাকা, যা মোট প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় ৬৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ। সমানভাবে বণ্টন করা হলে প্রতিটি পৌরসভার জন্য গড়ে প্রায় ২ কোটি ৮১ লাখ টাকা বরাদ্দ দাঁড়ায়। তবে প্রকৃত বরাদ্দ পৌরসভাভেদে প্রয়োজন ও প্রকল্প পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।

এ অর্থ স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের উদ্যোগে ব্যবহার করা হবে। পৌরসভা, স্থানীয় ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনাও রয়েছে।

পৌরসভার নাগরিক ও ব্যবসায়িক সেবা ডিজিটাল করতে আরও ৩০ কোটি ৪৫ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর আওতায় ডিজিটাল ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সেন্টার ও ই-পেমেন্ট ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে। এসব ব্যবস্থা কার্যকর হলে নাগরিক ও ব্যবসায়ীরা একই জায়গা থেকে বিভিন্ন সেবা গ্রহণ এবং ডিজিটাল মাধ্যমে ফি ও অন্যান্য অর্থ পরিশোধের সুযোগ পাবেন।

বিশেষ করে ট্রেড লাইসেন্সসহ পৌরসভার ব্যবসাসংশ্লিষ্ট সেবা সহজ করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে সেবা গ্রহণে সময় ও ব্যয় কমানোর পাশাপাশি পৌরসভার রাজস্ব আদায়ে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এসব সুফল নির্ভর করবে ডিজিটাল ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে তার বাস্তব ব্যবহারের ওপর।

প্রকল্পের ব্যয় পরিকল্পনায় জাতীয় স্থানীয় সরকার ইনস্টিটিউটের (এনআইএলজি) জন্য ২৮ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। এ ছাড়া গবেষণায় ১৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা এবং অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণে ২ কোটি ৯৫ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে। উল্লিখিত পাঁচটি খাতে মোট বরাদ্দ ২৭৮ কোটি ১৩ লাখ টাকা। অবশিষ্ট ২১ কোটি ৮৬ লাখ টাকার খাতভিত্তিক বিস্তারিত ব্যয় সরবরাহ করা তথ্যে উল্লেখ নেই।

প্রকল্পে গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ থাকায় এসব কার্যক্রমের বাস্তব ফলাফলও গুরুত্বপূর্ণ হবে। বিশেষ করে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কতজন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছেন, কতটি ব্যবসা সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং পৌরসভার নিজস্ব রাজস্ব কতটা বাড়ছে, তা দিয়ে প্রকল্পের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।

পরিকল্পনা কমিশনের নথিতে প্রকল্পটির যৌক্তিকতা তুলে ধরতে আগের পর্যায়ের সফলতার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে ‘প্রাবৃদ্ধি: স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন’ প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে দেশের সাতটি পৌরসভায় ‘বাংলা এলইডি মডেল’ বাস্তবায়ন করা হয়। পৌরসভা, বেসরকারি খাত ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বিত অংশগ্রহণের মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

প্রথম পর্যায়ের ফলাফল অনুযায়ী, প্রায় ৩৮ হাজার উদ্যোক্তা এবং ৫০ হাজার সেবাগ্রহীতা সরাসরি উপকৃত হয়েছেন। এ সময়ে প্রায় ৪৯ হাজার ১১১টি নতুন কর্মদিবস সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের আয় বেড়েছে প্রায় ১২ কোটি টাকা এবং সংশ্লিষ্ট পৌরসভাগুলো অতিরিক্ত প্রায় ৮ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছে।

অর্থাৎ সাতটি পৌরসভায় উদ্যোক্তাদের বাড়তি আয় ও পৌরসভার অতিরিক্ত রাজস্ব মিলিয়ে প্রায় ২০ কোটি টাকার ইতিবাচক আর্থিক পরিবর্তনের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। তবে এই দুটি অঙ্ক ভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক সুফল নির্দেশ করে; এগুলোকে প্রকল্পের সরাসরি আর্থিক মুনাফা হিসেবে গণনা করা যায় না।

একইভাবে প্রথম পর্যায়ে ৪৯ হাজার ১১১টি কর্মদিবস সৃষ্টির তথ্যকে সমসংখ্যক স্থায়ী কর্মসংস্থান হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে কতটি স্থায়ী ও অস্থায়ী কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, তা আলাদাভাবে পরিমাপ করা প্রয়োজন হবে।

প্রথম পর্যায়ের অভিজ্ঞতায় স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন কমিটি গঠনকেও গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব কমিটিতে পৌরসভার প্রতিনিধি, বেসরকারি খাত ও অন্যান্য অংশীজনদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের পরিবর্তে স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা।

এবার সেই মডেল সাতটি পৌরসভা থেকে দশ গুণ সম্প্রসারণ করে ৭০টি পৌরসভায় বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে আগের পর্যায়ের ফলাফল নতুন সব পৌরসভায় একইভাবে অর্জিত হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। পৌরসভাগুলোর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, প্রশাসনিক সক্ষমতা, ব্যবসায়িক পরিবেশ ও স্থানীয় বিনিয়োগ পরিস্থিতির পার্থক্য প্রকল্পের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।

নতুন প্রকল্পে দেশের আট বিভাগের ‘ক’, ‘খ’ ও ‘গ’ শ্রেণির নির্বাচিত পৌরসভাগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হবে। পৌরসভা নির্বাচনের ক্ষেত্রে জনসংখ্যা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, সেবার চাহিদা, দারিদ্র্য, উন্নয়নঘাটতি এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা উন্নয়নের সুযোগ, নিজস্ব রাজস্ব বৃদ্ধির সম্ভাবনা, ডিজিটাল সেবা চালুর প্রস্তুতি, যোগাযোগব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। জলবায়ু ও ভৌগোলিক ঝুঁকিও পৌরসভা নির্বাচনের অন্যতম বিবেচ্য বিষয় ছিল।

প্রকল্পের মাধ্যমে নারী, যুবক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা এবং বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের এই উদ্যোগে পৌরসভার নিজস্ব রাজস্ব বৃদ্ধিও একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। কারণ পৌরসভাগুলোর নিয়মিত সেবা পরিচালনা, অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ এবং নতুন উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণের সক্ষমতা অনেকাংশে নিজস্ব আয়ের ওপর নির্ভর করে। ডিজিটাল সেবা ও ই-পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু হলে রাজস্ব আদায় সহজ হওয়ার পাশাপাশি আদায়ের তথ্য সংরক্ষণ ও পর্যবেক্ষণেও উন্নতি হতে পারে।

তবে প্রকল্পের অর্থ ব্যয় করে অবকাঠামো বা ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করাই চূড়ান্ত সাফল্য নয়। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে কতজন নতুন উদ্যোক্তা সেবা পেয়েছেন, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কতটা কমেছে, কত টাকা নতুন বিনিয়োগ এসেছে এবং পৌরসভার নিজস্ব আয় কতটা বেড়েছে—এসব ফলাফল প্রকল্পটির অর্থনৈতিক কার্যকারিতা নির্ধারণ করবে।

পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৪ জুন অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভার সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব পুনর্গঠন করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে প্রকল্পটির মোট ব্যয় ২৯৯ কোটি ৯৯ লাখ টাকা নির্ধারণ করে ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০৩০ সালের মার্চ পর্যন্ত বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়।

পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানি ও পল্লি প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য (ভারপ্রাপ্ত সচিব) কবির আহমেদ বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নির্বাচিত পৌরসভাগুলোতে স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন কাঠামো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে। একই সঙ্গে পৌরসভার রাজস্ব ও সেবাদানের সক্ষমতা বাড়বে এবং ডিজিটাল সেবা, উদ্যোক্তা সহায়তা ও বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারিত হবে।

তাঁর মতে, প্রকল্পটি সফল হলে ভবিষ্যতে দেশের অন্যান্য পৌরসভায়ও একই মডেল সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

প্রস্তাবিত প্রকল্পের অর্থনৈতিক গুরুত্ব এখানেই যে, এটি শুধু পৌরসভার অবকাঠামো উন্নয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয় ব্যবসার প্রসার, উদ্যোক্তাদের আয় বৃদ্ধি, বিনিয়োগ আকর্ষণ ও পৌরসভার নিজস্ব রাজস্ব বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করার লক্ষ্য রয়েছে।

তবে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের বিপরীতে কতটি নতুন ব্যবসা গড়ে উঠবে, কতজনের কর্মসংস্থান হবে এবং পৌরসভাগুলোর আয় কতটা বাড়বে—তার নির্দিষ্ট পরিমাণগত লক্ষ্যমাত্রা সরবরাহ করা প্রকল্পের তথ্যে পাওয়া যায়নি। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নের পর ব্যয়ের পাশাপাশি এসব অর্থনৈতিক ফলাফলও পরিমাপ করা গুরুত্বপূর্ণ হবে।

সর্বশেষ