ঢাকা,  শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, কার্তিক ৭ ১৪৩৩

বিশ্বজুড়ে সাইবার সতর্কতা, বন্ধ বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট

পিএইচপির দুটি গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটিতে বিশ্বজুড়ে সতর্কতা; কয়েকটি ব্যাংকের ওয়েবসাইটও বন্ধ, ঝুঁকি মোকাবিলায় কাজ করছে সাইবার নিরাপত্তা দল

দেশ ও প্রবৃদ্ধি

ডিএসজে প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২০:১৫,২২ অক্টোবর ২০২৬

সর্বশেষ

বিশ্বজুড়ে সাইবার সতর্কতা, বন্ধ বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট

ডিএসজে

সাইবার হামলার আশঙ্কায় সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট। বহুল ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপিতে দুটি গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর সতর্কতামূলক এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একই ঝুঁকিতে দেশের আরও কয়েকটি ব্যাংকের ওয়েবসাইটও বন্ধ রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, ওয়েবসাইট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তটি সতর্কতামূলক। এটি শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব কোনো সমস্যা নয়; পিএইচপির নিরাপত্তা ত্রুটিকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, অধিক সতর্কতার জন্য ওয়েবসাইট বন্ধ রাখা হয়েছে। নিরাপত্তাঝুঁকি বিশ্লেষণ করে দ্রুত এটি আবার চালু করা হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি সূত্র জানিয়েছে, ওয়েবসাইটের সম্ভাব্য দুর্বলতা শনাক্ত এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সাইবার নিরাপত্তা দল কাজ করছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে ইতিমধ্যে কোনো অননুমোদিত প্রবেশ বা তথ্য চুরির ঘটনা ঘটেছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, পিএইচপির দুটি নিরাপত্তা ত্রুটি কাজে লাগিয়ে সাইবার হামলাকারীরা পাসওয়ার্ড ছাড়াই দূর থেকে সংশ্লিষ্ট সার্ভারে অননুমোদিত নির্দেশনা কার্যকর করার সুযোগ পেতে পারে। প্রযুক্তিগতভাবে এ ধরনের দুর্বলতা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এর মাধ্যমে সার্ভারের ফাইল, ডেটাবেজ এবং সংরক্ষিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

বিশেষ করে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঝুঁকি বেশি সংবেদনশীল। ব্যাংকের ওয়েবসাইট শুধু তথ্য প্রকাশের মাধ্যম নয়; অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকসেবা, বিভিন্ন আবেদন, বিজ্ঞপ্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল সেবার সঙ্গে যুক্ত থাকে। ফলে ওয়েবসাইটের নিরাপত্তা দুর্বল হলে সেবার ধারাবাহিকতা ও তথ্যের সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ থাকার অর্থ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল ব্যাংকিং কার্যক্রম বা আর্থিক লেনদেনব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়। সরবরাহ করা তথ্যে এমন কোনো বিঘ্নের উল্লেখ নেই।

পিএইচপির নিরাপত্তা ত্রুটি নিয়ে উদ্বেগ শুধু বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ নেই। এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস ও বেলজিয়ামের বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং ডিজিটাল সেবার ওয়েবসাইটও সতর্কতামূলকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।

তবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সব প্রতিষ্ঠানে এই ত্রুটি কাজে লাগিয়ে বাস্তবে সাইবার হামলা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। 

পিএইচপি বিশ্বের বহুল ব্যবহৃত সার্ভারভিত্তিক প্রোগ্রামিং ভাষাগুলোর একটি। সংবাদমাধ্যম, সরকারি প্রতিষ্ঠান, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম এবং বিভিন্ন অনলাইন সেবা পরিচালনায় এ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি অনেক ওয়েবসাইটও পিএইচপিনির্ভর।

তবে পিএইচপি ব্যবহার করলেই কোনো ওয়েবসাইট নিরাপত্তাঝুঁকিতে রয়েছে, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই। ঝুঁকির মাত্রা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট সার্ভারে ব্যবহৃত পিএইচপির সংস্করণ, নিরাপত্তা হালনাগাদ এবং সার্ভারের অন্যান্য সুরক্ষাব্যবস্থার ওপর।

দেশের সরকারি ওয়েবসাইটগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও পর্যালোচনা শুরু হয়েছে। সরকারের অ্যাসপায়ার টু ইনোভেট বা এটুআই প্রকল্পের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ন্যাশনাল পোর্টাল ফ্রেমওয়ার্কের আওতায় থাকা প্রায় ৩৬ হাজার ৫০০টি ওয়েবসাইট পিএইচপি দিয়ে তৈরি নয়।

ফলে পিএইচপির আলোচিত দুটি নিরাপত্তা ত্রুটির কারণে এসব ওয়েবসাইট সরাসরি ঝুঁকিতে পড়ার কথা নয়। তবে জাতীয় পোর্টালের বাইরে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ওয়েবসাইটে কোন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, তা যাচাই করা হচ্ছে।

বেসরকারি খাতেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। হোস্টিং প্রতিষ্ঠান লিমডা হোস্টের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা জুনাইদ মিয়াজী প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, তাঁদের গ্রাহকদের প্রায় ৮০ শতাংশ ওয়েবসাইট পিএইচপিভিত্তিক।

নিরাপত্তা ত্রুটির খবর পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি সার্ভারে সংশোধিত নিরাপত্তা প্যাচ প্রয়োগ করেছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত তাঁদের ব্যবস্থায় আলোচিত ত্রুটির কারণে কোনো প্রভাব শনাক্ত হয়নি।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা মনে করেন, সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রথমেই সরকারি সার্ভারগুলোতে পিএইচপির কোন সংস্করণ ব্যবহার করা হচ্ছে, তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা প্রয়োজন।

বিশেষ করে ইন্টারনেট থেকে সরাসরি প্রবেশযোগ্য সার্ভারগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে নিরাপত্তা হালনাগাদ করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। প্রয়োজন হলে সংশোধিত সংস্করণে যেতে হবে। হালনাগাদ সম্পন্ন হওয়ার আগপর্যন্ত ফায়ারওয়ালের মাধ্যমে ঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

তাঁর মতে, কোনো সার্ভার দ্রুত হালনাগাদ করা সম্ভব না হলে নিরাপত্তার স্বার্থে সেটিকে সাময়িকভাবে ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা উচিত।

এদিকে সরকারের সাইবার নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট সংস্থা বিজিডি ই-গভ সার্টও পিএইচপির নিরাপত্তা ত্রুটি নিয়ে সতর্কতা জারি করেছে।

সংস্থাটির নির্দেশনা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রথমে তাদের সার্ভারে পিএইচপির ব্যবহার এবং ব্যবহৃত সংস্করণ শনাক্ত করতে হবে। এরপর প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা হালনাগাদ ইনস্টল করে তা কার্যকর হয়েছে কি না, যাচাই করতে হবে।

তাৎক্ষণিকভাবে নিরাপত্তা হালনাগাদ করা সম্ভব না হলে সার্ভারে প্রবেশাধিকার সীমিত করা, নির্দিষ্ট আইপি ঠিকানাকে অনুমতি দেওয়া এবং অননুমোদিত সংযোগ পর্যবেক্ষণের মতো সাময়িক সুরক্ষাব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধ রাখার ঘটনা দেশের আর্থিক খাতে ডিজিটাল অবকাঠামোর নিরাপত্তার গুরুত্ব নতুন করে সামনে এনেছে। ব্যাংকিং খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ওয়েবসাইট, সার্ভার এবং তথ্যভান্ডারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিশেষ করে একটি বহুল ব্যবহৃত প্রযুক্তির নিরাপত্তা ত্রুটি একসঙ্গে একাধিক প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন তৈরি করতে পারে। এ কারণে শুধু হামলা শনাক্ত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে নিয়মিত নিরাপত্তা পরীক্ষা, সফটওয়্যার হালনাগাদ এবং সম্ভাব্য দুর্বলতা শনাক্ত করার সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, নিরাপত্তাঝুঁকি বিশ্লেষণ শেষে দ্রুত ওয়েবসাইটটি চালু করা হবে। তবে কখন এটি পুরোপুরি সচল হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময় জানানো হয়নি।

সর্বশেষ