ছবি: চার্লস ডয়লি
প্রাচীন মিসরের ফারাও, রোমান সম্রাট থেকে শুরু করে তুরস্কের অটোমান, দিল্লির মুঘল, কিংবা ইউরোপীয় রাজপরিবারগুলোর আভিজাত্যের প্রতীক ছিল ‘ঢাকাই মসলিন’। বর্তমান বাংলাদেশ ভূখণ্ডের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন আমলে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া এই অতিসূক্ষ্ম সুতিবস্ত্রের বিশাল আন্তর্জাতিক বাজার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর আগমনের অন্তত ১৭০০ বছর আগে, অর্থাৎ খ্রিস্টীয় প্রথম শতকেই। পশ্চিমাদের ভাষ্যে, মসলিন শিল্প এবং ঢাকা অর্থনৈতিক উৎকর্ষতার চরমে পৌঁছেছিল দীর্ঘকাল ভারতবর্ষ শাসনকারী মধ্য এশিয়ার তুর্কো-মঙ্গল বংশোদ্ভূত মুঘল রাজপরিবারের পৃষ্ঠপোষকতার কারণে। বিশেষত তাজমহল নির্মাণকারী সম্রাট শাহজাহান এবং তাঁর বিমাতা সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের মসলিন প্রীতির কথা উল্লেখ রয়েছে ইউরোপীয়দের অসংখ্য বর্ণনায়।
প্রায় সোয়া দুই শ বছর আগে মসলিনবিলাসের ইতিহাস অনুসন্ধান করেছিলেন উনিশ শতকের ব্রিটিশ লেখক ও গবেষক উইলিয়াম মিলবার্ন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আমলের প্রাচ্য বাণিজ্যের তথ্য সংকলক হিসেবে তিনি খ্যাতিমান হয়েছিলেন। লন্ডন থেকে ১৮১৩ সালে প্রকাশিত দুই খণ্ডের ‘ওরিয়েন্টাল কমার্স’ গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে তিনি অতি সূক্ষ্ম ঢাকাই মসলিনের বাণিজ্যিক ইতিহাস এবং ‘মসলিন’ শব্দের উৎপত্তিগত পটভূমি বিস্তারিতভাবে নথিভুক্ত করেছেন। সেখানে রোমান লেখক গাইউস প্লিনিয়াস সেকুন্ডাস ওরফে প্লিনি দ্য এল্ডারের ঐতিহাসিক বিবরণের উদ্ধৃতি দেন মিলবার্ন।
প্লিনি ছিলেন রোমান সাম্রাজ্যের নৌ ও সেনা কমান্ডার এবং সম্রাট ভেসপাসিয়ানের একজন বন্ধু। ব্রিটিশ গবেষক মিলবার্ন লিখেছেন, খ্রিস্টীয় ১৭ সালেই প্রাচীন রোমান লেখক প্লিনি ভারত ও বাংলার বস্ত্র উৎপাদনের উচ্চমানের কথা জানতেন। তৎকালীন রোমান অর্থনীতিতে এর প্রভাব নিয়েও তিনি মন্তব্য করেছিলেন। প্লিনির মতে, ভারত থেকে বিলাসবহুল সূক্ষ্ম কাপড় অত্যধিক আমদানির ফলে রোমের অর্থভাণ্ডার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল।
প্লিনি তাঁর বিবরণীতে বলেছিলেন, রোমান অভিজাত সমাজ এবং নারীদের মধ্যে ভারত থেকে আমদানিকৃত এই সূক্ষ্ম ও বিলাসবহুল বস্ত্রের অতিমাত্রায় ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এর ফলে রোমের সীমিত সোনা ও রুপার ভাণ্ডার খালি হয়ে ভারতে চলে যাচ্ছিল। প্লিনি এবং তৎকালীন রোমান সাহিত্যে অতি সূক্ষ্ম সুতি কাপড়কে ‘কার্পাসুস’ হিসেবে অভিহিত করা হতো। পরবর্তীতে উনিশ শতকের ব্রিটিশ গবেষক ডক্টর জেমস টেলর দেখান যে, এই ‘কার্পাসুস’ শব্দটি মূলত ঢাকা ও সোনারগাঁও অঞ্চলের মেঘনা-শীতলক্ষ্যা তীরের বিখ্যাত ‘ফুটি কার্পাস’ তুলার সাথেই সরাসরি সম্পর্কিত, যা থেকে 'আব-ই-রওয়ান' ও 'শবনম'-এর মতো সূক্ষ্ম মসলিন বোনা হতো।
উইলিয়াম মিলবার্নের বর্ণনা অনুযায়ী, ‘মসলিন’ শব্দটির ভৌগোলিক ও ভাষাতাত্ত্বিক উৎপত্তি ঘটেছে ইরাকের টাইগ্রিস বা দজলা নদীর তীরে অবস্থিত প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাণিজ্যকেন্দ্র ‘মসুল’ শহরের নাম থেকে। প্রাচীন ও মধ্যযুগে ঢাকা ও বাংলা অঞ্চলে উৎপাদিত অতি সূক্ষ্ম এই সুতিবস্ত্র ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি করার জন্য ‘মসুল’ বন্দরে নিয়ে জড়ো করতেন আরব বণিকেরা। সেখান থেকে এই কাপড়ের নাম হয় ‘মাউসিল’ বা ‘মসুলি’। আর্কিওলজিক্যাল উপাত্ত অনুযায়ী, মুঘল ও সুলতানি আমলের বহু আগে থেকেই আরব ও পারস্যের সওদাগরদের সাথে বঙ্গোপসাগর হয়ে প্রাচীন সোনারগাঁও ও ঢাকার সরাসরি নৌবাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। পারস্য উপসাগরের বসরা এবং ইরাকের মসুল শহর দুটি ছিল মধ্যপ্রাচ্যে ঢাকার মসলিন ও সূক্ষ্ম বস্ত্র বিতরণের প্রধান দুটি কেন্দ্র বা আন্তর্জাতিক হাব। একই সূত্রে ভারতের মাদ্রাজ উপকূলের ‘মসুলিপটম’ বন্দরটির নামকরণও এই মসলিন বাণিজ্যের সাথে সম্পর্কিত ছিল।
প্রামাণ্যগ্রন্থ ‘গ্লিমস অব ওল্ড ঢাকা’-র ১৯৫৬ সালের সংস্করণে বাংলাদেশি লেখক সৈয়দ মুহাম্মদ তাইফুর (১৮৮৫–১৯৭২) জানান, সুদূর প্রাচীনকাল থেকেই ঢাকাই মসলিনের প্রচলন ছিল এবং প্রাচীন মিসরের ফারাও বা ফেরাউনদের মমি পেঁচানোর বাইরের আবরণী হিসেবে মসলিন কাপড় ব্যবহৃত হতো বলে অনেকের মতামত ও দাবি রয়েছে। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, প্রাচীন মিসরের রাজকীয় ‘অষ্টাদশ রাজবংশের’ শেষভাগের বেশিরভাগ মমিই মসলিন দিয়ে মোড়ানো হতো। অতি প্রাচীনকাল থেকেই বাংলার সাথে ব্যাবিলন, মিসর, গ্রিস এবং রোমান সভ্যতার মসলিন বাণিজ্য বিদ্যমান ছিল। তাঁর বিবরণ অনুযায়ী, সাধারণ প্লেন মসলিন ছাড়াও তসর, রেশম ও সুতির মিশ্রণে তৈরি বিচিত্র বস্ত্র ঢাকা ও সোনারগাঁও থেকে সরাসরি পারস্য, ইথিওপিয়া, মিসর, তুরস্ক, ইতালি, দক্ষিণ-পূর্ব ফ্রান্সের প্রোভেন্স ও স্পেনে রপ্তানি করা হতো। মধ্যপ্রাচ্য, লোহিত সাগরের তীরবর্তী অঞ্চল এবং উত্তর আফ্রিকার মিসর, তিউনিসিয়া, ইথিওপিয়া রাজপরিবার ও উচ্চবিত্ত সমাজের অভিজাতদের বিশেষ আনুষ্ঠানিক পোশাক এবং কাঁধে ব্যবহারের বিশেষ উত্তরীয় বা শাল তৈরিতে ঢাকার কাসিদা ও সূক্ষ্ম মসলিনের একচ্ছত্র প্রাধান্য ছিল।
সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে ১৯০৯ সালে সরকারি চাকরিতে যোগদান করে ১৯৪২ সালে কলকাতার রেজিস্ট্রার হিসেবে অবসর গ্রহণ করা তাইফুর একাধারে একজন ইতিহাসবিদ, পুরাতত্ত্ববিদ ও লেখক ছিলেন। তিনিই উল্লেখ করেছেন, অটোমান তুর্কি সেনাবাহিনী ও রাজদরবারে ঢাকার মসলিন ও বিশেষ কাসিদা কাপড় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো। অটোমান তুর্কি সেনারা তাঁদের রাজকীয় সুসজ্জিত পাগড়ি তৈরির জন্য ব্যাপকভাবে ঢাকার মসলিন ও কাসিদা বস্ত্র ব্যবহার করতেন। ঢাকা থেকে প্রস্তুতকৃত বিশেষ সূক্ষ্ম বস্ত্র লোহিত সাগরের জেদ্দা বন্দরে পাঠানো হতো, যা পরে মেসোপটেমিয়া, আরব ও অটোমান তুর্কি সাম্রাজ্যের বিভিন্ন বাণিজ্যকেন্দ্রে পৌঁছে যেত।
ইতিহাসবিদরা জানাচ্ছেন, মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের দরবারে এসেছিলেন গ্রিক রাষ্ট্রদূত মেগাস্থেনিস (খ্রিস্টপূর্ব ৩২২–২৯৫ অব্দ)। তাঁর প্রখ্যাত গ্রন্থ 'ইন্ডিকা'-তে গঙ্গা নদী ব্যবহার করে সমুদ্র থেকে পণ্যবাহী বড় বড় জলযান উজান বেয়ে পাটালিপুত্র পর্যন্ত যাতায়াত করত বলে উল্লেখ রয়েছে। তিনি তৎকালীন ভারতের সাথে চীন ও মধ্য এশিয়ার বাণিজ্য সম্পর্কের কথা নথিভুক্ত করেছিলেন। মসলিনের ওপর বোনা সুন্দর ফুলের নকশাযুক্ত রাজকীয় পোশাকের কথা লিখেছিলেন মেগাস্থেনিস, যাকে ঢাকাই জামদানির প্রাচীন রূপ হিসেবে গণ্য করা হয়। সমসাময়িক ভারতীয় গ্রন্থ ‘অর্থশাস্ত্র’ রচয়িতা কৌটিল্যও বঙ্গের সূক্ষ্মবস্ত্রশিল্পের প্রাচীনত্ব ও আন্তর্জাতিক খ্যাতি নথিভুক্ত করেছেন বলেও উল্লেখ রয়েছে ইতিহাসবিদ তাইফুরের লেখায়।
খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতক থেকে খ্রিস্টীয় প্রথম শতকের প্রথমার্ধের গ্রিক ভূগোলবিদ, দার্শনিক ও ইতিহাসবিদ স্ট্রাবো ভূগোল বিষয়ক প্রথম বিশ্বকোষ ‘দ্য জিওগ্রাফিকা’ রচয়িতা। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম সম্পাদিত ‘বিজনেস হিস্ট্রি অব ঢাকা আপ টু ১৯৪৮’ এবং আর. কে. মুখার্জির ‘এ হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়ান শিপিং’ শীর্ষক রচনায় স্ট্রাবোর বিবরণীর উল্লেখ রয়েছে। স্ট্রাবোর ১৭ খণ্ডে রচিত বিখ্যাত ভৌগোলিক বিশ্বকোষে প্রাচীন গ্রিক ও রোমান বিশ্বের সাথে পূর্বদেশীয় দেশগুলোর ভৌগোলিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের বিবরণ স্থান পেয়েছিল। তাঁর বিবরণী থেকেও প্রাচীন বাংলার নৌ-বাণিজ্যের দূরবিস্তারী অবকাঠামোর কথা জানা যায়। তিনি উল্লেখ করেন, এই অঞ্চলের নদীপথগুলো এতই প্রশস্ত ও গভীর ছিল যে বিশালাকার বাণিজ্যিক জাহাজ অনায়াসে নদীপথে অভ্যন্তরীণ গন্তব্যে প্রবেশ করতে পারত। স্ট্রাবোসহ তৎকালীন গ্রিক ভৌগোলিক বিবরণীগুলোতে গঙ্গা নদীপথ ব্যবহার করে কীভাবে বঙ্গোপসাগর হয়ে দক্ষিণ ভারত, সিলন (শ্রীলঙ্কা), গ্রিস, রোমান সাম্রাজ্য ও মধ্য এশিয়ার সাথে প্রাচীন বঙ্গে উৎপাদিত পণ্যসামগ্রীর (যেমন অতি সূক্ষ্ম সুতি বস্ত্র/মসলিন, মসলা ও রত্ন) লেনদেন ও আদান-প্রদান চলত, তার উল্লেখ পাওয়া যায়।
খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে এক বা একাধিক অজ্ঞাতনামা গ্রিক নাবিক কর্তৃক রচিত ‘পেরিফ্লাস অব দ্য ইরিথ্রিয়ান সি’ গ্রন্থে প্রাচীন বঙ্গদেশের উপকূলীয় বিভিন্ন বন্দরের তালিকা দেওয়া হয়েছে। তৎকালীন বাংলা থেকে দক্ষিণ ভারত, শ্রীলঙ্কা এবং চীনের সাথে অত্যন্ত নিবিড় আন্তর্জাতিক সমুদ্র বাণিজ্য চালু ছিল। এই বিবরণী অনুসারে বাংলা থেকে প্রখ্যাত মিহি মসলিন ও সুতি বস্ত্র, মূল্যবান রত্ন পাথর, মুক্তা এবং সুগন্ধি মসলা ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হতো; পক্ষান্তরে চীন থেকে রেশম বস্ত্র বাংলায় আনা হতো। গ্রন্থটিতে ‘কিরাডিয়া’ অঞ্চল এবং গঙ্গা নদীর তীরের ‘গঙ্গে’ বন্দরের উল্লেখ রয়েছে, যেখান থেকে সংগৃহীত উন্নতমানের তেজপত্র তাম্রলিপ্তি বন্দর হয়ে রোমান সাম্রাজ্য ও ইউরোপে পাঠানো হতো।
ইতালির ভেনিস থেকে আসা পর্যটক ও বণিক মার্কো পোলোর ১২৭২ সালের বিবরণীতে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রাচুর্যের চিত্র পাওয়া যায়। তিনি উল্লেখ করেন, এ অঞ্চলে প্রচুর তুলা উৎপাদিত হতো এবং তা কেন্দ্র করে এক বিশাল বাণিজ্যিক লেনদেন পরিচালিত হতো। বস্ত্র ছাড়াও চাল, দুধ, সুগন্ধি মসলা এবং বিশালাকার ষাঁড়ের বাণিজ্য এখানে অত্যন্ত সক্রিয় ছিল। মরক্কোর বিশ্বভ্রমণকারী ধর্মতাত্ত্বিক মুহাম্মদ ইবনে বতুতা ১৩৩৮–১৩৪০-এর দশকে বাংলায় অবস্থানকালে স্থানীয় নদীপ্রবাহকে মিসরের নীল নদের সাথে তুলনা করেছিলেন। তিনি সোনারগাঁও থেকে জলচক্র, বাজার ও বাগানের অপরূপ শোভা পর্যবেক্ষণ করেন এবং লেখেন যে, নদীপথে দূর-দূরান্তের দেশের সাথে বাণিজ্য চলত। অত্যন্ত কম খরচে জীবনযাত্রার মান এবং সোনারগাঁও থেকে সরাসরি জাভা ও চীনে জাহাজ চলাচলের বিবরণ তাঁর রচনায় ফুটে উঠেছে।
চীনা পর্যটক মাহুয়ান সং রাজবংশের কূটনৈতিক দল নিয়ে ১৫ শতকের বাংলায় এসে স্থানীয় কারুশিল্প ও প্রস্তুতকৃত পণ্যের অবিশ্বাস্য উৎকর্ষের বিবরণ দেন। তিনি বাংলার সূক্ষ্ম কার্পাস বস্ত্র, রেশমি কাপড় ও প্রক্রিয়াজাত পণ্যের বৈশ্বিক চাহিদার কথা উল্লেখ করেন।
অর্থাৎ মুঘলরা ঢাকাকে সুবা বাংলার রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার বহু পূর্ব থেকেই বস্ত্রশিল্পের ওপর ভর করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল এই শহর। সোনারগাঁও ও বিক্রমপুরের বিশেষ কার্পাস সুতা, মেঘনা নদীর পানি এবং স্থানীয় সুনিপুণ কারিগরদের তৈরি মসলিন ও জামদানি বিশ্ববাজারে ঢাকার নামকে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত করেছিল।
১৬০৮, মতান্তরে ১৬১০ সালে মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের সুবাদার ইসলাম খান চিশতী প্রথম ঢাকাকে সুবে বাংলার স্থায়ী রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেন। সম্রাটের নামানুসারে তিনি শহরের নাম দেন জাহাঙ্গীরনগর। পরবর্তীতে ১৬৩৯–১৬৪০ খ্রিস্টাব্দের দিকে সম্রাট শাহজাহানের পুত্র সুবাদার শাহ শুজার আমলে সামরিক ও কৌশলগত কারণে সাময়িকভাবে রাজমহলে রাজধানী ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তখন বাংলায় এসেছিলেন পর্তুগিজ ধর্মপ্রচারক ও পর্যটক সেবাস্টিয়ান ম্যানরিক। ১৬৪০ সালের ঢাকাকে তিনি সুবা বাংলার প্রধান শহর, অত্যন্ত জনবহুল এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের মূল কেন্দ্র হিসেবে বর্ণনা করেন।
সেবাস্টিয়ান জানান, ঢাকায় বহু দেশের ব্যবসায়ীদের সমাগম ঘটত। বিশেষ করে পারস্য থেকে আসা বণিকদের চঞ্চল ও ব্যস্ততম বাণিজ্যের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। মিসর, উত্তর আফ্রিকা ও ইথিওপিয়ার রাজপরিবার ও উচ্চবিত্তদের অভিজাত আনুষ্ঠানিক পোশাকে ঢাকাই মসলিনের একচ্ছত্র কদরের কথা তিনিও জানিয়েছেন।
সেবাস্টিয়ান ঢাকার বাজারে মুদ্রার সংখ্যা শতকে গণনার বদলে ওজন করে লেনদেন করার এক বিশেষ পদ্ধতির কথা তিনি লিপিবদ্ধ করেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় আন্তর্জাতিক সমুদ্রগামী জাহাজের আনাগোনা ছিল। কেবল সুপারি বাণিজ্য থেকেই বছরে প্রায় চার হাজার রুপি সরকারি শুল্ক বা কর সংগৃহীত হতো। ঢাকা থেকে চাল, চিনি, ভোজ্যতেল, হস্তনির্মিত কাগজ এবং অত্যন্ত উন্নতমানের মসলিন ও সুতি বস্ত্র বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হতো। সেবাস্টিয়ান লিখেছেন, “ঢাকায় মসলিনের ব্যবসা ছিল অত্যন্ত লাভজনক।”
১৬৬০ সালে সুবাদার মীর জুমলা পুনরায় ঢাকায় রাজধানী ফিরিয়ে আনেন। ইতালীয় ভ্রমণকারী নিকোলাও মানুচ্চি ১৬৬৩ সালে মীর জুমলার সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং তাঁর দরবারে প্রখ্যাত ইংরেজ নৌ-স্থপতি থমাস প্র্যাটকে দেখতে পান। তিনি মানুচ্চিকে জানান, ঢাকা থেকে কেপ রুট ও সুরাট হয়ে ইউরোপে সুতি ও রেশমি বস্ত্র পাঠানো হতো। এরপর নবাব শায়েস্তা খানের শাসনকালেই ঢাকার নগরায়ণ, বাণিজ্য ও স্থাপত্যশিল্প উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছেছিল বলে উল্লেখ করেছেন ইতিহাসবিদরা। তিনি সুবে বাংলার সুবাদার হিসেবে মোট দুই দফায় প্রায় ২২–২৪ বছর শাসন পরিচালনা করেছিলেন। প্রথমবার ১৬৬৪ থেকে ১৬৭৭ সাল, প্রায় ১৩ বছর; এবং দ্বিতীয় মেয়াদে ১৬৭৯ থেকে ১৬৮৯ সাল, অর্থাৎ আরও প্রায় ১০ বছর।
মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের স্ত্রী সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের যে ভাই রাজদরবারের উজির বা প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, সেই আসফ খানের ছেলে ছিলেন এই শায়েস্তা খান। পরবর্তী সম্রাট শাহজাহানের স্ত্রী মমতাজের আপন ভাই, এবং আরেক সম্রাট ঔরঙ্গজেবের মামা। ১৬৬৯ থেকে ১৬৭৫ সালের মধ্যে, অর্থাৎ শায়েস্তা খানের শাসনামলে ঢাকায় আসেন থমাস বাউরি। ব্রিটিশ এই নাবিক, ব্যবসায়ী ও ভ্রমণকারী বঙ্গোপসাগর উপকূলীয় অঞ্চল এবং মুঘল বাংলা, বিশেষ করে ঢাকা সফর করেছিলেন। ঢাকার বিস্তার, সাধারণ বাজারদর, অর্থাৎ বাণিজ্যিক পরিবেশ ও অর্থনৈতিক জীবনের বিভিন্ন দিক নথিভুক্ত করেছিলেন তিনি।
তাঁর ভারত ও বাংলা সফরের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে একটি মূল্যবান ভ্রমণবৃত্তান্ত রচনা করেন, যা পরে ‘এ জিওগ্রাফিক্যাল অ্যাকাউন্ট অব কান্ট্রিজ রাউন্ড দ্য বে অব বেঙ্গল, ১৬৬৯–১৬৭৫’ নামে গ্রন্থবন্ধ হয়। লন্ডনের হাকলুট সোসাইটি থেকে রিচার্ড কার্নাক টেম্পল ১৮৯১ সালে এটি সম্পাদনা করে প্রকাশ করেন। ঢাকার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা বোঝার জন্য থমাস বাউরির বিবরণী অত্যন্ত প্রামাণ্য তথ্যসূত্র হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি তৎকালীন ঢাকাকে বিপুল জনসংখ্যা এবং বিশাল সুন্দর অট্টালিকায় ভরপুর এক সমৃদ্ধশালী নগরী হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তৎকালীন ঢাকায় পাওয়া দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য ও সামগ্রীর একটি বিস্তারিত মূল্যতালিকা নথিভুক্ত করে রেখে যান বাউরি। তিনি উল্লেখ করেন, সুবাদার শায়েস্তা খানের নিজস্ব প্রায় ২০টি বিশালাকার বাণিজ্যিক জাহাজ ছিল, যেগুলো শ্রীলঙ্কা, তেনাসেরিম ও মালদ্বীপ থেকে হাতি, কড়ি ও নারিকেলের আঁশ নিয়ে আসত। ঢাকায় বাণিজ্যিক পরিবহনে চার থেকে ছয় হাজার মণ পণ্য বহনে সক্ষম ‘পাতিলা’ ও ২০-৩০ দাঁড়ের ‘বুড়া’ নৌকার ব্যবহার দেখার কথাও লিখেছেন তিনি।
শায়েস্তা খানের আমলে তাঁর ভাগ্নে সম্রাট ঔরঙ্গজেবের জন্য বিশেষ প্রক্রিয়ায় প্রস্তুতকৃত একেকটি রাজকীয় জামদানির মূল্য ছিল তৎকালীন সময়ে ৩১ পাউন্ড। ওই সময়ে প্রবহমান পানির মতো স্বচ্ছ ‘আব-ই-রওয়ান’ মসলিন সাত প্যাঁচে পরিধান করার পরও শরীর দৃশ্যমান থাকা নিয়ে সম্রাট ঔরঙ্গজেব ও তাঁর কন্যা জেব-উন-নিসার ঐতিহাসিক আলোচনার বিবরণও মুঘল দরবার ও হেরেমের অন্য রাজকীয় নারীদের মসলিন প্রীতির নিদর্শন হিসেবে পরিচিত। মুঘল আমলেই রাজকীয় দরবারের রুচির সাথে মিল রেখে মসলিনের বৈচিত্র্য অনুযায়ী পারস্য ভাষায় কাব্যিক নামকরণ করা হয়েছিল বলেও লিখেছেন ইতিহাসবিদরা।
সুবাদার শায়েস্তা খানের আমলেই ফ্রান্সের প্রখ্যাত হীরা ও রত্ন ব্যবসায়ী জাঁ-বাতিস্ত তাভের্নিয়েরও ঢাকায় এসেছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি নবাবের কাছে মূল্যবান রত্ন বিক্রি করেন। ঢাকাসহ বাংলাকে কেবল সমগ্র ভারতবর্ষের নয়, বরং সংলগ্ন অন্যান্য রাজ্য ও পুরো ইউরোপের জন্য বস্ত্রের সাধারণ ভাণ্ডার বা সাময়িক কেন্দ্র হিসেবে আখ্যায়িত করে তাভের্নিয়ের জানান, ১৭ শতকে তাভের্নিয়েরই প্রথম ঢাকায় প্রস্তুতকৃত প্যাক-প্যাকেজিংয়ের পণ্য হিসেবে পাট ও পাটের আঁশকে ফ্রান্সে তথা ইউরোপে পরিচিত করিয়েছিলেন। বস্ত্র ছাড়াও ঢাকা ও বাংলা থেকে প্রচুর পরিমাণে চিনি (যা গোলকুণ্ডা ও কর্নাটকে পাঠানো হতো), মাখন, তুলা ও রেশম ইউরোপ এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হতো। কাছাকাছি সময়ে মধ্য ভারতবর্ষে এসেছিলেন ফরাসি চিকিৎসক ফ্রাঁসোয়া বার্নিয়ার। বাংলাকে মিসরের চেয়েও উর্বর বলে বর্ণনা করেন। তিনি লেখেন যে, ঢাকা ও বাংলা থেকে বিপুল পরিমাণ চাল, তুলা, রেশম, নীল, চিনি ও সোরা সরবরাহ করা হতো এবং বিশ্ববাজারে বস্ত্রের মূল উৎস ছিল এই অঞ্চল।
উইলিয়াম হ্যারিসন মোরল্যান্ড (১৮৬৮–১৯৩৮) ছিলেন একজন বিখ্যাত ব্রিটিশ সিভিল সার্ভিস কর্মকর্তা এবং মুঘল ভারতের অর্থনীতির একজন প্রখ্যাত অর্থনৈতিক ঐতিহাসিক। ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মুঘল আমলের কৃষি, রাজস্ব ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ে গভীর প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা করেন তিনি। মুঘল অর্থনৈতিক ইতিহাসের ওপর তাঁর দুটি আকর গ্রন্থ হলো— ‘ইন্ডিয়া অ্যাট দ্য ডেথ অব আকবর’ এবং ‘ফ্রম আকবর টু ঔরঙ্গজেব: এ স্টাডি ইন ইন্ডিয়ান ইকোনমিক হিস্ট্রি’।
মোরল্যান্ডের মতে, সম্রাট শাহজাহানের দরবারের অকৃপণ পৃষ্ঠপোষকতাই ঢাকাই মসলিনের খ্যাতিকে বিশ্বমঞ্চে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল। তিনি জানান, সম্রাট আকবরের আমলে আবুল ফজল তাঁর 'আইন-ই-আকবরী' গ্রন্থে মুঘল আমলের শুরুতে সোনারগাঁওয়ের মসলিন উৎপাদনের কথা লিখেছিলেন। তবে ঢাকাই এই সূক্ষ্ম বস্ত্র বিশ্বজুড়ে যে অভূতপূর্ব মর্যাদা লাভ করেছিল, তার মূলে ছিল সম্রাট শাহজাহানের দরবারের বিশেষ অনুরাগ ও অকৃপণ রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা।
সম্রাট হওয়ার পর শাহজাহান নামধারণ করা শাহজাদা খুররম ১৬২৪ সালে নিজ পিতা সম্রাট জাহাঙ্গীর এবং বিমাতা নূরজাহানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বাংলায় প্রবেশ করছিলেন। দাক্ষিণাত্য থেকে বিদ্রোহ করে ওড়িশা হয়ে তিনি বাংলায় প্রবেশ করেন। সেই সময়ে বাংলার সুবাদার ছিলেন নূরজাহানের ভাই ইব্রাহিম খান ফতেহ জঙ্গ। তিনি জাহাঙ্গীরের প্রতি অনুগত থেকে ভাগ্নের বিদ্রোহী বাহিনীকে প্রতিরোধ করার সিদ্ধান্ত নেন। বর্তমান ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্যে, সাবেক বাংলা-বিহার সীমান্তে গঙ্গা নদীর পশ্চিম তীরের রাজমহল অঞ্চলে (মুঘল আমলে ‘আকবরনগর’ নামে পরিচিত) ১৬২৪ সালের ২০ এপ্রিলের যুদ্ধে বিদ্রোহী বাহিনীর সাথে তাদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। যুদ্ধে পরাজয় নিশ্চিত জেনেও ইব্রাহিম আত্মসমর্পণ না করে বীরত্বের সাথে লড়াই করে প্রাণ দেন।
ইব্রাহিম শুধু খুররম ওরফে শাহজাহানের সৎ মামা নন, তাঁর স্ত্রী শাহজাদী মমতাজুজ-জমানী, যিনি ‘নবাব আলিয়া বেগম’ আখ্যা পেয়েছিলেন, এবং মমতাজ মহল নামে সমধিক পরিচিত ছিলেন, অর্থাৎ যাঁর সমাধি আজ তাজমহল, সেই মমতাজের আপন চাচা ছিলেন। তাঁকে পরাস্ত ও হত্যা করেই শাহজাহান সাময়িকভাবে বাংলার নিয়ন্ত্রণ কবজা করেছিলেন। রাজকীয় বিলাসতরীতে চেপে নয় দিন ভ্রমণের পর ঢাকায় পৌঁছালে প্রয়াত সুবাদারের এক ভাস্তে আহমেদ বেগ কেল্লার তোরণ উন্মুক্ত করে দেন। তিনি শাহজাহানের হাতে সরকারি কোষাগারের নগদ ৪০ লাখ টাকা ও ধনসম্পদসহ ৫০০ হাতি, ৪০০ ঘোড়া, বিপুল গোলাবারুদ ও নৌসরঞ্জাম সমর্পণ করেন। পরবর্তী সাত দিন নিহত সুবাদার ইব্রাহিম খানের বিধবা স্ত্রী রুকিয়া সুলতান বেগমের অতিথি হিসেবে থেকে ঢাকা ত্যাগ করার সময় তিনি রাজপরিবারের ব্যবহারের জন্য বিপুল পরিমাণ মিহি ঢাকাই মসলিন সাথে করে নিয়ে যান। দরবারে ফিরে গিয়ে তিনি ঢাকাই মসলিনের সূক্ষ্মতার প্রশংসা করে এই বস্ত্রের ব্যবহার ও কদর বহুগুণ বাড়িয়ে দেন।
উল্লেখ্য, রাজমহল (আকবরনগর) থেকে খুররম যখন দ্রুত নৌপথে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হন, তখন তাঁর স্ত্রী শাহজাদী মমতাজুজ-জমানী, যিনি মমতাজ মহল নামে পরিচিত এবং তৎকালীন সময়ে 'নবাব আলিয়া বেগম' হিসেবেও অভিহিত হতেন, তাঁকে রাজমহলের প্রাসাদে রাজা ভীমের পাহারায় রেখে আসেন।
ঢাকা থেকে শাহজাহান পুনরায় রাজমহলে ফিরে বেগম মমতাজ মহলকে সাথে নিয়ে পাটনার উদ্দেশ্যে রওনা হন। আন্দাজ করি, মুঘল রাজপরিবারের প্রধান সম্রাজ্ঞী হিসেবে মমতাজ মহল ঢাকাই মসলিনের 'মলবুস খাস' বা রাজকীয় জামদানিই পরিধান করতেন। যদিও কোনো ইতিহাসগ্রন্থে নূরজাহান বা জেব-উন-নিসার মতো তাঁর নাম ধরে নির্দিষ্ট কোনো মসলিন-সংক্রান্ত উপাখ্যান খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে তাঁর ফুফু, অর্থাৎ সতেরো শতকের প্রথমার্ধের সম্রাজ্ঞী নূরজাহান ঢাকার মিহি মসলিনের প্রতি অনুরাগের বিষয়টি বারবার নানাজনের লেখায় এসেছে।
মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের সাথে ১৬১১ সালে সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের বিয়ে হয়। ১৬২৭ খ্রিস্টাব্দে সম্রাটের মৃত্যু পর্যন্ত তিনি মুঘল সাম্রাজ্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী সম্রাজ্ঞী ছিলেন। ১৬১০-এর দশকে তিনিই প্রথম মুঘল হেরেমের রাজকীয় পোশাক হিসেবে এর ব্যবহার ও পৃষ্ঠপোষকতা শুরু করেন। ভাই ইব্রাহিম খান ফতেহ-জঙ্গ সুবে বাংলার সুবাদার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সম্রাজ্ঞী নূরজাহান নিজেই তাঁতিদের সুতা ও কারুকাজে নতুনত্ব আনতে উৎসাহ প্রদান করতেন। তিনি নীল রঞ্জন ও সোনা-রুপার তার (জরি) দিয়ে বস্ত্র অলঙ্করণের বাণিজ্যে ব্যক্তিগতভাবেও জড়িত ছিলেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায়।
শুধু বেগমরাই নন, মুঘল সম্রাট ও রাজপুত্ররাও (যেমন জাহাঙ্গীর, শাহজাহান, দারা শিকোহ) দরবারে মসলিনের তৈরি জামা, অঙ্গরাখা এবং চওড়া পাগড়ি (সিরবান্দ) পরিধান করতেন। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ চার্লস স্টুয়ার্ট তাঁর ১৯১০ সালে প্রকাশিত গবেষণামূলক গ্রন্থ ‘দ্য হিস্ট্রি অব বেঙ্গল’-এ মুঘল রাজদরবারে ঢাকার মসলিনের একচ্ছত্র ও অনন্য ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছেন। মুঘল দরবারের পোশাকের অভিজাত্য বিশ্লেষণ করতে গিয়ে স্টুয়ার্ট লিখেছেন, “ঢাকার সূক্ষ্ম মসলিন এবং মালদহের রেশম মুঘল রাজদরবারের পুরুষ ও নারী উভয়েরই রাজকীয় পোশাকের প্রধান অংশ ছিল।” তাঁর মতে, মুঘল সুবাদার ও সম্রাটদের রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা ঢাকাই মসলিনের প্রসার ও বিশ্বজোড়া খ্যাতির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছিল।
স্টুয়ার্টও উল্লেখ করেন, সম্রাট জাহাঙ্গীরের স্ত্রী সম্রাজ্ঞী নূরজাহান প্রথম ঢাকার মসলিনের অনবদ্য রূপ দেখে মুঘল হেরেমের জন্য রাজকীয় পোশাক হিসেবে এটি নির্বাচন করেন। তিনি ঢাকার কারিগরদের আরও সূক্ষ্ম ও নান্দনিক বস্ত্র বুননে রাজকীয় উৎসাহ প্রদান করেন। মুঘল দরবারের পুরুষরাও মসলিনের বস্ত্র পরিধান করতেন। সম্রাট জাহাঙ্গীর, শাহজাহান, আওরঙ্গজেব, রাজপুত্র ও অমাত্যরা রাজকীয় দরবারে মসলিনের তৈরি জামা, অঙ্গরাখা এবং চওড়া পাগড়ি পরিধান করতেন। রাজপরিবারের বেগমদের জন্য তৈরি হতো প্রবহমান পানির মতো স্বচ্ছ ‘আব-ই-রওয়ান’ বা ভোরের শিশিরের মতো হালকা ‘শবনম’ মসলিন। এর ওপর সোনা ও রুপার তার দিয়ে হাতে বোনা অলঙ্কৃত বস্ত্রকে ‘মলবুস খাস’ বা তৎকালীন জামদানি বলা হতো।
মুঘল সম্রাট ও রাজপরিবারের সুনির্দিষ্ট চাহিদা মেটাতে ঢাকায় বিশেষ রাজকীয় কারখানা বা ‘মলবুস খাস কুঠি’ গড়ে উঠেছিল। এই কারখানাগুলোতে উৎপাদিত সর্বশ্রেষ্ঠ মসলিনের নাম ছিল ‘মলবুস খাস’ এবং ‘সরকার-ই-আলী’। তাঁতিরা যেন নির্ধারিত সূক্ষ্মতা ও নকশা অনুযায়ী পোশাক তৈরি করেন, তা নিশ্চিত করার জন্য মুঘল দরবার থেকে ‘দারোগা-ই-মলবুস খাস’ নামক একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ঢাকায় নিযুক্ত থাকতেন। দারোগার প্রধান কাজ ছিল রাজকীয় ফরমায়েশ অনুযায়ী বস্ত্রের সূক্ষ্মতা, নকশা ও বুনন নির্ধারিত গুণগত মান বজায় রেখে তৈরি হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করা, যাতে দিল্লি বা মুর্শিদাবাদে দরবার কোনোভাবে প্রতারিত না হয়। কারখানা ও আড়ংগুলোতে কাজ তদারকির জন্য মুকিম (পরিমাপক ও সুতা যাচাইকারী), মুন্সি (কেরানি), ক্যাশ কিপার (ক্যাশিয়ার) এবং নিরাপত্তার জন্য জমাদার ও বরকন্দাজ নিযুক্ত থাকত।
'মলবুস খাস কুঠি'-তে সেরা তাঁতি ও কারিগরেরা চুক্তিবদ্ধ বা স্থায়ী বেতনভুক হিসেবে কাজ করতেন। এছাড়া তাঁতিরা রাজকীয় কাজ শেষ করে স্বাধীন বাজারে অন্যান্য দেশীয় ও বিদেশি বণিকদের কাছেও কাপড় বিক্রি করতে পারতেন। নিখুঁত বুননের জন্য তাঁতিরা রাজকীয় উপঢৌকন বা বকশিস পেতেন এবং তাঁদের সামাজিক মর্যাদা ছিল অত্যন্ত উচ্চ। মুঘল রাজকীয় কারখানা ব্যবস্থা ছিল শিল্পোৎকর্ষ কেন্দ্রিক রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা, যেখানে তাঁতিদের সামাজিক মর্যাদা ও স্বাধীনতা সুরক্ষিত ছিল।
১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দেওয়ানি লাভ করার পর এবং ১৭৬০-এর দশকে কোম্পানির বাণিজ্যিক একচেটিয়া প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হলে মুঘল ও নওয়াবি রাজকীয় তদারকি ও পৃষ্ঠপোষকতা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে 'দারোগা-ই-মলবুস খাস' পদটি বিলুপ্ত করা হয় এবং ঐতিহাসিক রাজকীয় মলবুস খাস কুঠিগুলো বন্ধ হয়ে যায়, যা পরবর্তীতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কমার্শিয়াল রেসিডেন্সি ও আড়ং ব্যবস্থার অধীনে চলে যায়। আড়ং ব্যবস্থা পরিচালনা করতেন কোম্পানির 'কমার্শিয়াল রেসিডেন্ট' (বা ফ্যাক্টরি চিফ)। আড়ংগুলোতে স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসনিক কাজ তদারকি করতেন বেতনভুক 'গোমস্তা' এবং তাঁদের সহযোগী পিয়াদা ও বরকন্দাজেরা।
ফারসি শব্দ ‘দাদনি’ অর্থ অগ্রিম। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সরাসরি প্রস্তুতকারকদের কাছে না গিয়ে দেশীয় ‘দাদনি বণিক’ বা দালালদের মাধ্যমে তাঁতিদের অগ্রিম অর্থ বা দাদনি দিয়ে কাপড় অর্ডারিং নিশ্চিত করত। পরবর্তীতে দাদনি বণিকেরা চুক্তি খেলাফ করলে কোম্পানি সরাসরি নিজস্ব ‘গোমস্তা’ নিয়োগ ও ‘এজেন্সি সিস্টেম’ চালুর মাধ্যমে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। পরবর্তীতে গোমস্তানি শাসনে রূপ নিয়ে তাঁতিদের চুক্তিভিত্তিক দেনাদারে পরিণত করে তাঁদের পেশাগত স্বাধীনতা সম্পূর্ণ খর্ব করে এবং ঢাকার ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে বিনাশের মুখে ঠেলে দেয়।
১৭৯৩ সালের 'চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত'-এর ফলে দেশীয় মুঘল আভিজাত্য ও জমিদারশ্রেণি ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় এই বিলাসী মসলিনের প্রধান অভ্যন্তরীণ বাজারটি চিরতরে হারিয়ে যায়। যার ফলে মসলিন শিল্পের ধ্বংসের ফলে ঢাকার বংশানুক্রমিক দক্ষ কারিগর শ্রেণি বা তাঁতি সম্প্রদায় মারাত্মক আর্থ-সামাজিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে।
প্রাক-ঔপনিবেশিক আমলে মুঘল দরবার ও আন্তর্জাতিক বণিকের সমাদরে বিশেষ সামাজিক মর্যাদা পাওয়া কারুশিল্পীরা ঔপনিবেশিক শোষণের অভিঘাতে রাতারাতি সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে চরম প্রান্তিক জনগোষ্ঠী হয়ে যায়। হাজার হাজার দক্ষ হস্তশিল্পী ও সুতাকাটুনিয়া পরিবার শহর ছেড়ে গ্রামীণ অঞ্চলে চলে গিয়েছিল তখন।
বাংলাদেশি ইতিহাসবিদ প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম তাঁর ‘বিজনেস হিস্ট্রি অব ঢাকা আপ টু ১৯৪৭’ শীর্ষক প্রবন্ধে ওই সময়কার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, তাঁতশিল্পে জীবিকা হারিয়ে প্রায় ৭৫০টি তাঁতি পরিবার একযোগে মৃৎশিল্পকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে বাধ্য হয় এবং ঢাকার জাফরাবাদ ও রায়েরবাজারে বসতি স্থাপন করে কুমোর হিসেবে জীবনধারণ শুরু করেছিলেন।
ফরাসি ইতিহাসবিদ ও পরিব্রাজক অ্যাবে রেনাল তাঁর বিশ্বপ্রসিদ্ধ ‘ইস্তোয়ার ফিলোজফিক এ পোলিতিক দে এতাব্লিসমঁ এ দু কমার্স দে জ্যুরোপেঅঁ দঁ লে দ্য জ্যঁদ’ গ্রন্থে আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকার তাঁতিদের করুণ অবস্থার বিবরণ দিতে গিয়ে লিখেছিলেন, “দক্ষ হওয়াটাই যেন তাদের জন্য দুর্ভাগ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কারণ অতিরিক্ত দক্ষতার কারণে তাদেরকে বাধ্য হয়ে সরকারের অধীনে কাজ করতে হতো, যেখানে তাদের ন্যায্য মজুরি দেওয়া হতো না এবং এক ধরনের বন্দিদশার মধ্যে রাখা হতো।”গোমস্তাদের অধীনে ঢাকার তাঁতিদের স্বল্প মজুরিতে পাহারা বসিয়ে কাজ করতে বাধ্য করা, পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে শারীরিক শাস্তি দেওয়া এবং দেনাদারে পরিণত করে একপ্রকার বন্দিদশায় রাখার নির্মম শোষণের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি এই মন্তব্যটি লিখেছিলেন। বি. সি. অ্যালেন ১৯১২ সালে প্রকাশিত ‘ইস্টার্ন বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গ্যাজেটিয়ার্স: ঢাকা’ গ্রন্থের ১০৬ নম্বর পৃষ্ঠায় অ্যাবে রেনালের এই ঐতিহাসিক বক্তব্যটি সরাসরি উদ্ধৃত করেছেন।
ইংল্যান্ডের রাজকীয় বাজার ও বিলেতে ১৬৬৬ সালে প্রথম ঢাকাই মসলিন প্রবেশ করে। ইউরোপীয় রাজপরিবার ও উচ্চবিত্তের ১৭ ও ১৮ শতকের ছবি, সাহিত্যিক বর্ণনা ও রাজকীয় পোশাকের দিকে তাকালে দেখা যায়, ইউরোপের অভিজাত নারীদের ফ্যাশনে ঢাকাই মসলিন এক অপরিহার্য স্থান দখল করে নিয়েছিল। ফ্রান্সের রাজপরিবার এবং অভিজাত বর্গের মধ্যে ঢাকাই মসলিনের চরম কদর তৈরি হয়েছিল। সরকারি তথ্যসূত্র অনুযায়ী, ১৭৮২ সালেই পাঁচটি মার্চেন্ট জাহাজে করে ৩৫,৭২৯ পিস মসলিন এবং ১১০ পিস বিশেষ জামদানি ফ্রান্সে রপ্তানি করা হয়েছিল। দক্ষিণ-পূর্ব ফ্রান্সের প্রোভেন্স, ইতালি ও স্পেনের রাজপরিবারগুলোতে এই বিলাসবহুল মসলিন নিয়মিত পাঠানো হতো।
১৮৪৪ সালেও ঢাকার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জন ডানবারের সরকারি রিপোর্টে লিখেছেন, ঢাকার বিশেষ মিহি সুতি ও রেশমি সুতায় বোনা নকশাদার কাসিদা ও মসলিন কলকাতা বন্দর হয়ে লোহিত সাগরের জেদ্দা বন্দরে পাঠানো হতো। সেখানকার আরব জাহাজের ক্যাপ্টেনরা (যাদের ‘নাখোদা’ বলা হতো) কাস্টমস শুল্ক পরিশোধ করে তা ক্রয় করতেন এবং পরে মক্কার বাৎসরিক মেলায় আরব, সিরিয়া ও মেসোপটেমিয়ার ব্যবসায়ীদের কাছে বিপুল দামে বিক্রি করতেন।
চলবে..












