ঢাকা,  শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, কার্তিক ৭ ১৪৩৩

একটি শহর কিংবা সূক্ষ্ম সুতার গল্প

বিশ্বসেরা বস্ত্র যেভাবে বিলুপ্ত শিল্প।

বিস্মৃত ব্যবসা

শরীফ খিয়াম আহমেদ

প্রকাশিত: ১৪:৩৫,১৯ অক্টোবর ২০২৬

আপডেট: ২০:০০,২০ অক্টোবর ২০২৬

সর্বশেষ

একটি শহর কিংবা সূক্ষ্ম সুতার গল্প

ছবি: চার্লস ডয়লি

বয়নশিল্পের হাজার বছরের ইতিহাসসমৃদ্ধ দক্ষিণ এশীয় যে বাণিজ্যকেন্দ্র ১৮ শতকের মাঝামাঝি জঙ্গলকবলিত একটি প্রান্তিক শহরে পরিণত হয়েছিল, ২০৫০ সাল নাগাদ সেটিই হতে যাচ্ছে দুনিয়ার সবচেয়ে জনবহুল মহানগর! জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের ‘বিশ্ব নগরায়ন প্রক্ষেপণ ২০২৫’ অনুযায়ী, আনুমানিক তিন কোটি ৬৬ লাখ মানুষের সেই নগরী আবার ২০২৬ সালের ইকোনোমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের সূচকে দুনিয়ার তৃতীয় বসবাস অযোগ্য শহর। ঢাকার বাস্তবতা এমনই, গল্পের মতো। প্রাক-ঔপনিবেশিক যুগে ‘বিশ্বের বস্ত্র ভাণ্ডার’ হিসেবে খ্যাতি পাওয়া এই মেগাসিটি বর্তমানে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা বাংলাদেশের রাজধানী।

সাম্রাজ্যবাদী দুঃশাসনে নিজস্ব বুনন কৌশল হারিয়ে ফেলার ধাক্কায় ১৭ শতকের নয় লাখ মানুষের এই শহরের জনসংখ্যা ১৮৬৭ সালে মাত্র ৫১ হাজার ৬৩৬ জনে নেমে এসেছিল। দুনিয়াজুড়ে আভিজাত্যের প্রতীকে পরিণত হওয়া অতিসূক্ষ্ম সুতিবস্ত্র ‘ঢাকাই মসলিন’ বিলুপ্তির কারণেই এমনটা হয়েছিল বলে খোদ ব্রিটিশ কর্মকর্তা, গবেষক ও লেখকরাই উল্লেখ করেছেন। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং ইংরেজ সরকারের অসংখ্য নথিতে বলা হয়েছে, বিলেতি সুতা ও যান্ত্রিক বস্ত্রের সাথে প্রতিযোগিতার মুখে ঢাকার বিশ্বখ্যাত মসলিন, অর্থাৎ অতিসূক্ষ্ম সুতিবস্ত্র ধ্বংস হয়েছে।

ঢাকাই মসলিন নিয়ে ইংরেজদের দলিল-দস্তাবেজ ও বইপত্রে একদিকে যেমন বিস্ময় ও মুগ্ধতা রয়েছে, অন্যদিকে দৃশ্যমান গভীর আক্ষেপ। অর্থনৈতিক স্বার্থে মসলিন শিল্পকে হত্যার পর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকরা যখন টের পেয়েছে যে তারা ঐতিহাসিক একটি শিল্পকে চিরতরে মুছে দিয়েছে, তখন এ নিয়ে নিজেদের অনুশোচনাও নথিবদ্ধ করেছে। পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়ার আগে মসলিন রপ্তানি বন্ধের কারণ হিসেবে তারা কোম্পানির একচেটিয়া বাজার শোষণ এবং শিল্পবিপ্লব-উত্তর ব্রিটেনের সুতা ও কাপড়ের মিলগুলোর স্বার্থ সুরক্ষায় সরকারের নেওয়া বৈষম্যমূলক নীতির কথাই উল্লেখ করেছেন।

ঔপনিবেশিকরা ১৮৪৪ সালে পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে মসলিন ব্যবসা পুনরুজ্জীবনের সম্ভাব্যতা যাচাই করেছিল বলেও প্রমাণ মিলেছে। সেই বছরের ২ মে ঢাকার ভারপ্রাপ্ত কমিশনার জন ডানবার এ বিষয়ে যে প্রতিবেদন জমা দেন, সেখানে উল্লেখ ছিল—সরকারের ২৪ জানুয়ারির নির্দেশ এবং ৬ ফেব্রুয়ারির চিঠির ভিত্তিতে ‘বোর্ড অব রেভিনিউ’ তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিল, “ঢাকার সূক্ষ্ম মসলিন তৈরির বর্তমান অবস্থা কেমন এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে এই ব্যবসা পুনরুজ্জীবিত করার কোনো সুযোগ আছে কি না।”

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির রাজস্ব সংগ্রহ, জরিপ, প্রশাসনিক তদারকি এবং বাণিজ্য নীতি পর্যালোচনার জন্য সর্বোচ্চ রাজস্ব কর্তৃপক্ষ হিসেবে ১৭৮৬ সালে কলকাতায় এই ‘বোর্ড অব রেভিনিউ’ গঠিত হয়েছিল। তাদেরকে দেওয়া প্রতিবেদনটি তৈরির আগে ডানবার ঢাকায় অবস্থানরত ইউরোপীয় ব্যবসায়ী ও অধিবাসী এবং স্থানীয় দেশীয় বস্ত্র প্রস্তুতকারক ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করেন। তাঁরা এবং কোম্পানির তদন্ত কর্মকর্তা আই. এ. প্রাইস ডানবারকে জানিয়েছিলেন, বিলেতি কাপড়ের প্রচুর আমদানি ও কম দামের কারণে ঢাকার মসলিন পুনরুজ্জীবিত করার সুযোগ অত্যন্ত ক্ষীণ।

ডানবার প্রতিবেদনে জানান, ঢাকার সুতি বস্ত্রের চাহিদা ১৭৮৯ সাল থেকেই ক্রমাগত কমছিল। ১৭৯৯ সালে ঢাকার বিভিন্ন আড়ং, অর্থাৎ কাপড়ের আড়ত থেকে ইউরোপে রপ্তানির জন্য তৈরি কাপড়ের বার্ষিক মূল্য ছিল সাড়ে ১২ লাখ টাকারও বেশি। ১৮১৩ সালে তা অবিশ্বাস্যভাবে কমে সাড়ে তিন লাখ টাকার নিচে নেমে আসে। ১৮১৭ সালে ইউরোপে ঢাকার মসলিন রপ্তানি প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় এবং কোম্পানির 'কমার্শিয়াল রেসিডেন্সি' দপ্তরটি গুটিয়ে নেওয়া হয়। ১৮৪৪ সাল নাগাদ বস্ত্র বাণিজ্য কেবল ভারতীয় অভ্যন্তরীণ বাজার এবং লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের জেদ্দা ও বসরার সীমিত চাহিদার মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

ডানবার আরও উল্লেখ করেন, ঢাকার এই শিল্প ধ্বংসের প্রধান কারণ হলো যুক্তরাজ্যের বাষ্পচালিত কারখানা ও যান্ত্রিক প্রযুক্তির অসামান্য বিকাশ। সেখানকার যান্ত্রিক তাঁত ও স্পিনিং মেশিনে ভারতীয় তুলো দিয়ে তৈরি সুতা ও কাপড় এত কম খরচে তৈরি হচ্ছিল যে, ঢাকার হাতে বোনা তাঁত তার সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছিল না। পূর্বে ব্রিটিশ সরকার দেশীয় যান্ত্রিক শিল্পকে বাঁচাতে ভারতীয় মসলিনের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করেছিল উল্লেখ করে এই কর্মকর্তা জানান, পরবর্তীতে সেই শুল্ক অনেক কমানো হলেও দামের বিশাল পার্থক্যের কারণে বিলেতি কাপড়ের কাছে ঢাকাই মসলিন সম্পূর্ণ হেরে যায়।

জন ডানবার তাঁর প্রতিবেদনের শেষভাগে লিখেছেন, সরকারি কোনো নীতি বা সহায়তার মাধ্যমে এই শিল্পকে আর পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব নয়। একমাত্র উপায় হতে পারে বিলেতি সুতা ও কাপড়ের আমদানির ওপর শতভাগ শুল্ক বা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা—যা ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে আশা করা পুরোপুরি অবাস্তব ছিল। তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, “এই ব্যবসা দিন দিন আরও নামতে নামতে একসময় পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যাবে এবং ঢাকার সূক্ষ্ম সুতা কাটার যে অলৌকিক কৌশল ও প্রথা প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে, তা চিরতরে হারিয়ে যাবে।”

ব্রিটিশ গবেষক ও লেখক জে. এফ. ওয়াটসনের ১৮৬৬ সালের গবেষণাগ্রন্থ ‘দ্য টেক্সটাইল ম্যানুফ্যাকচার অ্যান্ড কস্টুমস অব দ্য পিপল অব ইন্ডিয়া’ ভারতের ঐতিহ্যবাহী বস্ত্রশিল্প ও পোশাক-পরিচ্ছদের ওপর একটি প্রামাণ্য দলিল হিসেবে স্বীকৃত। সেখানে ১৮৬২ সালে লন্ডনে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শিল্প প্রদর্শনীর প্রামাণ্য নথিসূত্র তুলে ধরেন ওয়াটসন। তিনি জানান, ছয় প্রজাতির ঢাকাই মসলিন ব্রিটেনের উন্নত যান্ত্রিক কারখানায় তৈরি মসলিনের পাশে প্রদর্শিত হয়েছিল। প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত বিলেতি বস্ত্রের উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও, আন্তর্জাতিক বিচারকদের মূল্যায়নে ঢাকার হস্তশিল্পে তৈরি মসলিনই গুণগত মান ও অনবদ্য সূক্ষ্মতার দিক থেকে প্রথম স্থান অধিকার করেছিল বলে ওয়াটসন নথিভুক্ত করেন।

আরেক ব্রিটিশ গবেষক ও লেখক ডক্টর অ্যান্ড্রু ইউর ১৮৩৬ সালে প্রকাশিত ‘কটন ম্যানুফ্যাকচার্স অব ব্রিটেন’ গ্রন্থে লিখেছেন, ইংল্যান্ডের আধুনিক কারখানাগুলোতে উৎপাদিত সর্বোচ্চ মানের ২৫০ নম্বর সুতার চেয়েও বহু গুণ সূক্ষ্ম সুতা কীভাবে ঢাকার কারিগরেরা কোনো যান্ত্রিক সাহায্য ছাড়াই সাধারণ চড়কি ও চরকা দিয়ে কাটেন এবং কীভাবে তা তাঁতে বোনেন, তা ইউরোপের বিশেষজ্ঞ বিচারকদের ধারণারও অতীত। একই বইতে ডক্টর ইউর স্বীকার করেছেন, ইউরোপের সমস্ত বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন ও সর্বাধুনিক বাষ্পচালিত যন্ত্রপাতি দিয়েও ঢাকাই মসলিনের মতো সূক্ষ্ম সুতা বুনন করা সম্পূর্ণ অসাধ্য।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইতিহাসবিদ রবার্ট ওর্ম তাঁর ১৮০৫ সালের ‘হিস্টোরিক্যাল ফ্রাগমেন্টস অব দ্য মুঘাল এম্পায়ার’ বইতে উল্লেখ করেন, ১৭৫০-এর দশকের দিকে পুরো বাংলায় বস্ত্র প্রস্তুত বা সুতি শিল্প প্রায় একটি জাতীয় শিল্পে রূপ নিয়েছিল। প্রধান সড়ক বা বড় শহর থেকে কিছুটা ভেতরের দিকে এমন কোনো গ্রাম খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল, যেখানে পুরুষ, নারী ও শিশুসহ পরিবারের প্রায় প্রতিটি সদস্য কোনো না কোনোভাবে এক খণ্ড কাপড় তৈরির কাজে নিয়োজিত ছিল না। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, তৎকালীন তাঁতি ও সুতা কাটুনিদের একটি বড় অংশ একই সাথে কৃষকও ছিলেন। বিশ্ববাজারে ঢাকাই মসলিন ও বিচিত্র বস্ত্রের চাহিদা বাড়তে থাকায় অনেক কৃষক আংশিক বা পূর্ণাঙ্গভাবে তাঁতশিল্পে যুক্ত হন।

তাঁর এই বিবরণে স্পষ্ট হয় যে, মসলিন ও বস্ত্রশিল্প কেবল শহরের বাণিজ্যিক কুঠি বা আড়ং কেন্দ্রিক ছিল না, বরং তা তৎকালীন গ্রামবাংলার প্রতিটি গৃহস্থালির অর্থনীতির মূল ভিত্তি ছিল। অর্থাৎ এই খাতে সেসময়ের সুবিশাল রাজকীয় ফরমায়েশ ও পুঁজি বিনিয়োগের সাথে কেবল তাঁতিরাই নয়, বরং হাজার হাজার সুতা কাটুনি, ধোপা, রংসাজ এবং কাঁচামাল হিসেবে ‘ফুটি কার্পাস’ তুলা চাষে যুক্ত হাজার হাজার কৃষক প্রত্যক্ষভাবে জীবিকা নির্বাহ করতেন।

কোম্পানির কমার্শিয়াল রেসিডেন্ট জন টেলর ১৭৪৭ সালে ঢাকায় উৎপাদিত মসলিন ও সুতি বস্ত্রের মোট রপ্তানি ও উৎপাদন ব্যয় যে বাৎসরিক ২৮ লাখ ৫০ হাজার আরকোট রুপি ছিল, সে বিষয়ে ১৮০০ সালে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক তথ্য বিবরণী পেশ করেন। এর মধ্যে রাজকীয় দরবার ও দেশীয় আভিজাত্যদের ব্যবহারের জন্য কেনাকাটার পরিমাণ ছিল বিপুল; যেমন—দিল্লির মুঘল সম্রাটের রাজপরিবারের জন্য এক লাখ আরকোট রুপি, মুর্শিদাবাদ নবাব দরবারের জন্য তিন লাখ আরকোট রুপি, জগৎ শেঠের ব্যাংকিং হাউসের জন্য দেড় লাখ আরকোট রুপি এবং তূরানী বণিকদের মাধ্যমে উত্তর ভারতে ব্যবহারের জন্য এক লাখ আরকোট রুপির মসলিন কেনা হতো।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক রপ্তানি বাণিজ্যের অংশ ছিল অত্যন্ত বড়—আর্মেনীয় বণিকেরা মধ্যপ্রাচ্যের বসরা, মসুল ও জেদ্দার বাজারের জন্য পাঁচ লাখ আরকোট রুপি, মুঘল বণিকেরা চার লাখ আরকোট রুপি, পাঠান ও আফগান বণিকেরা দেড় লাখ আরকোট রুপি এবং স্থানীয় হিন্দু বণিকেরা দেশীয় বাজারের জন্য দুই লাখ আরকোট রুপির কাপড় কেনেন। ইউরোপীয় বাণিজ্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ইউরোপে রপ্তানির জন্য সাড়ে তিন লাখ আরকোট রুপি এবং ব্রিটিশ ব্যক্তিগত বণিকেরা দুই লাখ আরকোট রুপি, ফরাসি কোম্পানি আড়াই লাখ আরকোট রুপি এবং ফরাসি ব্যক্তিগত বণিকেরা ৫০ হাজার আরকোট রুপি এবং ওলন্দাজ কোম্পানি এক লাখ আরকোট রুপির মসলিন ও সুতি বস্ত্র ক্রয় করে।

১৭৮৭ সালে ঢাকা জেলার বাণিজ্যিক বাৎসরিক লেনদেনের ওপর প্রথম পূর্ণাঙ্গ সরকারি জরিপ পরিচালনা করেন কালেক্টর ম্যাথিউ ডে। তাঁর প্রাক্কলন অনুযায়ী, ঢাকা জেলার বাৎসরিক এক কোটি টাকার বাণিজ্যিক লেনদেনের মধ্যে একা বস্ত্র বা কাপড় খাতেরই অবদান ছিল ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকা। ১৭৯০ থেকে ১৭৯৯ সাল পর্যন্ত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও বেসরকারি ইউরোপীয় বণিকদের যৌথ উদ্যোগে ঢাকার আড়ংগুলো থেকে সর্বমোট এক কোটি ছত্রিশ লাখ ছাব্বিশ হাজার আঠারো সিক্কা রুপির মসলিন ও কাপড় রপ্তানি করা হয়। যার বার্ষিক বিভাজন ছিল—১৭৯০ সালে ২২ লাখ ৩৬ হাজার ৬৫৮ সিক্কা, ১৭৯১ সালে ১৪ লাখ ৮২ হাজার ১৪ সিক্কা, ১৭৯২ সালে ১৬ লাখ ৪৮ হাজার ১৯৯ সিক্কা, ১৭৯৩ সালে ১২ লাখ ৬৮ হাজার ২১২ সিক্কা, ১৭৯৪ সালে আট লাখ ৭৪ হাজার ৩৬৩ সিক্কা, ১৭৯৫ সালে ১১ লাখ ৭৮ হাজার ১৬২ সিক্কা, ১৭৯৬ সালে ১২ লাখ ৯৫৩ সিক্কা, ১৭৯৭ সালে ১৪ লাখ এক হাজার ৫৪৫ সিক্কা, ১৭৯৮ সালে ১০ লাখ ৭৯ হাজার ৭৪৭ সিক্কা, এবং ১৭৯৯ সালে ১২ লাখ ৫৬ হাজার ১৬০ সিক্কা রুপি।

উল্লেখ্য, আঠারো ও উনিশ শতকের আবর্তে ঢাকার মুদ্রা ব্যবস্থায় আঞ্চলিকভাবে প্রচলিত আরকোট রুপি এবং কোম্পানির প্রশাসনিক ও রাজস্ব ক্রিয়াকলাপে ব্যবহৃত স্ট্যান্ডার্ডাইজড সিক্কা রুপির মধ্যকার বিনিময় মূল্যের পরিবর্তন আর্থিক সংকোচনকে ত্বরান্বিত করেছিল বলে উল্লেখ করেছেন ব্রিটিশ লেখকরা। এই অঞ্চলে তখন আরকোট রুপি ও সিক্কা রুপি নামে দুই ধরনের রৌপ্যমুদ্রা প্রচলিত ছিল। ১৮৩৫ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বিভিন্ন অঞ্চলের ভিন্ন ভিন্ন মুদ্রার প্রচলন বন্ধ করে পুরো ভারতজুড়ে একক মুদ্রা বা কোম্পানি রুপি চালু করলে পুরনো সব রুপির লেনদেনও স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

ঢাকার কালেক্টর হিসেবে ১৮০৮ থেকে ১৮১২ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন চার্লস ডয়লি। তিনি শহরের প্রাচীন ১৯টি ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও দৃশ্যের চিত্র আঁকেন। পরবর্তীতে এই ছবিগুলো সংকলিত করে লন্ডন থেকে 'অ্যান্টিকুইটিজ অব ঢাকা' শিরোনামে বই প্রকাশ করেন। ডয়লি পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার-নওয়াবপুর এলাকার ধোলাই খালের বাণিজ্যিক গুরুত্ব হ্রাস পাওয়া ও নীরবতার চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে লেখেন, একসময় যে নালায় নাবিক ও কাঠমিস্ত্রিদের কোলাহল, ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যস্ততা এবং অভিজাতদের বজরার যাতায়াত রেশ তুলত, সেখানে পরবর্তীতে এক গভীর নীরবতা ও নির্জনতা নেমে এসেছে।

ঢাকার সিভিল সার্জন হিসেবে ১৮৪০ থেকে ১৮৪৪ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন ডক্টর জেমস টেলর। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির স্বাস্থ্য ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা হওয়ার পাশাপাশি তিনি ছিলেন তৎকালীন ঢাকার নগর ইতিহাস, স্বাস্থ্য ও সামাজিক জীবনের অন্যতম প্রখ্যাত পর্যবেক্ষক। ১৮৪০ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত গবেষণাগ্রন্থ ‘অ্যান স্কেচ অব দ্য জিওগ্রাফি অ্যান্ড স্ট্যাটিকস অব ঢাকা’ ঐতিহাসিক মহলে সংক্ষেপে ‘টপোগ্রাফি অব ঢাকা’ নামে পরিচিত। উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ঢাকার ভূগোল, আবহাওয়া, কৃষি, জনমিতি, কুটির শিল্প ও অর্থনীতির ইতিহাসে অন্যতম প্রামাণ্য এই দলিলে তিনিই প্রথম নথিভুক্ত করেন যে, ১৮১৭ সালে কোম্পানির কমার্শিয়াল রেসিডেন্সি বন্ধ ও মসলিন শিল্প অবলুপ্ত হওয়ার ফলে ঢাকার জনসংখ্যা ১৮০০ সালের দুই লাখ থেকে কমে ১৮৩৮ সালের গণনায় মাত্র ৬৮ হাজার ৩৮ জনে নেমে এসেছিল।

পরবর্তীতে ১৮৫১ সালে প্রকাশিত 'এ ডেসক্রিপ্টিভ অ্যান্ড হিস্টোরিক্যাল অ্যাকাউন্ট অব দ্য কটন ম্যানুফ্যাকচার্স অব ঢাকা ইন বেঙ্গল' গ্রন্থেও তিনি ঢাকাই মসলিন এবং জামদানি শিল্পের ওপর অত্যন্ত গভীর ও প্রামাণ্য বিবরণ রেখে গেছেন। টেলর উল্লেখ করেছেন, ঢাকার কাপাসিয়া, ভাওয়াল ও বিক্রমপুরের মেঘনা ও শীতলক্ষ্যা নদীর তীরবর্তী উঁচু জমিতে যে বিশেষ ফুটি কার্পাস উৎপাদিত হতো, তা গুণগত মানের দিক থেকে বিশ্বের সেরা ছিল। এই তুলার আঁশ থেকেই মসলিনের অতি সূক্ষ্ম সুতা তৈরি করা হতো। অতি সূক্ষ্ম সুতা কাটার সময় শুষ্ক বাতাসে যেন তা ছিঁড়ে না যায়, সেজন্য তাঁতিরা ভোরের আর্দ্র বাতাসে কাজ করতেন, অথবা তাঁতের নিচে পানির পাত্র রেখে ঘরের ভেতরে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা তৈরি করতেন।

টেলর নিজে এমন এক সুতার নমুনা পরীক্ষা করেছিলেন, যার মাত্র এক পাউন্ড ওজনের সুতা লম্বায় প্রায় ১৬০ মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তিনি মুঘল আমলের নথিসূত্র থেকে দেখান যে, সম্রাট জাহাঙ্গীরের সময় পাঁচ গজ দীর্ঘ ও এক গজ প্রস্থের একটি গোটা মসলিন খণ্ডের ওজন ছিল এক হাজার ছয়শত গ্রেইনেরও কম। টেলর মসলিনের বিভিন্ন রোমান্টিক নাম ও বৈচিত্র্যের কথা লিপিবদ্ধ করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আব-ই-রওয়ান বা প্রবহমান পানির মতো স্বচ্ছ মসলিন, শবনম বা ভোরের শিশিরের মতো হালকা মসলিন যা ঘাসের ওপর শুকাতে দিলে অদৃশ্য মনে হতো, এবং মলমল খাস, সরকার-ই-আলী ও নয়নসুখ যা দিল্লির সম্রাট ও নওয়াবদের জন্য তৈরি বিশেষ রাজকীয় মসলিন। তাঁতে মসলিন বুননের সময় তাতে সোনা, রুপা বা রঙিন সুতা দিয়ে ফুল ও জ্যামিতিক নকশা ফুটিয়ে তোলার শিল্পকে জামদানি বলা হতো।

টেলর লিখেছেন যে, জামদানি বুনন শিল্পের সূচনা সম্ভবত মুসলিম কারিগরদের মাধ্যমেই হয়েছিল এবং উনবিংশ শতাব্দীতেও, অর্থাৎ ১৮৪০ সালে, তাঁরা এককভাবে এই শিল্পের ধারা টিকিয়ে রেখেছিলেন। সাধারণ মিহি ও সাদা মসলিন বুননে হিন্দু তাঁতিরা যুক্ত থাকলেও, তাতে সূক্ষ্ম জামদানি নকশা তোলার কাজটি মূলত মুসলিম কারিগরেরাই করতেন। টেলর নবম শতকের আরব পরিব্রাজক ও বণিকদের প্রামাণ্য নথিসূত্র উদ্ধৃত করে দেখিয়েছেন যে, ইউরোপীয় যান্ত্রিক বিপ্লবের বহু পূর্ব থেকেই ঢাকার এই ঐতিহ্যবাহী বস্ত্রশিল্প অলৌকিক কারুশিল্পের মর্যাদা পেয়ে আসছিল।

ইংরেজ বণিক ও পর্যটক রালফ ফিচ যখন বাংলায় এসেছিলেন, তখন ব্রিটেনের শাসক ছিলেন রানি প্রথম এলিজাবেথ। রালফ ফিচ মূলত রানি এলিজাবেথের প্রতিনিধি বা দূত হিসেবে প্রাচ্যের বাণিজ্য সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে এবং ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের জন্য বাণিজ্য পথ উন্মুক্ত করতে ভারতে এসেছিলেন। তিনি ১৫৮৩ থেকে ১৫৮৬ সালের দিকে, অর্থাৎ মুঘল সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে, আগ্রা থেকে ১০৪টি বৈঠাচালিত নৌকার বহর নিয়ে ব্যবসায়ীদের সাথে বাংলায় আসেন। ১৫৯১ সালে তিনি লন্ডনে ফিরে যান। তাঁর এই ঐতিহাসিক ভ্রমণ বিবরণী প্রাচ্যের বাণিজ্যের বিপুল সম্ভাবনা তুলে ধরে তৎকালীন লন্ডনের বণিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।

ফিচ উল্লেখ করেন যে, সমগ্র ভারতবর্ষের মধ্যে সোনারগাঁও ছিল সবচেয়ে সেরা ও মিহি সুতি কাপড় উৎপাদনের প্রধান হাব। সেখান থেকে প্রচুর পরিমাণে সুতি কাপড় এবং চাল রপ্তানি হতো; যা কেবল সমগ্র ভারতবর্ষের চাহিদাই মেটাত না, বরং শ্রীলঙ্কা (সিলোন), পেগু (মিয়ানমার), মালাক্কা, সুমাত্রা এবং এশিয়ার অন্যান্য দূরদূরান্তের দেশেও সরবরাহ করা হতো। ফিচ লক্ষ্য করেন যে সোনারগাঁওয়ের অনেক অধিবাসী অত্যন্ত ধনী ছিলেন। কিন্তু বাঘ ও শিয়ালের উপদ্রব এবং নিরাপত্তার ভয়ের কারণে তাঁরা ধনসম্পদ ও বিলাসিতা প্রকাশ্যে রূপ দিতে দ্বিধা করতেন। ধনী হওয়া সত্ত্বেও তাঁরা বাঁশ, খড় ও বাঁশের চাটাইয়ের বেড়া দেওয়া ছোট কুঁড়েঘরে বাস করতেন এবং প্রধানত ভাত, দুধ ও ফলমূল খেয়ে জীবনধারণ করতেন।

সোনারগাঁও থেকে নদীপথে ১৮ মাইল দূরের শ্রীপুরকে একটি বিশাল বন্দর নগরী এবং সুতি কাপড়ের অন্যতম বড় ভাণ্ডার বা আড়ং হিসেবে চিহ্নিত করেন। সেখানকার শাসক রাজা চাঁদ রায় মুঘল আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে নদীকেন্দ্রিক সুরক্ষিত অবস্থান ব্যবহার করতেন। তিনি বারো ভূঁইয়া প্রধান ঈসা খাঁ ও পর্তুগিজ নাবিকদের সাথে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত মিত্রতা বজায় রাখতেন বলে ফিচ তাঁর বিবরণীতে উল্লেখ করেছেন। ফিচের বিবরণীতে প্রাচ্যের, বিশেষ করে প্রাচীন বাংলার সমৃদ্ধি, বিপুল উৎপাদনক্ষমতা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের সম্ভাবনার চিত্র স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। তাঁর এই প্রাতিষ্ঠানিক ও বাণিজ্যিক পর্যবেক্ষণ তৎকালীন লন্ডনের বণিকদের মাঝে দারুণ তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল, যা পরবর্তীতে ১৬০০ খ্রিস্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গঠন এবং প্রাচ্যে ব্রিটিশদের সুসংগঠিত বাণিজ্যে পা রাখার ক্ষেত্রে অন্যতম বড় প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল।

ভারতের প্রথম সার্ভেয়ার জেনারেল মেজর জেমস রেনেল ১৭৬৫ সালের ৩১ আগস্ট ঢাকা থেকে তাঁর বন্ধু রেভারেন্ড গিলবার্ট বুরিংটনের উদ্দেশ্যে একটি দীর্ঘ ব্যক্তিগত চিঠি লেখেন। চিঠিতে তৎকালীন ঢাকার বাণিজ্যিক অবক্ষয়, নগর পরিস্থিতি, প্রতিরক্ষা ও ভৌগোলিক পরিবেশ সম্পর্কে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণের কথা উল্লেখ রয়েছে। রেনেল জানান যে, বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ঘেঁষে প্রায় চার মাইল দীর্ঘ এবং আড়াই মাইল বিস্তৃত ঢাকা শহরটিতে কিছু বাণিজ্য তখনো অবশিষ্ট ছিল, তবে ৭০ থেকে ৮০ বছর আগে এখানে যে বিপুল বাণিজ্য হতো, সেই তুলনায় তা কিছুই নয়। এই অবক্ষয়ের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রেনেল স্বীকার করেন যে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্রমাগত যুদ্ধবিগ্রহ পুরো জনপদ তছনছ করে দিয়েছে এবং এই ধ্বংসাত্মক যুদ্ধবিগ্রহ উসকে দেওয়ার ক্ষেত্রে ইংরেজদের নিজেদেরও অনেক বড় ভূমিকা ছিল। তিনি তৎকালীন ঢাকা শহরের জনসংখ্যা ধারণা করেছিলেন সাড়ে চার লাখ।

উইলিয়াম উইলসন হান্টার ছিলেন একজন স্কটিশ-ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ, প্রাক্কলক এবং ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তিনি তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতে ডিরেক্টর জেনারেল-স্ট্যাটিস্টিকস পদে দায়িত্ব পালন করেন এবং সমগ্র ভারতবর্ষের প্রশাসনিক ও সামাজিক তথ্য সংকলনের কাজ পরিচালনা করেছিলেন। তাঁর লেখা 'এ স্ট্যাটিস্টিক্যাল অ্যাকাউন্ট অব বেঙ্গল' গ্রন্থটি ২০ খণ্ডে ১৮৭৫ থেকে ১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে লন্ডন থেকে প্রথম প্রকাশিত হয়। যার পঞ্চম খণ্ডে ঢাকা জেলাসহ পূর্ব বাংলার পরিসংখ্যানিক ও অর্থনৈতিক বিবরণ স্থান পেয়েছিল। সেখানে ১৮২০-এর দশকে ইউরোপে রপ্তানি বন্ধ হলেও বসরা, জিদ্দা, মিসর ও তুরস্কে ঢাকার মসলিনের নামমাত্র চাহিদা টিকে থাকার বিবরণ দিয়েছিলেন হান্টার। বিশপ রেজিনাল্ড হিবার ছিলেন ভারতের কলকাতা ডায়োসিসের প্রখ্যাত অ্যাংলিকান বিশপ, পর্যটক ও লেখক। ১৮২৪ সালে তিনি ঢাকা সফরকালে এখানকার জনসংখ্যা প্রায় তিন লাখ বলে ধারণা করেছিলেন।

ব্রিটিশ আমলের উচ্চপদস্থ সিভিলিয়ান প্রশাসক ও তৎকালীন ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস কর্মকর্তা বি. সি. অ্যালেন ঢাকা জেলা এবং পূর্ব বাংলার সামাজিক, অর্থনৈতিক, জনমিতিক ও ভৌগোলিক ইতিহাস নথিভুক্ত করার জন্য ১৯১২ সালে 'ইস্টার্ন বেঙ্গল ডিস্ট্রিক গেজেটিয়ার্স' নামের একটি আকরগ্রন্থ সংকলন ও রচনা করেন। সেখানে রহমান আলীর 'তারিখ-ই-ঢাকা' পাণ্ডুলিপির বরাতে তিনিই উল্লেখ করেন, মুঘল আমলে জাঁকজমকের শিখরে থাকা অবস্থায় ঢাকা শহরের জনসংখ্যা প্রায় নয় লাখ পর্যন্ত পৌঁছেছিল। পরে ১৯১১ সালের আদমশুমারিতে সমগ্র ঢাকা জেলার জনসংখ্যা নথিভুক্ত হয় ২৯ লাখ ৬০ হাজার ৪০২ জন।

অ্যালেনও তাঁর লেখায় উল্লেখ করেন যে, ঢাকার তাঁতিদের কারিগরি নৈপুণ্য ও হস্তচালিত চরকায় সুতা কাটার পরম শৈল্পিক দক্ষতা পৃথিবীর ইতিহাসে সম্পূর্ণ অদ্বিতীয় ছিল। ঢাকার এই সুসংগঠিত হস্তশিল্পীয় উৎপাদন ব্যবস্থা কেবল কোনো বিচ্ছিন্ন কারিগরি দক্ষতার ফসল ছিল না, বরং তা মুঘল রাজকীয় উৎপাদন অবকাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতার সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত ছিল। প্রাক-ঔপনিবেশিক যুগে ঢাকার বস্ত্র অর্থনীতি একটি সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও প্রশাসনিক স্তরবিন্যাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। রাজকীয় আমলাতান্ত্রিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং বিশেষায়িত আঞ্চলিক উৎপাদন কেন্দ্র অর্থাৎ আড়ংগুলোর প্রশাসনিক দক্ষতা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় ঢাকাকে একচ্ছত্র প্রাধান্য এনে দিয়েছিল।

মসলিন বস্ত্রের বৈশ্বিক চাহিদার কারণে ইউরোপীয় সামুদ্রিক বণিক কোম্পানিগুলো সপ্তদশ শতকের মধ্যভাগে, অর্থাৎ ১৬৬০-এর দশকে, সুবা বাংলার রাজধানী ঢাকায় নিজ নিজ বাণিজ্যিক কুঠি স্থাপন করতে শুরু করে। সংগঠিত কোম্পানি হিসেবে আসার আগেই ১৬৫০-এর দশকে জেমস হার্ট নামের এক ইংরেজ ব্যবসায়ী তেজগাঁওয়ে বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে তোলেন। এছাড়া ১৬৬৩ সালে মুঘল সেনাপতি মীর জুমলার দরবারে অবস্থানকারী থমাস প্র্যাট ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এজেন্ট হিসেবে ঢাকায় কাপড় সংগ্রহের কাজ করতেন। হুগলির ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের পরামর্শে ১৬৫৮ সালে লন্ডনের ‘কোর্ট অব ডাইরেক্টরস’ ঢাকায় বাণিজ্য সম্প্রসারণের অনুমতি দেয়। ১৬৬৯ খ্রিস্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তেজগাঁওয়ে তাদের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক কুঠি প্রতিষ্ঠা করে। জন মার্চ ও জন স্মিথ নামের দুই কর্মকর্তাকে ঢাকার বাণিজ্যের মূল দায়িত্ব দেওয়া হয়।

নথিভুক্ত তথ্য অনুযায়ী, ১৬৫০-এর দশকে ইউরোপীয়দের মধ্যে ওলন্দাজ বণিকেরা প্রথম ঢাকায় প্রবেশ করে তেজগাঁও শহরতলিতে একটি বাণিজ্যিক এজেন্সি খোলে। পরবর্তীতে বুড়িগঙ্গার তীরে তারা নিজস্ব কার্যালয় বা কুঠি নির্মাণ করে, যা স্থানীয়দের কাছে ‘কুঠি ওলন্দাজ’ নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে ১৮৩৪ সালে ওলন্দাজদের সমস্ত সম্পত্তি আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে হস্তান্তরিত হয় এবং এই কুঠি ওলন্দাজের জমিতেই স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতাল গড়ে ওঠে। তার আগে ডাচদেরও মূল লক্ষ্য ছিল ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে উন্নতমানের সুতি বস্ত্র, মিহি মসলিন, রেশম এবং সোরা ক্রয় করা। এসব পণ্য তারা কেবল ইউরোপে নয়, বরং দূরপ্রাচ্যের বিভিন্ন বন্দরেও রপ্তানি করত। ১৬৬৩ সালে ফরাসি পর্যটক জাঁ-বাতিস্ত তাভের্নিয়ের ঢাকায় এসে দেখেন যে, ডাচরা স্থানীয় দালাল ও পাইকারদের মাধ্যমে তাঁতিদের অগ্রিম অর্থ (দাদনি) প্রদান করে সুতি বস্ত্র ও মসলিন সংগ্রহ করত।
তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিও ঢাকা থেকে প্রচুর পরিমাণে উৎকৃষ্ট মানের মসলিন সংগ্রহ করে বিলেতে পাঠাতে শুরু করে। তবে স্থানীয় মুঘল প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও শুল্ক সংক্রান্ত জটিলতার কারণে তাঁদের ব্যবসা মাঝে মাঝে ব্যাহত হতো। যেমন—১৬৮১ সালে তাদের মোট বিনিয়োগ কমে ১৬ হাজার পাউন্ডে দাঁড়ায়। ১৬৮৮ সালে স্থানীয় নবাবের সাথে বিরোধের কারণে কোম্পানির এজেন্টদের কুঠিতে অবরুদ্ধ করা হয়। পরবর্তীতে ১৬৯০ সালে জব চার্নকের আমলে মুঘলদের সাথে যুদ্ধের জেরে ঢাকার ইংরেজ কুঠি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে ১৭২৩ সালে নবাব মুর্শিদ কুলী খানের আমলে এই কুঠি পুনরায় চাঙ্গা হয়ে ওঠে।

১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের গণ্ডি পেরিয়ে রাজনৈতিক শাসকে পরিণত হলে মসলিন কারিগর ও বিপণন ব্যবস্থার ওপর তীব্র অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক নিপীড়ন শুরু হয়। তারা চুক্তিপত্রের মাধ্যমে তাঁতিদের ওপর কঠোর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ চাপায়। তাঁতিদের থেকে মুচলেকা নেওয়া হতো যে তারা কোম্পানি ছাড়া অন্য কোনো সওদাগরকে কাপড় সরবরাহ করতে পারবে না। নির্ধারিত সময়ে কাপড় দিতে না পারলে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানা গুণতে হতো। কোম্পানির গোমস্তারা নমুনার সাথে তুলনা করে কৃত্রিমভাবে কাপড়ের মান কমিয়ে দিত।

ইতিহাসবিদরা জানান, মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দের ১২ আগস্ট লর্ড ক্লাইভের নেতৃত্বাধীন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলা, বিহার ও ওড়িশার দেওয়ানি সনদ হস্তান্তর করেন। দেওয়ানি লাভের মাধ্যমে কোম্পানি সাধারণ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা বিদেশি বণিক গোষ্ঠী থেকে প্রাদেশিক রাজস্ব সংগ্রহকারী এবং প্রকৃত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের হয়ে ওঠে। ফলশ্রুতিতে কোম্পানি একাধারে বাণিজ্যিক মুনাফাভোগী সংস্থা এবং একই সাথে দেশের রাজস্ব ও শাসনব্যবস্থার চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়।

১৭৭০-এর দশকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে ঢাকার কমার্শিয়াল প্রধান বা চিফ অব ঢাকা ছিলেন রিচার্ড বারওয়েল। ১৭৭৫ সালে সোনারগাঁও ও ঢাকার তাঁতিরা বোর্ড অব ট্রেডের কাছে তাঁর বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক অভিযোগপত্র জমা দেন। তাতে তাঁতিরা জানান যে, বারওয়েল চিফ থাকার সময় ঐতিহ্যবাহী দালাল ও পাইকারদের বরখাস্ত করে তাঁর দেওয়ান নারায়ণ দাস, ম্যাথিউ ডে এবং বিক্রম ঠাকুরকে সাথে নিয়ে তাঁতিদের ওপর অন্যায্য শর্ত চাপান। তাঁতিরা ভালো মানের কাপড় দেওয়া সত্ত্বেও বলপূর্বক তা নিকৃষ্ট মানের ধরে কম দাম দেওয়া হতো এবং প্রতিবাদ করলে সিপাহি দিয়ে মারধর করে তাড়িয়ে দেওয়া হতো।

এছাড়া কোম্পানির গোমস্তা ও এজেন্সিগুলো তাঁতিদের ওপর জোরপূর্বক দাদনি বা অগ্রিম অর্থ গ্রহণ ব্যবস্থা চাপিয়ে দেয়। দাদনি প্রথার অধীনে তাঁতিরা কোম্পানির নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কম দামে পণ্য সরবরাহ করতে বাধ্য হতো এবং অন্য কোনো দেশি-বিদেশি বণিকের কাছে কাপড় বিক্রি করার স্বাধীনতা হারাত। নির্ধারিত সময়ে চুক্তি অনুযায়ী বস্ত্র দিতে না পারলে কারিগরদের ওপর অমানবিক শারীরিক নির্যাতন ও কারাদণ্ড দেওয়া হতো। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি সত্ত্বেও পণ্যের নির্ধারিত দর এতই কম রাখা হতো যে তাঁতিদের কাঁচামাল কেনার মূলধনও থাকত না, যা স্থানীয় ক্রয়ক্ষমতা ও প্রথাগত বাজার ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়।

১৭৮০ ও ১৭৯০-এর দশকে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো ও ম্যানচেস্টারের বস্ত্র উৎপাদকেরা ব্রিটিশ সরকারের কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছিলেন যে, চড়া শুল্ক প্রাচীর দিয়ে ঢাকাই মসলিনকে বাধা না দিলে তাদের নিজস্ব যান্ত্রিক কাপড় হালে পানি পাবে না। অন্যদিকে, ব্রিটেনে শিল্প বিপ্লবের শুরুর দিকে সেখানকার উদীয়মান বস্ত্র শিল্পকে সুরক্ষার জন্য ব্রিটিশ পার্লামেন্ট একের পর এক আইন পাস করে। যুক্তরাজ্যে ভারতীয় মসলিন ও সুতি বস্ত্র আমদানির ওপর ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হয়। বিপরীতক্রমে, ভারতে ব্রিটিশ কোম্পানির উৎপাদিত সুতা ও বস্ত্র প্রবেশের ক্ষেত্রে শুল্ক সম্পূর্ণ মওকুফ বা নামমাত্র এক-দুই শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। এই শুল্ক বৈষম্য ইউরোপের বাজারে ঢাকার মসলিনের প্রতিযোগিতা করার ক্ষমতা চিরতরে স্তব্ধ করে দেয়।

শুধু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেই নয়, দেশের অভ্যন্তরে কাঁচামাল ও তৈরি কাপড়ের আদান-প্রদানকে সংকুচিত করতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নদীপথ ও হাটে-বাজারে অসংখ্য ‘সায়র’ (কাস্টমস চৌকি) স্থাপন করেছিল। পণ্য পরিবহনের সময় প্রতিটি অভ্যন্তরীণ চুঙ্গিতে পারমিট বা ‘রোয়ানা’ (ছাড়পত্র) দেখানোর নামে অন্যায্য রাজস্ব আদায় ও চরম হয়রানি করা হতো। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উচ্চপদস্থ সিভিল সার্ভিস কর্মকর্তা ও প্রশাসক চার্লস এডওয়ার্ড ট্রেভেলিয়ান তৎকালীন বাংলায় পরিচালিত অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যিক শুল্ক নীতি এবং কাস্টমস ব্যবস্থার কুফল সম্পর্কিত পর্যালোচনায় তাঁর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

তিনি ১৮৩৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অভ্যন্তরীণ শুল্ক ও নগর কর প্রথার ওপর একটি অত্যন্ত প্রামাণ্য প্রতিবেদন প্রকাশ করেন, যার শিরোনাম ছিল ‘রিপোর্ট আপন দ্য ইনল্যান্ড কাস্টমস অ্যান্ড টাউন ডিউটিজ অব দ্য বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি’। তাঁর এই প্রতিবেদনে কোম্পানি আমলে বাংলাজুড়ে নদীপথ ও মহাসড়কে স্থাপিত ‘সায়র’ (কাস্টমস চৌকি) এবং বাধ্যতামূলক 'রোয়ানা' ব্যবস্থার নামে ঘুষ, দুর্নীতি ও হয়রানির কড়া সমালোচনা করা হয়। ট্রেভেলিয়ান পর্যবেক্ষণ করে লেখেন যে, অভ্যন্তরীণ শুল্ক ব্যবস্থার এই নিষ্ঠুর চাকার নিচে পেষণ হয়ে গ্রামবাংলার সাধারণ ফেরিওয়ালা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিলেন।

১৮২০ সালের মধ্যে সোনারগাঁও, ধামরাই, জঙ্গলবাড়ি ও বাজিতপুরের মতো ঐতিহাসিক প্রধান প্রধান আড়ংগুলো বন্ধ হয়ে যায় এবং তাঁতিরা পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। বি. সি. অ্যালেনের নথিসূত্র অনুযায়ী, ১৮০৭ সালে ইউরোপে ঢাকার বস্ত্র রপ্তানির পরিমাণ কমে দাঁড়ায় সাড়ে আট লাখ টাকায় এবং ১৮১৩ সালে কোম্পানির একচেটিয়া অধিকার বিলুপ্তির সময় তা মাত্র এক লাখ বিশ হাজার একশত আটাশি সিক্কা টাকায় বা প্রায় সাড়ে তিন লাখ আরকোট রুপিতে নেমে আসে, যা ১৮১৭ সালে ইউরোপের বাজারে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। তার আগেই ১৮১৩ সালে কোম্পানি তাদের বাণিজ্যের একচেটিয়া অধিকার হারালে ঐতিহাসিক এই কমার্শিয়াল রেসিডেন্সি ও কুঠিটি চিরতরে গুটিয়ে নেওয়া হয়।

প্রসঙ্গত, বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে স্বদেশী আন্দোলনের (১৯০৫ ও ১৯২০-এর দশক) প্রভাবে বিদেশি কাপড় বর্জন ও দেশীয় সুতি কাপড় ব্যবহারের জোয়ার উঠলে ঢাকায় আবার বস্ত্র শিল্পের পুনর্জাগরণ ঘটে। ১৯২৭ সালে শীতলক্ষ্যার তীরে প্রতিষ্ঠিত ঢাকেশ্বরী কটন মিলস, ১৯২৯ সালের চিত্তরঞ্জন কটন মিলস এবং পরবর্তীতে লক্ষ্মী নারায়ণ ও ঢাকা কটন মিলস প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ঢাকায় আধুনিক যান্ত্রিক বস্ত্রকলের সূচনা হয়। এর ফলে কর্মহীন তাঁতিরা পুনরায় পেশায় ফেরেন এবং ঢাকাকেন্দ্রিক অর্থনীতি আবার চাঙ্গা হতে শুরু করে। স্বাধীনতার পর ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগে (১৯৭৭–৭৮) মূলত বিশ্ববাজারের কম মজুরির সুবিধা নিয়ে বাংলাদেশে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্প (আরএমজি) যাত্রা শুরু করে। ১৯৮০ ও ৯০-এর দশকে এই খাতটি দ্রুত বিকাশ লাভ করে ঢাকার শিল্পায়নের সর্বপ্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়।

চলবে..

ঢাকা স্ট্রিট জার্নালের জন্য ওয়ানম্যান নিউজরুমের বিশেষ প্রতিবেদন।

সর্বশেষ