ঢাকা,  শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, কার্তিক ৭ ১৪৩৩

২০৩৬ সালের মধ্যেই ফুরিয়ে যেতে পারে দেশের গ্যাসের মজুত

জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা বাড়ার আশঙ্কা, দুই থেকে তিন বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা যোগের লক্ষ্য সরকারের

দেশ ও প্রবৃদ্ধি

ডিএসজে প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২১:৫৫,১৯ অক্টোবর ২০২৬

আপডেট: ২২:৫৬,২১ অক্টোবর ২০২৬

সর্বশেষ

২০৩৬ সালের মধ্যেই ফুরিয়ে যেতে পারে দেশের গ্যাসের মজুত

ছবি- ফিকি

নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত না হলে ২০৩৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশের বিদ্যমান দেশীয় গ্যাসের মজুত নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে। এতে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর নির্ভরতা আরও বাড়বে। সেই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পের উৎপাদন ব্যয় ও সাধারণ মানুষের জ্বালানি খরচে নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সোমবার (১৯ অক্টোবর) ঢাকায় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সংগঠন ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ফিকি) আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এমন আশঙ্কার কথা তুলে ধরেন ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বাংলাদেশ জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম।

‘টেকসই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি: বাংলাদেশে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানে তিনি মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। এতে দেশের গ্যাসের মজুত কমে আসা, এলএনজি আমদানি বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানির বাজারে মূল্য অস্থিরতার কারণে অর্থনীতির ওপর তৈরি হওয়া ঝুঁকি তুলে ধরা হয়।

শফিকুল আলমের মতে, নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার না হলে ২০৩৬ সালের মধ্যে দেশীয় গ্যাসের মজুত শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে এটি একটি শর্তসাপেক্ষ পূর্বাভাস। নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার, উত্তোলনের হার এবং ভবিষ্যৎ চাহিদার পরিবর্তনের ওপর প্রকৃত পরিস্থিতি নির্ভর করবে।

বাংলাদেশের শিল্প খাতের বড় একটি অংশ প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার কারখানা এবং বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গ্যাস গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফলে দেশীয় গ্যাসের সরবরাহ কমে গেলে শুধু জ্বালানি খাত নয়, উৎপাদন ও বিনিয়োগেও এর প্রভাব পড়ে।

বিশেষ করে দেশীয় গ্যাসের ঘাটতি পূরণে আমদানি করা এলএনজির ব্যবহার বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য ওঠানামার প্রভাব দেশের শিল্প খাতে আরও বেশি পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি কিংবা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে আমদানি ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

ফিকির সভাপতি রূপালী হক চৌধুরী বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতা বাংলাদেশের আমদানিনির্ভরতার দুর্বলতা প্রকাশ করেছে। এর ফলে শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে এবং ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

তাঁর মতে, জ্বালানি নিরাপত্তা বলতে শুধু সরবরাহ নিশ্চিত করাকে বোঝালে চলবে না। সেই জ্বালানি নির্ভরযোগ্য, সাশ্রয়ী ও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হওয়াও জরুরি।

তিনি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, এলএনজি আমদানির উৎস বহুমুখী করা, জ্বালানি অবকাঠামো আধুনিকায়ন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ দ্রুত করার ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানোর আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে সরকারের কয়েকটি পরিকল্পনা তুলে ধরেন।

তিনি জানান, আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে দেশে প্রায় ১০ গিগাওয়াট বা ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।সরকারের ঘোষিত লক্ষ্য বাস্তবায়িত হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানির উৎস বহুমুখী করার সুযোগ তৈরি হবে। 

অর্থমন্ত্রী জানান, সৌরবিদ্যুতের পাশাপাশি স্থলভাগ ও সমুদ্রাঞ্চলে গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। নতুন ভাসমান ও স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল এবং জ্বালানি তেল সংরক্ষণের অবকাঠামো গড়ে তোলার সম্ভাবনাও বিবেচনা করছে সরকার।

দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণের এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য জ্বালানি সরবরাহের সক্ষমতা বাড়ানো। তবে দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমাতে দেশীয় উৎসের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাও আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকটের পাশাপাশি সরকারকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া আর্থিক দায় ও কাঠামোগত দুর্বলতা মোকাবিলা করতে হচ্ছে। সরকারের মেয়াদের দ্বিতীয় বছর থেকে জ্বালানি খাতসহ অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরতে শুরু করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। পরবর্তী বছরগুলোতে প্রবৃদ্ধি আরও জোরদার হওয়ার প্রত্যাশাও জানান।

তাঁর মতে, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা এবং দেশীয় শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে সংস্কার ও অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ কমানো প্রয়োজন।

জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ সংগ্রহের জন্য আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী, বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে অর্থায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

অর্থমন্ত্রী বলেন, শুধু জ্বালানি খাতের সংস্কার যথেষ্ট নয়। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে করব্যবস্থা, ব্যাংকিং খাত এবং পুঁজিবাজারেও সমন্বিত সংস্কার প্রয়োজন।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নীতিনির্ধারণ ও রাজস্ব আইন প্রয়োগের কার্যক্রম পৃথক করার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

অন্যদিকে, মূল প্রবন্ধে শফিকুল আলম দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের পাশাপাশি গ্যাসের অপচয় ও সিস্টেম লস কমানোর ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, আমদানিনির্ভরতা কমাতে শুধু নতুন জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা করলেই হবে না; বিদ্যমান জ্বালানির দক্ষ ব্যবহারও নিশ্চিত করতে হবে।

এ ক্ষেত্রে শিল্পকারখানায় জ্বালানির দক্ষতা বাড়ানো, ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন, সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক জলবিদ্যুৎ সহযোগিতাকে সম্ভাবনাময় উদ্যোগ হিসেবে চিহ্নিত করেন তিনি।

বিশেষ করে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করলে বিদ্যুতের একটি অংশ নিজস্ব উৎস থেকে সরবরাহের সুযোগ তৈরি হয়। এতে দিনের বেলায় গ্রিডের বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা কমতে পারে। তবে এ ধরনের বিনিয়োগ লাভজনক করতে নীতিগত স্থিতিশীলতা, উপযুক্ত অর্থায়ন এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রয়োজন।

আলোচনায় অংশ নিয়ে শেভরন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শু সিয়ং দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে স্থিতিশীল নিয়ন্ত্রক পরিবেশের ওপর গুরুত্ব দেন।

ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তামিম দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।

এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক বলেন, জ্বালানির ঘাটতি ও বাড়তি ব্যয় শিল্পের উৎপাদনশীলতা এবং বিনিয়োগকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এ পরিস্থিতিতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ এবং পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে অর্থায়ন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, জ্বালানি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পাশাপাশি সরকারের আর্থিক সক্ষমতা এবং সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি সরবরাহের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।

আলোচনায় বক্তারা বলেন, দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, আমদানি উৎসের বহুমুখীকরণ এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতির মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।

বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, বিদ্যমান গ্যাসের মজুত কমে যাওয়ার ঝুঁকি মোকাবিলায় নতুন উৎস খুঁজে বের করা। দ্বিতীয়ত, শিল্পের উৎপাদন ব্যয় সহনীয় রেখে আমদানিনির্ভরতা কমানো।

নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণে কার্যকর অগ্রগতি না হলে ভবিষ্যতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে আরও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের প্রয়োজন হতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়, শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে।

অনুষ্ঠানে সঞ্চালনা করেন এইচএসবিসি বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুব উর রহমান। এতে বিভিন্ন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহী, বিদেশি বিনিয়োগকারী, কূটনীতিক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনেরা উপস্থিত ছিলেন।
 

সর্বশেষ