ছবি- বিজিএমইএ
দেশের তৈরি পোশাক কারখানাগুলোকে পরিবেশ, শ্রমিকের অধিকার ও সুশাসনসংক্রান্ত তথ্য নিয়মিত প্রকাশের আওতায় আনতে যাচ্ছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)। এ জন্য চালু করা হয়েছে বিশেষ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। প্রাথমিকভাবে ৩২৬টি কারখানা এতে তথ্য জমা দিয়েছে। পর্যায়ক্রমে সব সদস্য কারখানার জন্য এই তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা রয়েছে সংগঠনটির।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাজধানীর উত্তরায় বিজিএমইএ কমপ্লেক্সের নূরুল কাদের অডিটোরিয়ামে ‘ইএসজি প্ল্যাটফর্ম’ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এ পরিকল্পনার কথা জানান বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান।
পরিবেশগত, সামাজিক ও সুশাসনসংক্রান্ত কার্যক্রম মূল্যায়নের আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত কাঠামোকে সংক্ষেপে ইএসজি বলা হয়। এর মাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠানের পরিবেশগত প্রভাব, শ্রমিক ও সামাজিক দায়িত্ব এবং পরিচালনব্যবস্থার স্বচ্ছতা মূল্যায়ন করা হয়।
বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাকের ক্রেতারা এখন শুধু পণ্যের দাম ও মান বিবেচনা করছেন না। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় পরিবেশগত প্রভাব, শ্রমিকদের নিরাপত্তা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং সরবরাহব্যবস্থার স্বচ্ছতাও গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য সরবরাহ করা রপ্তানিকারকদের জন্য ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য নতুন প্ল্যাটফর্মটি চালুর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে কারখানাগুলোর পরিবেশগত, সামাজিক ও সুশাসনসংক্রান্ত তথ্য একটি সমন্বিত ব্যবস্থায় সংগ্রহ এবং মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি করা।
বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, বিশ্ববাজারের পরিবর্তিত চাহিদা এবং টেকসই পোশাক শিল্পের ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের কারখানাগুলোকে আরও বেশি মানসম্মত ও তথ্যসমৃদ্ধ হতে হবে।
তিনি জানান, এখন পর্যন্ত ৩২৬টি কারখানা নতুন প্ল্যাটফর্মে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তবে এই সংখ্যা যথেষ্ট নয়। শিল্পের সামগ্রিক স্বার্থে অচিরেই সদস্য কারখানাগুলোর জন্য প্ল্যাটফর্মে তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হবে।
প্রয়োজনে এ বিষয়ে বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার কথাও জানান বিজিএমইএ সভাপতি।
নতুন প্ল্যাটফর্মটি চালুর উদ্যোগ শুরু হয়েছিল ২০১৯ সালে। বিজিএমইএর পরিচালক শেখ হোসেন মোহাম্মদ মুস্তাফিজ অনুষ্ঠানে এই উদ্যোগের পটভূমি তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, তৈরি পোশাক শিল্পকে শুধু নিয়মকানুন মেনে চলার প্রচলিত ধারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। পরিবেশ, শ্রম ও সুশাসনসংক্রান্ত মানদণ্ড পূরণকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর উপায়ে পরিণত করতে হবে।
তাঁর মতে, ৩২৬টি কারখানার তথ্য নিয়ে তৈরি প্ল্যাটফর্মটি শিল্পের স্বচ্ছতা এবং টেকসই উন্নয়নের পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক। এই খাতের আন্তর্জাতিক বাজারে অবস্থান ধরে রাখতে উৎপাদন ব্যয় ও পণ্যের মানের পাশাপাশি পরিবেশগত এবং সামাজিক মানদণ্ড পূরণের গুরুত্ব বাড়ছে।
বিশেষ করে বড় আন্তর্জাতিক ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সরবরাহব্যবস্থায় পরিবেশ ও শ্রমসংক্রান্ত ঝুঁকি মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে কারখানাভিত্তিক নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকলে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের পক্ষে নিজেদের সক্ষমতা তুলে ধরা সহজ হতে পারে।
তবে শুধু তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা চালু করলেই কারখানাগুলোর পরিবেশগত বা শ্রমসংক্রান্ত অবস্থার উন্নতি নিশ্চিত হবে না। সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যবস্থাও কার্যকর করতে হবে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এম মাসরুর রিয়াজ অনুষ্ঠানে বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির কেন্দ্রীয় অবস্থানে রয়েছে পোশাক শিল্প। দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য প্রচলিত নিয়মপালনভিত্তিক ব্যবস্থা থেকে টেকসই উৎপাদনব্যবস্থায় রূপান্তর জরুরি।
তিনি তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি সেই তথ্যের ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, শক্তিশালী রপ্তানি ভিত্তি ছাড়া বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) গবেষণা পরিচালক অধ্যাপক মুন্সি সোলায়মান বিজিএমইএর সদস্যভুক্ত সব কারখানাকে নতুন প্ল্যাটফর্মের আওতায় আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশে ডেনমার্ক দূতাবাস। কারিগরি সহযোগিতায় রয়েছে বিআইজিডি এবং ম্যাপড ইন বাংলাদেশ (এমআইবি)।
অনুষ্ঠানে ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার সরকারের অর্থনৈতিক সংস্কার উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানান। তিনি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
এদিকে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং সরকারের সংস্কার কার্যক্রম তুলে ধরেন।
তিনি জানান, গত আট মাসে সরকার জ্বালানি খাতে ৪ দশমিক ১২ বিলিয়ন ডলার ভর্তুকি দিয়েছে। এটি জ্বালানি খাতে সরকারের বড় ধরনের আর্থিক দায়ের ইঙ্গিত দেয়।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া দুর্বল অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থানের সংকট মোকাবিলায় সরকার কাজ করছে।
তিনি দাবি করেন, বিগত সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে।
অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, করের হার না বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহ বৃদ্ধি এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ২০২৯ সালে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে দারিদ্র্য কমানোর প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের জন্য এলডিসি উত্তরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে উৎপাদনশীলতা, শ্রমমান, পরিবেশগত সক্ষমতা এবং বাণিজ্য সুবিধা বজায় রাখার উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এ প্রেক্ষাপটে বিজিএমইএর নতুন ইএসজি প্ল্যাটফর্ম আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের কারখানাগুলোর পরিবেশ ও সামাজিক মানদণ্ডসংক্রান্ত তথ্য তুলে ধরার একটি মাধ্যম হতে পারে।
তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে কত দ্রুত অধিকসংখ্যক কারখানা তথ্য প্রদান শুরু করে, সেই তথ্য কতটা নির্ভরযোগ্য হয় এবং চিহ্নিত দুর্বলতা দূর করতে কারখানাগুলো বাস্তবে কী পদক্ষেপ নেয়, তার ওপর।
অনুষ্ঠানে বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান, সহসভাপতি (অর্থ) মিজানুর রহমান, পরিচালক নাফিস উদ দৌলাসহ সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বিজিএমইএর রেসপনসিবল বিজনেস হাব ও সেন্টার অব এক্সিলেন্সের প্রধান সমন্বয়কারী শেখ সুচিতা জাহান স্নেহা।















