ঢাকা,  শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, কার্তিক ৭ ১৪৩৩

১৮ বছরেও বীমায় মানিলন্ডারিংয়ের ঝুঁকি, আবার কঠোর নির্দেশনা

২০০৮ সাল থেকে একাধিক নির্দেশনা; এবার বেনামি পলিসি, প্রকৃত সুবিধাভোগী ও বড় নগদ লেনদেনে নজরদারি জোরদার

করপোরেট

ডিএসজে প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৯:৫৯,২০ অক্টোবর ২০২৬

আপডেট: ২০:৪৯,২১ অক্টোবর ২০২৬

সর্বশেষ

১৮ বছরেও বীমায় মানিলন্ডারিংয়ের ঝুঁকি, আবার কঠোর নির্দেশনা

ডিএসজে

বীমা খাতে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধে ১৮ বছর ধরে নির্দেশনা দিয়ে আসছে নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যেই আবার বেনামি পলিসি, অর্থের প্রকৃত মালিকানা ও সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্তে বিস্তারিত নির্দেশনা জারি করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। এতে নতুন করে সামনে এসেছে পুরোনো প্রশ্ন—দীর্ঘদিনের বিধান বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করেছে?

সোমবার (১৯ অক্টোবর) বিএফআইইউর জারি করা ৩৪ নম্বর সার্কুলারে জীবনবীমা ও সাধারণ বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য গ্রাহকের পরিচয় যাচাই, লেনদেন পর্যবেক্ষণ, সন্দেহজনক কার্যক্রমের প্রতিবেদন এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিএফআইইউর প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, বীমা খাতে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধের নির্দেশনা নতুন নয়। ২০০৮ সালের ১০ আগস্ট বীমা কোম্পানিগুলোর জন্য এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করা হয়েছিল। এরপর ২০১১ সালে নির্দেশিকা, ২০১৫ সালে সমন্বিত নির্দেশনা এবং ২০২২ সালে নতুন সার্কুলার জারি হয়। চলতি বছরের মার্চেও বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ইলেকট্রনিক গ্রাহক পরিচিতি যাচাইসংক্রান্ত নির্দেশিকা প্রকাশ করা হয়েছে।

প্রায় দুই দশক ধরে বীমা খাত মানিলন্ডারিং প্রতিরোধের নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় থাকলেও নতুন নির্দেশনায় গ্রাহকের পরিচয়, অর্থের উৎস, প্রকৃত সুবিধাভোগী এবং অস্বাভাবিক লেনদেনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বিএফআইইউর ২০২১-২২ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে বীমা খাতের ঝুঁকি মূল্যায়নের বিষয়টি উঠে আসে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, দ্বিতীয় জাতীয় ঝুঁকি মূল্যায়নে বীমা খাতকে তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২২ সালের নির্দেশনায় কিছু নিয়ন্ত্রক প্রতিবেদন দাখিলের বাধ্যবাধকতা কমানো হয়। একই সঙ্গে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি এবং গ্রাহকের সঠিক তথ্য সংগ্রহের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনো বীমা প্রতিষ্ঠান বেনামে বা ছদ্মনামে পলিসি খুলতে কিংবা পরিচালনা করতে পারবে না। গ্রাহকের পরিচয় নির্ভরযোগ্য ও স্বাধীন উৎস থেকে পাওয়া তথ্য ও নথির ভিত্তিতে যাচাই করতে হবে।

এ জন্য গ্রাহকের নাম, পেশা, জন্মতারিখ, বিস্তারিত ঠিকানা, জাতীয় পরিচয়পত্র বা অন্যান্য গ্রহণযোগ্য পরিচয়পত্র, ছবি এবং যোগাযোগের তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। শুধু পলিসি খোলার সময় নয়, নবায়ন ও আর্থিক লেনদেনের সময়ও প্রয়োজন অনুযায়ী গ্রাহকের তথ্য যাচাই করতে হবে।

বীমা পলিসির মাধ্যমে প্রিমিয়াম পরিশোধ এবং নির্ধারিত শর্তে দাবির অর্থ গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। এসব কার্যক্রমে প্রকৃত অর্থদাতা, পলিসির নিয়ন্ত্রণকারী এবং অর্থ গ্রহণকারী ব্যক্তির পরিচয় অস্পষ্ট থাকলে অবৈধ অর্থের উৎস গোপনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

কোনো গ্রাহকের পক্ষে অন্য ব্যক্তি পলিসি পরিচালনা করলে তিনি আইনগতভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধির পূর্ণাঙ্গ পরিচিতি ও প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানের নামে নেওয়া সম্পত্তিসংক্রান্ত বীমার ক্ষেত্রেও প্রকৃত সুবিধাভোগী শনাক্ত করতে হবে। বীমা গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণকারী শেয়ারহোল্ডার অথবা এককভাবে ২০ শতাংশ বা তার বেশি শেয়ারের মালিকের তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে হবে।

নগদ লেনদেনের ক্ষেত্রে এক দিনে ১০ লাখ টাকা বা তার বেশি অর্থ লেনদেন হলে নির্ধারিত নিয়মে বিএফআইইউকে জানাতে হবে। ব্যাংক বা মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে সম্পন্ন লেনদেনের বাইরে নগদ অর্থের ক্ষেত্রে এ প্রতিবেদন প্রযোজ্য। পরবর্তী মাসের প্রথম সাত কর্মদিবসের মধ্যে নির্ধারিত ব্যবস্থায় তথ্য দাখিল করতে হবে।

এ ছাড়া জটিল, অস্বাভাবিক কিংবা আপাতদৃষ্টিতে বৈধ অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যহীন লেনদেন শনাক্ত হলে তার কারণ যাচাই করতে হবে। গ্রাহকের আর্থিক সক্ষমতা, পলিসির ধরন এবং লেনদেনের প্রকৃতির সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ কার্যক্রমও পর্যবেক্ষণের আওতায় থাকবে।

বৈদেশিক বাণিজ্যসংক্রান্ত বীমার ক্ষেত্রেও বিশেষ যাচাইয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমদানি-রপ্তানি চুক্তি, ঋণপত্রের নম্বর ও তারিখ, পণ্যের মূল্য, আমদানিকারক ও রপ্তানিকারক দেশের নাম এবং পণ্যের বিবরণ যাচাই করতে হবে। প্রয়োজনে জাহাজীকরণসংক্রান্ত নথি ও অন্যান্য দলিল ব্যাংকের রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পণ্যের মূল্য ও চালানসংক্রান্ত তথ্যের অসংগতি অর্থপাচারের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ কারণে বাণিজ্যিক লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত বীমা পলিসির তথ্য যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

পুনঃবীমার ক্ষেত্রেও মূল বীমাকৃত ব্যক্তি এবং দাবিদারের পরিচয় জানা সম্ভব হলে তা যাচাই করতে হবে। নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অর্থ যেন পুনঃবীমা প্রিমিয়াম কিংবা সংশ্লিষ্ট লেনদেনের মাধ্যমে বীমাব্যবস্থায় প্রবেশ করতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

সরকারের নিষিদ্ধ তালিকা এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সংশ্লিষ্ট নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বীমা সম্পর্ক স্থাপন ও পরিচালনার ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ সরকারের তালিকাভুক্ত ব্যক্তি বা নিষিদ্ধ ঘোষিত সত্তা বলতে সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯-এর ১৮ ধারার ক্ষমতাবলে সরকারি গেজেটের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে বোঝানো হয়েছে।

নতুন নির্দেশনায় বীমা কোম্পানিগুলোর পরিচালনা পর্ষদ ও শীর্ষ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বও নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে নিজস্ব ঝুঁকি বিবেচনায় মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ নীতিমালা তৈরি করতে হবে। পরিচালনা পর্ষদ বা সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে তা বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হবে।

প্রধান কার্যালয়ে একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় পরিপালন ইউনিট গঠন করতে হবে। এই ইউনিট প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি মূল্যায়ন, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা বাস্তবায়ন এবং সন্দেহজনক কার্যক্রমের তথ্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর দায়িত্ব পালন করবে।

বীমা কোম্পানির শাখা, এজেন্সি, পলিসি অনুমোদন, দাবি নিষ্পত্তি এবং মধ্যস্থতাকারীদের কার্যক্রমেও সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে। ব্রোকার, ট্রাস্টি ও পেশাদার মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে পরিচালিত পলিসির ক্ষেত্রে আইনগত বৈধতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া নগদ লেনদেনের প্রতিবেদনসহ প্রয়োজনীয় নথি কমপক্ষে পাঁচ বছর সংরক্ষণ করতে হবে। বার্ষিক পরিপালন প্রতিবেদন পরিচালনা পর্ষদে উপস্থাপনের পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিএফআইইউতে দাখিল করতে হবে।

নতুন নির্দেশনা বাস্তবায়নে বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুরোনো পলিসির তথ্য হালনাগাদ, প্রকৃত সুবিধাভোগী শনাক্ত, সন্দেহজনক লেনদেন পর্যবেক্ষণ এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে।

২০০৮ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে নির্দেশনা জারির পর ২০২৬ সালে আবার বিস্তারিত সার্কুলার দেওয়ায় বীমা খাতে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগের বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। নতুন বিধান অনুযায়ী গ্রাহক যাচাই থেকে শুরু করে অর্থের উৎস, প্রকৃত সুবিধাভোগী, বড় নগদ লেনদেন ও পুনঃবীমা পর্যন্ত বিস্তৃত কার্যক্রমে নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
 

সর্বশেষ