ডিএসজে
প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) ছাড়াই দেশের পুঁজিবাজারে সরাসরি তালিকাভুক্ত হতে পারবে বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানি, বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানসহ নির্ধারিত সাত শ্রেণির প্রতিষ্ঠান। তবে এ প্রক্রিয়ায় শেয়ার বিক্রি করে কোনো অর্থ পাবে না সংশ্লিষ্ট কোম্পানি। বিক্রির পুরো অর্থ যাবে বিদ্যমান উদ্যোক্তা, পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডারদের কাছে।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) নতুন সরাসরি তালিকাভুক্তি বিধিমালায় এই সুযোগ দিয়েছে। গত ১৩ অক্টোবর জারি করা বিধিমালা ১৮ অক্টোবর সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হয়েছে। ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (ডাইরেক্ট লিস্টিং অব সিকিউরিটিজ অন দ্য স্টক এক্সচেঞ্জ) রুলস, ২০২৬’ নামের বিধিমালা গেজেট প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর হয়েছে।
নতুন বিধিমালার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তালিকাভুক্তির জন্য কোম্পানিকে নতুন শেয়ার ছেড়ে মূলধন সংগ্রহ করতে হবে না। বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডারদের হাতে থাকা শেয়ার বাজারে বিক্রির মাধ্যমেই তালিকাভুক্তি সম্পন্ন হবে। ফলে পুঁজিবাজারে নতুন কোম্পানি ও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হলেও শেয়ার বিক্রির অর্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা সম্প্রসারণ বা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর কাজে সরাসরি ব্যবহার করা যাবে না।
বিধিমালায় সাত শ্রেণির প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি তালিকাভুক্তির উপযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হলো সম্পূর্ণ বা কমপক্ষে ৫১ শতাংশ সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান; প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সরকারের অন্তত ১০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে এমন কোম্পানি; সম্পূর্ণ বা কমপক্ষে ৫১ শতাংশ বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানি; সর্বশেষ নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী অন্তত ৫০০ কোটি টাকা নিট সম্পদ রয়েছে এমন তফসিলি ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বিমা কোম্পানি; বছরে কমপক্ষে এক হাজার কোটি টাকা লেনদেন বা বিক্রয় আয় রয়েছে এমন প্রতিষ্ঠান; বিএসইসিতে নিবন্ধিত স্টক এক্সচেঞ্জ, ডিপজিটরি ও ক্লিয়ারিং-সেটেলমেন্ট কোম্পানি এবং কমিশন পরবর্তী সময়ে নির্ধারণ করবে এমন অন্য প্রতিষ্ঠান।
এতে দেশের বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর জন্য প্রচলিত আইপিওর বাইরে পুঁজিবাজারে প্রবেশের একটি বিকল্প পথ তৈরি হলো। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানের নতুন মূলধনের প্রয়োজন নেই, কিন্তু বিদ্যমান মালিকেরা তাঁদের শেয়ারের একটি অংশ সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করতে চান, তাঁদের জন্য এই ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে।
তবে যোগ্য শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত হলেই কোনো কোম্পানি স্বয়ংক্রিয়ভাবে তালিকাভুক্তির অনুমোদন পাবে না। এ জন্য আর্থিক সক্ষমতা, ব্যবসায়িক ধারাবাহিকতা, পরিচালনাগত স্বচ্ছতা এবং শেয়ারহোল্ডিং-সংক্রান্ত একাধিক শর্ত পূরণ করতে হবে।
সরাসরি তালিকাভুক্তির আবেদন করতে হলে কোম্পানিটিকে পাবলিক লিমিটেড হতে হবে এবং অন্তত পাঁচ বছর বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। সর্বশেষ দুই অর্থবছরের প্রতিটিতে মূল ব্যবসা থেকে মুনাফা অর্জন করতে হবে। পাশাপাশি পুঞ্জীভূত লোকসান থাকা চলবে না। অবশ্য সংশ্লিষ্ট স্টক এক্সচেঞ্জের সুপারিশে বিএসইসি এই মুনাফাসংক্রান্ত শর্ত শিথিল করতে পারবে।
সর্বশেষ অর্থবছরে পরিচালন কার্যক্রম থেকে নগদ প্রবাহ ইতিবাচক থাকতে হবে। কোম্পানি কিংবা তার কোনো উদ্যোক্তা বা পরিচালক বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ঋণতথ্য অনুযায়ী খেলাপি হতে পারবেন না। প্রতিষ্ঠানের ঋণমানও বিনিয়োগযোগ্য মানের নিচে থাকা চলবে না। পাশাপাশি তালিকাভুক্তির পর উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে অন্তত ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণ করতে হবে এবং ভবিষ্যতেও এই সীমা বজায় রাখতে হবে।
নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, তালিকাভুক্তির প্রথম ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে কোম্পানির পরিশোধিত শেয়ারের অন্তত ১০ শতাংশ বিদ্যমান মালিকদের বিক্রি করতে হবে। অর্থাৎ কোনো প্রতিষ্ঠানের মোট শেয়ার ১০ কোটি হলে অন্তত এক কোটি শেয়ার বাজারে ছাড়তে হবে। তবে এই শেয়ার বিক্রির বিপরীতে কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন বাড়বে না।
শেয়ার বিক্রির ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণেও সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথম ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে কোনো ব্যক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী বিক্রির জন্য নির্ধারিত মোট শেয়ারের এক শতাংশের বেশি কিনতে পারবেন না। যেমন, এক কোটি শেয়ার বিক্রির জন্য নির্ধারিত থাকলে একজন বিনিয়োগকারী সর্বোচ্চ এক লাখ শেয়ার কিনতে পারবেন।
এ ছাড়া প্রথম দুই কার্যদিবসে একক ক্রয়াদেশে ১০০টির কম কিংবা এক হাজারটির বেশি শেয়ার কেনার আদেশ দেওয়া যাবে না। বিধিমালার এই বিধানগুলো প্রাথমিক পর্যায়ে শেয়ার কেনার সুযোগ একাধিক বিনিয়োগকারীর মধ্যে ছড়িয়ে দিতে সহায়ক হতে পারে। তবে বাজারে প্রকৃত চাহিদা ও লেনদেনের ওপর এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে।
শেয়ারের মূল্য নির্ধারণেও নতুন পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। কোম্পানি ও মার্চেন্ট ব্যাংকারের পরামর্শে প্রথমে একটি নির্দেশক মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। এ জন্য অন্তত দুটি মূল্যায়ন পদ্ধতি ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর একটি হবে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আর্থিক সক্ষমতা ও সম্পদভিত্তিক মূল্যায়ন এবং অন্যটি তুলনাযোগ্য প্রতিষ্ঠানের বাজারমূল্যভিত্তিক মূল্যায়ন।
প্রথম লেনদেনের দিন শেয়ারের মূল্য আবিষ্কারের জন্য দুই ঘণ্টা সময় রাখা হয়েছে। এই সময়ে বিনিয়োগকারীরা ক্রয়াদেশ দিতে পারবেন, কিন্তু বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডাররা বিক্রয়াদেশ দিতে পারবেন না। মূল্য আবিষ্কার পর্ব শেষ হওয়ার পর বাজারে বিক্রয়াদেশ দেওয়া যাবে।
বিধিমালায় বলা হয়েছে, শেয়ারের সর্বনিম্ন চাহিদামূল্য নির্দেশক মূল্যের চেয়ে অন্তত ২৫ শতাংশ কম হতে হবে। অর্থাৎ কোনো শেয়ারের নির্দেশক মূল্য ১০০ টাকা হলে সর্বনিম্ন চাহিদামূল্য সর্বোচ্চ ৭৫ টাকা হতে পারবে। প্রথম লেনদেনের দিনে কোনো সার্কিট ব্রেকার কার্যকর থাকবে না। ফলে প্রথম দিনের বাজারদর নির্ধারণে স্বাভাবিক মূল্যসীমার নিয়ন্ত্রণ থাকবে না।
এই ব্যবস্থায় শেয়ারের প্রকৃত বাজারমূল্য আবিষ্কারের সুযোগ থাকলেও প্রথম দিনেই বড় ধরনের মূল্য ওঠানামার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে নতুন তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ও সরবরাহের মধ্যে বড় ব্যবধান থাকলে দামের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
বিধিমালায় বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডারদের ওপরও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। সরাসরি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে শেয়ার বিক্রির প্রস্তাবদাতারা প্রথম লেনদেনের দিন থেকে এক বছর সংশ্লিষ্ট কোম্পানির কোনো শেয়ার কিনতে পারবেন না। একই সঙ্গে তালিকাভুক্তির পর একটি পূর্ণ অর্থবছর শেষ হওয়ার পর অনুষ্ঠিত প্রথম বার্ষিক সাধারণ সভা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা তালিকাভুক্তির সময় নিজেদের হাতে থাকা শেয়ারের ৫০ শতাংশের বেশি বিক্রি করতে পারবেন না।
এই বিধানের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের একবারে বড় অংশের শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ সীমিত করা হয়েছে।
সরাসরি তালিকাভুক্তির আবেদন ও অনুমোদনের ক্ষেত্রে স্টক এক্সচেঞ্জকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আবেদন পাওয়ার ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে কোনো ঘাটতি থাকলে তা জানাতে হবে। সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে ঘাটতি পূরণ করতে হবে। সব শর্ত পূরণের পর ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে স্টক এক্সচেঞ্জ তালিকাভুক্তির অনুমোদন দিতে পারবে।
এ ক্ষেত্রে স্টক এক্সচেঞ্জকে কোম্পানির আর্থিক বিবরণী, ব্যবসায়িক সক্ষমতা, ঋণ পরিশোধের ইতিহাস, সম্পদের মূল্যায়ন এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করতে হবে। প্রয়োজনে কারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন এবং স্বাধীন বিশেষজ্ঞ নিয়োগের সুযোগও রাখা হয়েছে।
কোম্পানির প্রকাশিত তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব থাকবে উদ্যোক্তা, পরিচালক, নিরীক্ষক, মূল্যনির্ধারক ও মার্চেন্ট ব্যাংকারদের ওপর। ভুল, অসম্পূর্ণ কিংবা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা প্রচলিত আইন অনুযায়ী দায়বদ্ধ থাকবেন।
বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বিনিয়োগকারীদের তথ্যপ্রাপ্তির ওপর। তালিকাভুক্তির অনুমোদন পাওয়ার তিন কার্যদিবসের মধ্যে কোম্পানির বিস্তারিত তথ্যবিবরণী প্রকাশ করতে হবে। প্রথম লেনদেনের অন্তত ১০ দিন আগে এই তথ্য প্রকাশ করতে হবে, যাতে বিনিয়োগকারীরা আর্থিক অবস্থা, ঝুঁকি, মালিকানা কাঠামো ও শেয়ারের মূল্যায়ন সম্পর্কে ধারণা নিতে পারেন।
তথ্যবিবরণীতে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে, শেয়ার বিক্রির অর্থ কোম্পানি পাবে না। অর্থ যাবে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা, পরিচালক ও প্রাথমিক শেয়ারহোল্ডারদের কাছে। একই সঙ্গে তালিকাভুক্তির অনুমোদন দেওয়া মানেই স্টক এক্সচেঞ্জ কোম্পানিটির আর্থিক সক্ষমতা কিংবা বিনিয়োগের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিচ্ছে না।
পুঁজিবাজারের জন্য নতুন বিধিমালার তাৎপর্য রয়েছে মূলত দুটি জায়গায়। প্রথমত, দীর্ঘদিন তালিকাভুক্তির বাইরে থাকা বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দ্বিতীয়ত, আইপিওর মাধ্যমে কোম্পানির নতুন মূলধন সংগ্রহের পরিবর্তে বিদ্যমান মালিকদের শেয়ার বিক্রির একটি পৃথক বাজারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলো।
তবে সরাসরি তালিকাভুক্তি সফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে কোন ধরনের কোম্পানি এই সুযোগ গ্রহণ করে, তাদের শেয়ারের মূল্য কতটা যৌক্তিকভাবে নির্ধারিত হয় এবং বাজারে কতটা বিনিয়োগকারী চাহিদা তৈরি হয় তার ওপর। শুধু নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত হলেই পুঁজিবাজারে নতুন উৎপাদনশীল বিনিয়োগ সৃষ্টি হবে না। এ জন্য কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা, সুশাসন ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে বিদেশি মালিকানাধীন বড় কোম্পানিগুলো এই সুযোগ গ্রহণ করলে পুঁজিবাজারে প্রতিষ্ঠানের বৈচিত্র্য বাড়তে পারে। তবে নতুন বিধিমালা তাদের তালিকাভুক্তি বাধ্যতামূলক করেনি; কেবল নির্ধারিত শর্তে তালিকাভুক্ত হওয়ার সুযোগ দিয়েছে।
২০১৫ সালের ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের তালিকাভুক্তি বিধিমালায় থাকা সরাসরি তালিকাভুক্তিসংক্রান্ত ৮ থেকে ১৩ নম্বর বিধান বাতিল করে নতুন এই বিধিমালা কার্যকর করা হয়েছে। ফলে সরাসরি তালিকাভুক্তির জন্য এখন একটি পৃথক ও বিস্তারিত নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরি হলো।














