ছবি- ডিএসই
বড় বিনিয়োগের পরও বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরুর আগে লোকসান দেখানো কোম্পানিগুলোর পুঁজিবাজারে আসার পথ সহজ করতে যাচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। বিদ্যমান আইপিও নীতিমালায় পুঞ্জীভূত লোকসানের কারণে তালিকাভুক্তিতে যে বাধা রয়েছে, তা পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে এই সুযোগের অর্থ লোকসানে পরিচালিত যেকোনো কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া নয়।
সোমবার (১২ অক্টোবর) রাজধানীর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) মাল্টিপারপাস হলে বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে এসব কথা জানান বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান।
ডিএসই ও ডিএসই ব্রোকারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ) যৌথভাবে সেমিনারটির আয়োজন করে।
বিএসইসি চেয়ারম্যান জানান, নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তি সহজ করার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আইপিও নীতিমালায় বড় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। আগামী দু-এক দিনের মধ্যে প্রস্তাবিত নীতিমালার খসড়া জনমত গ্রহণের জন্য কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে।
বর্তমান বিধান অনুযায়ী, পুঞ্জীভূত লোকসান রয়েছে এমন কোম্পানির পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে। কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্র, হোটেল, সিমেন্ট ও ইস্পাত কারখানার মতো বড় প্রকল্পে উৎপাদন বা বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করতে দীর্ঘ সময় লাগে। এ সময়ে বিপুল মূলধন বিনিয়োগের পাশাপাশি প্রাথমিক লোকসানও তৈরি হতে পারে।
বিএসইসি চেয়ারম্যানের বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন নীতিমালায় এ ধরনের প্রকল্পের বিনিয়োগকালীন লোকসান ও ব্যবসায়িক বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়ার সুযোগ রাখা হচ্ছে। তবে কোনো কোম্পানির লোকসানের কারণ, প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের সম্ভাবনা যাচাইয়ের গুরুত্বও তুলে ধরেন তিনি।
প্রস্তাবিত সংস্কারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে কোম্পানির আর্থিক তথ্য ও নথিপত্র যাচাইয়ের পরিধি বাড়ানো। বর্তমানে ডিএসই ও বিএসইসি বিভিন্ন নথি পরীক্ষা করলেও সংশোধিত নীতিমালায় নিরীক্ষকদের আরও বিস্তৃত দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। যাচাইপ্রক্রিয়াকে ফরেনসিক নিরীক্ষার কাছাকাছি পর্যায়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছেন কমিশন চেয়ারম্যান।
এ ছাড়া আইপিওর মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ দিয়ে ঋণ পরিশোধের বিদ্যমান শর্তও পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে। বর্তমানে এ ক্ষেত্রে প্রচলিত ৩০ শতাংশের সীমা বাড়ানোর বিষয়টি কমিশনারা বিবেচনা করছেন বলে জানান মাসুদ খান। পাশাপাশি শেয়ারের মূল্য নির্ধারণে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি অনুসরণের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, পুঁজিবাজারের গভীরতা বাড়াতে আইপিও নীতিমালা সংস্কারের পাশাপাশি সরাসরি তালিকাভুক্তির বিধিমালা প্রণয়ন, উন্মুক্ত মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের বিকাশ এবং নতুন বিনিয়োগপণ্য চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আইপিওতে বিনিয়োগের আগে কোম্পানির আর্থিক বিবরণী, পরিচালন কার্যক্রম থেকে সৃষ্ট নগদ প্রবাহ এবং প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা পর্যালোচনা করতে হবে। অস্বাভাবিক মুনাফার প্রতিশ্রুতি কিংবা যাচাইহীন তথ্যের ভিত্তিতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
এদিকে পুঁজিবাজারে প্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণার ঝুঁকি নিয়েও সেমিনারে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বিএসইসির কমিশনার অ্যাডভোকেট নাহিদ মাহতাব বলেন, প্রযুক্তির অগ্রগতিতে বিনিয়োগ সহজ হলেও প্রতারকেরা একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে দ্রুত বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে।
তিনি জানান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উন্নত তথ্যবিশ্লেষণ প্রযুক্তির মাধ্যমে সন্দেহজনক লেনদেনের ধরন শনাক্ত করা সম্ভব। তবে প্রযুক্তির মাধ্যমে পাওয়া সতর্কসংকেতের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আগে মানুষের পর্যালোচনা ও বিচার-বিবেচনা থাকতে হবে।
ডিএসইর চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা তথ্য, বিনিয়োগ প্রতারণা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা পুঁজিবাজারে আস্থার সংকট বাড়াচ্ছে। অনেকেই নিজেদের বাজারবিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন ধরনের কারিগরি বিশ্লেষণ প্রকাশ করছেন। এসব বিশ্লেষণের কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থে পরিচালিত হচ্ছে।
তিনি জানান, ডিজিটাল প্রতারণা মোকাবিলায় ডিএসইর নজরদারি ও পর্যবেক্ষণব্যবস্থা আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের সচেতনতা বাড়াতে বিএসইসির সঙ্গে কাজ করছে স্টক এক্সচেঞ্জ।
পুঁজিবাজারের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার বিষয়টিও তুলে ধরেন মমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো বিনিয়োগ ব্যাংক কার্যক্রম পরিচালনা করছে না। দেশের অধিকাংশ মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের আকার ও সক্ষমতাও সীমিত। শক্তিশালী ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান, মার্চেন্ট ব্যাংক ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের ঘাটতি বাজারের আস্থার সংকট কাটিয়ে ওঠাকে কঠিন করে তুলছে।
ডিবিএর সভাপতি সাইফুল ইসলামের সভাপতিত্বে সেমিনারে বিএসইসির কমিশনার তানবীর হাবিব রহমান, মো. নাফিজ আল তারিক, হোসাইন সাহাদতসহ পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।













