ছবি- ইআরএফ
বাংলাদেশে একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় প্রাথমিক অনুমোদন সংগ্রহ করে যন্ত্রপাতি আমদানির ঋণপত্র খোলার পর্যায়ে পৌঁছাতেই গড়ে ৩৫৫ দিন লেগে যায়। ব্যবসা শুরুর আগেই প্রায় এক বছর প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় আটকে থাকার এই পরিস্থিতি বদলাতে ২০২৭ সালের মধ্যে লাইসেন্স ও অনুমোদনব্যবস্থায় বড় সংস্কার আনতে চায় সরকার।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাজধানীতে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) ও বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউট (বিএফটিআই) আয়োজিত এক সেমিনারে সরকারের এই পরিকল্পনার কথা জানান বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ ও করণীয় নিয়ে আয়োজিত সেমিনারে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর অন্যতম পূর্বশর্ত হচ্ছে ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া সহজ করা। বর্তমানে ট্রেড লাইসেন্স, ব্যাংক হিসাব, প্রাথমিক ছাড়পত্র এবং আমদানি নিবন্ধন সনদ সংগ্রহ করে যন্ত্রপাতি আমদানির ঋণপত্র খোলা পর্যন্ত গড়ে ৩৫৫ দিন সময় লাগে। এত দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় উদ্যোক্তার ব্যবসা শুরুর আগ্রহ ও উদ্যম ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
মন্ত্রীর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, একজন উদ্যোক্তার ব্যবসা শুরুর প্রস্তুতির প্রায় ৯৭ শতাংশ সময়ই একটি বছরের সমান। অর্থাৎ উৎপাদন শুরুর জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানির প্রক্রিয়ায় পৌঁছানোর আগেই দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। এতে নতুন বিনিয়োগের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন বিলম্বিত হওয়ার পাশাপাশি ব্যবসা শুরুর প্রাথমিক ব্যয় ও অনিশ্চয়তা বাড়ার ঝুঁকি থাকে।
এই দীর্ঘসূত্রতা কাটাতে ট্রেড লাইসেন্স প্রদানের পুরো প্রক্রিয়া একটি কেন্দ্রীয় অনলাইন ব্যবস্থায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা করেছে সরকার। নতুন ব্যবস্থায় দেশের ভেতরে কিংবা বিদেশে অবস্থান করেও উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে এবং নির্ধারিত ফি পরিশোধ করে ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহ করতে পারবেন।
বর্তমানে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া হয়। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় এই কর্তৃত্বের পরিবর্তে সেবাপ্রাপ্তির প্রক্রিয়া সহজ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অনলাইনে পরিশোধ করা লাইসেন্স ফি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছে যাবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরের (আরজেএসসি) সেবাও পুরোপুরি অনলাইনে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়িক লাইসেন্স ও অনুমোদনের মেয়াদ তিন থেকে পাঁচ বছর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ঘন ঘন লাইসেন্স নবায়নের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে না। বিশেষ করে একাধিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি লাইসেন্স ব্যবস্থা সময় ও পরিচালন ব্যয় কমাতে সহায়ক হতে পারে।
শুধু লাইসেন্স প্রদান নয়, শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের ব্যবস্থাও সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। বর্তমানে বিভিন্ন সংস্থা নিজ নিজ দায়িত্বের আওতায় পৃথকভাবে পরিদর্শন করে থাকে। এর পরিবর্তে সমন্বিত পরিদর্শনব্যবস্থা চালুর উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর হলে একই প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন সংস্থার বারবার পরিদর্শনের প্রয়োজন কমতে পারে। তবে পরিদর্শন সমন্বয়ের পাশাপাশি শ্রমিকের নিরাপত্তা, পরিবেশগত মান ও অন্যান্য আইনগত বাধ্যবাধকতা যথাযথভাবে নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের প্রত্যাশা, এসব সংস্কারের মাধ্যমে ২০২৭ সালের মধ্যে ব্যবসার লাইসেন্স ও অনুমোদন সংগ্রহে উদ্যোক্তাদের দীর্ঘ সময় ব্যয়ের পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে।
ব্যবসা সহজ করার এই উদ্যোগ এমন সময়ে নেওয়া হচ্ছে, যখন বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। উত্তরণ হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিদ্যমান কিছু বিশেষ সুবিধা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে। ফলে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে উৎপাদন ব্যয়, ব্যবসা পরিচালনার সময় এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর গুরুত্ব বাড়ছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, এলডিসি উত্তরণের সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের প্রস্তুতি যথেষ্ট ছিল না। অর্থনৈতিক সক্ষমতা তৈরির পরিবর্তে উত্তরণকে রাজনৈতিকভাবে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই ঘাটতি কাটাতে সরকার তিন বছর অতিরিক্ত সময় চেয়েছে।
তিনি জানান, উত্তরণ পেছানোর বিষয়ে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) ধাপ অতিক্রম করেছে বাংলাদেশ। এরপর জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদে (ইকোসক) তিন বছর সময় বাড়ানোর বিষয়টি উত্থাপন করা হয়েছে। চলতি অক্টোবরের মধ্যেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসবে বলে আশা করছেন তিনি।
বাড়তি সময় পাওয়া গেলে তা শুধু উত্তরণ বিলম্বিত করার জন্য নয়, বরং অর্থনীতির প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর কাজে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এ জন্য সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভাগ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশাধিকার ধরে রাখতে ২০২৬ ও ২০২৭ সালের মধ্যে আট থেকে দশটি দেশের সঙ্গে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সেপা) অথবা মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তির আলোচনা এগিয়ে নিতে প্রধান আলোচক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রথম দফার কারিগরি আলোচনার প্রস্তুতি চললেও দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়নি। এলডিসি উত্তরণের আগেই ইইউর সঙ্গে আলোচনা শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। পাশাপাশি জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়ার প্রস্তুতিও চলবে।
আঞ্চলিক বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে (আরসেপ) বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন পাওয়া গেছে বলেও জানিয়েছেন মন্ত্রী। এখন প্রক্রিয়াগত কাজ চলছে।
তবে শুধু আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার পেলেই বিনিয়োগ বাড়বে না বলে মনে করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তাঁর মতে, বিনিয়োগকারীদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, সহজ ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া এবং বাণিজ্যিক বিরোধের স্বচ্ছ আইনি নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা জরুরি।
জ্বালানিসংকটকে নতুন বিনিয়োগের অন্যতম বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি জানান, গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন ও গ্যাসকূপ খননের কাজ চলছে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহে অনিশ্চয়তা দেখা দিলে বাংলাদেশ দ্রুত চাপে পড়ে। এর অন্যতম কারণ পর্যাপ্ত কৌশলগত মজুত ও সংরক্ষণসক্ষমতার অভাব। এই দুর্বলতা কাটাতেও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন মন্ত্রী।
অর্থনৈতিক বিবেচনায় সরকারের সামনে এখন দুটি সমান্তরাল চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একদিকে এলডিসি উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা, অন্যদিকে দেশের ভেতরে বিনিয়োগের প্রশাসনিক ও অবকাঠামোগত বাধা কমানো। বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়লেও ব্যবসা শুরুর দীর্ঘসূত্রতা এবং জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলে সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হবে।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ইআরএফ সভাপতি দৌলত আক্তার মালা। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএফটিআইর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মোস্তফা আবিদ খান। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ইআরএফের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য এসএসএম মঈনুল হক।















