ডিএসজে
আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে না পারার সংকট থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের আর্থিক বিপর্যয়ের পরও নতুন করে ব্যাংকটিতে জমা হয়েছে ৪ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা। সর্বশেষ প্রান্তিকে নতুন হিসাব খুলেছেন ১ লাখ ৫৭ হাজার ৩০০ গ্রাহক। বিপর্যস্ত ব্যাংকটির প্রতি আস্থা ফেরার প্রাথমিক ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা যাচ্ছে এই প্রবণতাকে।
তবে ব্যাংকটির সংকট পুরোপুরি কাটেনি। সেপ্টেম্বর থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত গ্রাহকেরা তুলে নিয়েছেন ১০ হাজার ৪১৫ কোটি টাকা। একই সময়ে নতুন আমানতের তুলনায় উত্তোলন হয়েছে ৫ হাজার ৭৩২ কোটি টাকা বেশি। অর্থাৎ, নতুন করে অর্থ জমা পড়লেও পুরোনো আমানত ফেরতের চাপ এখনো উল্লেখযোগ্য।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
ব্যাংকটির বর্তমান পরিস্থিতি বুঝতে হলে এর প্রতিষ্ঠার পেছনের সংকটের দিকে তাকাতে হবে। ঋণ বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ ও খেলাপি ঋণের ভারে বিপর্যস্ত পাঁচটি ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়। এসব ব্যাংকের আর্থিক পরিস্থিতি এতটাই নাজুক হয়ে পড়েছিল যে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতাই ছিল না।
একপর্যায়ে নিজেদের সঞ্চিত অর্থ তুলতে গিয়ে বিপাকে পড়েন বিপুলসংখ্যক আমানতকারী। ব্যাংকগুলোতে অর্থ থাকলেও প্রয়োজনের সময় তা তুলতে না পারার অভিজ্ঞতা গ্রাহকদের আস্থায় বড় আঘাত করে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষা ও আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নেয় সরকার।
এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় সরকারি অর্থায়নের ব্যবস্থা করা হয়। অর্থাৎ, ব্যাংকগুলোর ঋণ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম ও আর্থিক বিপর্যয়ের পর আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে। এর ফলে ব্যাংকটির পুনরুদ্ধারের প্রশ্নের সঙ্গে জনগণের অর্থের যথাযথ ব্যবহার এবং দায়ী ব্যক্তিদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের বিষয়টিও জড়িয়ে রয়েছে।
এই পটভূমিতে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে নতুন আমানত আসার বিষয়টি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কয়েক মাস আগেও যে ব্যাংকগুলোর গ্রাহকেরা নিজেদের জমানো অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় ছিলেন, সেই একীভূত ব্যাংকেই এখন নতুন করে অর্থ জমা হচ্ছে।
সেপ্টেম্বর থেকে ব্যাংকটিতে নতুন আমানত এসেছে ৪ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা। একই সঙ্গে সর্বশেষ প্রান্তিকে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৩০০ জন নতুন গ্রাহক হিসাব খুলেছেন।
নতুন হিসাব খোলা এবং আমানত জমা হওয়ার এই দুটি সূচক ব্যাংকটির কার্যক্রমের প্রতি গ্রাহকদের আগ্রহের ইঙ্গিত দেয়।
অন্যদিকে, পুরোনো আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের কার্যক্রমও চলছে। গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত ব্যাংকটি থেকে অর্থ উত্তোলনের জন্য আবেদন করেছেন ২ লাখ ৮৫ হাজার ৩৫৯ জন গ্রাহক। তাঁরা মোট ৯ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা উত্তোলনের আবেদন করেন।
এর মধ্যে ২ লাখ ৩৭ হাজার ৬৯২ জন গ্রাহক ৬ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকা উত্তোলন করেছেন। অর্থাৎ, আবেদনকারী গ্রাহকদের প্রায় ৮৩ দশমিক ৩০ শতাংশ ইতিমধ্যে অর্থ তুলেছেন। অবশিষ্ট ৪৭ হাজার ৬৬৭ জন গ্রাহকের আবেদনের বিপরীতে ৩ হাজার ৯৭ কোটি টাকা এখনো উত্তোলিত হয়নি।
এদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত বিশেষ স্কিম ও এর বাইরে স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম মিলিয়ে সেপ্টেম্বর থেকে মোট উত্তোলন হয়েছে ১০ হাজার ৪১৫ কোটি টাকা। এটি শুধু আবেদনভিত্তিক ৬ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকা উত্তোলনের হিসাবের চেয়ে বিস্তৃত।
আমানত ফেরতের এই অগ্রগতি ব্যাংকটির প্রতি আস্থা পুনর্গঠনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কোনো ব্যাংকে নতুন অর্থ জমা রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনের সময় সেই অর্থ ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা গ্রাহকদের অন্যতম প্রধান বিবেচনা।
ব্যাংকটির আর্থিক পুনরুদ্ধারে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ঋণ আদায়। একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর সংকটের পেছনে ঋণ বিতরণে অনিয়ম ও অর্থ ফেরত না আসার বড় ভূমিকা ছিল। ফলে শুধু সরকারি অর্থায়নের মাধ্যমে আমানত ফেরত দেওয়াই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। ব্যাংক থেকে বেরিয়ে যাওয়া অর্থ পুনরুদ্ধার এবং বিদ্যমান ঋণ থেকে নিয়মিত আদায় নিশ্চিত করাও জরুরি বলে মনে করেন ব্যাংকাররা।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ঋণ আদায় জোরদার করতে গঠিত বিশেষ ‘রিকভারি ওয়ার-রুম’-এর কার্যক্রমের মাধ্যমে এ পর্যন্ত ৩ হাজার কোটি টাকা আদায় করা হয়েছে।
আমানত ফেরত ও ঋণ আদায়ের পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ কার্যক্রমও শুরু করেছে ব্যাংকটি। সর্বশেষ প্রান্তিকে নতুন করে ১ হাজার ৩৬ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। এর অধিকাংশই খুচরা গ্রাহক এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা খাতে দেওয়া হয়েছে। এটি ব্যাংকটির স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কার্যক্রম সচল হওয়ার আরেকটি লক্ষণ।
ব্যাংকটির দৈনন্দিন লেনদেনেও কার্যক্রম চলছে। আলোচ্য সময়ে ৬৩০ কোটি টাকা মূল্যের ১৪ হাজার ১৭৬টি পে-অর্ডার ইস্যু করা হয়েছে।
বৈদেশিক বাণিজ্যে মোট ১৬ হাজার ৬৮১টি লেনদেন হয়েছে, যার আর্থিক পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ২ হাজার ৯৬৪টি রপ্তানি লেনদেনের মাধ্যমে এসেছে ১ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা। অন্যদিকে, ৩ হাজার ২৭৩টি আমদানি লেনদেনের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ২৪০ কোটি টাকা।
এ ছাড়া ১০ হাজার ৪৪৪টি লেনদেনের মাধ্যমে ১০২ কোটি টাকার প্রবাসী আয় এসেছে। রপ্তানি, আমদানি ও প্রবাসী আয় মিলিয়ে লেনদেনের আর্থিক পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ১৬ কোটি টাকা।
এসব তথ্য থেকে বোঝা যায়, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক এখন শুধু পুরোনো আমানত ফেরতের কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। নতুন গ্রাহক সংগ্রহ, বিনিয়োগ, ঋণ আদায় এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের মাধ্যমে নিয়মিত ব্যাংকিং কার্যক্রমও পরিচালনা করছে।
খাতসংশ্লিস্টরা জানিয়েছেন, ব্যাংকটির পুনরুদ্ধারের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ের ওপর। গ্রাহকেরা প্রয়োজনের সময় নিয়মিত আমানত তুলতে পারছেন কি না, নতুন আমানতের প্রবাহ কতটা স্থায়ী হচ্ছে, খেলাপি ঋণ থেকে কত অর্থ আদায় করা যাচ্ছে এবং সরকারি অর্থায়নের ওপর নির্ভরতা কতটা কমছে—এসব সূচক গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, পাঁচ ব্যাংকের অতীতের আর্থিক বিপর্যয়ের বোঝা যাতে শেষ পর্যন্ত শুধু সাধারণ জনগণকে বহন করতে না হয়। সরকারি অর্থায়নের মাধ্যমে ব্যাংকটিকে সচল রাখার পাশাপাশি অনিয়মের মাধ্যমে বেরিয়ে যাওয়া অর্থ উদ্ধারে কার্যকর অগ্রগতি প্রয়োজন।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে নতুন করে ৪ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা আমানত জমা হওয়া এবং দেড় লাখের বেশি নতুন হিসাব খোলার তথ্য তাই আশাব্যঞ্জক। কিন্তু এই ইতিবাচক প্রবণতাকে টেকসই আস্থায় রূপ দিতে হলে আমানত ফেরতের নিশ্চয়তা, ঋণ আদায় এবং আর্থিক সুশাসনে দৃশ্যমান অগ্রগতি ধরে রাখতে হবে।














