ডিএসজে
আগের ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার পরও নতুন করে রাষ্ট্রীয় নিশ্চয়তায় সাত হাজার কোটি টাকা ধার নিয়ে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সংকটে থাকা ন্যাশনাল ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের শতভাগ গ্যারান্টিতে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক থেকে এ ঋণ নিয়েছে বেসরকারি ব্যাংকটি।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) থেকে স্বাভাবিক লেনদেন চালুর ঘোষণা দেওয়া হলেও বিপুল খেলাপি ঋণ ও আর্থিক দুরবস্থার মধ্যে নতুন ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এর আগেও বিভিন্ন ব্যাংক থেকে নেওয়া ৯৮৫ কোটি টাকা ঋণ নির্ধারিত সময়ে ফেরত দিতে পারেনি ন্যাশনাল ব্যাংক। তখন গ্যারান্টির শর্ত অনুযায়ী ঋণদাতা ব্যাংকগুলোর পাওনা পরিশোধ করতে হয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংককে। ফলে ওই অর্থ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ন্যাশনাল ব্যাংকের দায়ে পরিণত হয়।
বর্তমানে ব্যাংকটির কাছে বাংলাদেশ ব্যাংকের মোট পাওনা দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা। এমন পরিস্থিতিতে নতুন সাত হাজার কোটি টাকার ঋণের গ্যারান্টিও দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ব্যাংকটির ঋণ আদায়ের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ন্যাশনাল ব্যাংকের বিতরণ করা মোট ঋণের ৫৬ দশমিক ৪৪ শতাংশই খেলাপি, যার পরিমাণ প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যাংকটির দেওয়া প্রতি ১০০ টাকা ঋণের প্রায় ৫৬ টাকাই খেলাপি হয়ে পড়েছে।
পাশাপাশি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতির ঘাটতি রয়েছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল খেলাপি ঋণ ও সঞ্চিতি ঘাটতির মধ্যে নতুন ঋণের অর্থ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা ব্যাংকটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ন্যাশনাল ব্যাংককে দেওয়া সোনালী ব্যাংকের নতুন ঋণের মেয়াদ তিন মাস। সুদের হার বার্ষিক ১০ শতাংশ। নির্ধারিত সময়ে ব্যাংকটি ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে মেয়াদ শেষ হওয়ার তিন দিনের মধ্যে সোনালী ব্যাংককে অর্থ ফেরত দেওয়ার নিশ্চয়তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শওকত আলী খান জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গ্যারান্টির ভিত্তিতেই ন্যাশনাল ব্যাংককে ঋণ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে ঋণ ফেরত না পাওয়া গেলে বাংলাদেশ ব্যাংক সোনালী ব্যাংকের পাওনা পরিশোধ করবে।
এ ব্যবস্থায় ঋণের অর্থ সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে দেওয়া হচ্ছে না। তবে ন্যাশনাল ব্যাংক পরিশোধে ব্যর্থ হলে গ্যারান্টির দায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর বর্তাবে। আগের ঋণের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা ঘটায় নতুন ঋণের সম্ভাব্য দায়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সাত হাজার কোটি টাকার ঋণে বার্ষিক ১০ শতাংশ সরল সুদ ধরে তিন মাসের সুদ দাঁড়ায় প্রায় ১৭৫ কোটি টাকা। সে হিসাবে মেয়াদ শেষে আসল ও সুদ মিলিয়ে প্রায় ৭ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হতে পারে ন্যাশনাল ব্যাংককে।
এদিকে গ্রাহকদের জমে থাকা অর্থ উত্তোলনের চাহিদাও নতুন ঋণের সমপরিমাণে পৌঁছেছে। ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মেলিতা মেহজাবীন গনমাধ্যমকে জানিয়েছেন, গত ১১ অক্টোবর থেকে এক লাখ টাকার বেশি আমানত রয়েছে, এমন গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ উত্তোলনের আবেদন নেওয়া হচ্ছে। তিন দিনে এসব আবেদনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা।
গ্রাহকদের নগদ অর্থের চাহিদা নিরূপণ এবং সেই অনুযায়ী শাখাগুলোতে অর্থ সরবরাহের প্রস্তুতি নিতে আবেদন সংগ্রহ করা হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে ন্যাশনাল ব্যাংকের আমানতকারীরা চাহিদামতো টাকা তুলতে পারছেন না। সম্প্রতি চার আমানতকারী অর্থ ফেরত পেতে আদালতের শরণাপন্ন হন। তাঁদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত টাকা ফেরতের নির্দেশ দেন। এরপর বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ের নজরে আসে এবং ব্যাংকটির স্বাভাবিক লেনদেন ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংককে উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এর ধারাবাহিকতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান মেলিতা মেহজাবীন ও ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহিদুল হকের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে ১৫ অক্টোবর থেকে ব্যাংকটির সব শাখা ও এটিএম বুথে প্রয়োজনীয় নগদ অর্থ সরবরাহ করে গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী টাকা উত্তোলনের ব্যবস্থা করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। পরে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদও স্বাভাবিক লেনদেন চালুর সিদ্ধান্ত নেয়।
এর আগে তারল্য সহায়তা চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করেছিল ন্যাশনাল ব্যাংক। তবে নতুন টাকা সৃষ্টি করে সরাসরি সহায়তা দেওয়ার পরিবর্তে অন্য ব্যাংক থেকে ঋণের ব্যবস্থা করার পথ বেছে নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মূল্যস্ফীতির চাপ বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
নতুন ব্যবস্থায় সোনালী ব্যাংক অর্থ সরবরাহ করলেও ঋণ পরিশোধের নিশ্চয়তা দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে সরাসরি নতুন টাকা সৃষ্টি এড়ানো গেলেও গ্যারান্টির বিপরীতে সম্ভাব্য আর্থিক দায় থেকে যাচ্ছে।
ন্যাশনাল ব্যাংকের আর্থিক সংকট শুধু সাম্প্রতিক আমানত উত্তোলনের চাপের কারণে তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিনের ঋণ অনিয়ম, খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, সঞ্চিতি ঘাটতি এবং ধারাবাহিক লোকসান ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তি দুর্বল করেছে। ব্যাংকটি ২০২২ সাল থেকে প্রতিবছর লোকসান গুনছে। শুধু ২০২৪ সালেই লোকসান হয়েছে ১ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ দীর্ঘদিন সিকদার গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ওই সময়ে ঋণ বিতরণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপে সিকদার গ্রুপ ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ হারায়। বর্তমানে মাল্টিমোড, হোসাফ ও আর্মানা গ্রুপসংশ্লিষ্ট পরিবারের সদস্যরা ব্যাংকটির পরিচালনায় যুক্ত রয়েছেন।
তবে পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন এলেও ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতির তথ্য পাওয়া যায়নি। বিপুল খেলাপি ঋণের কারণে নিয়মিত নগদ অর্থ আদায়ের সক্ষমতা দুর্বল থাকায় আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে বাইরের ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
সব মিলিয়ে ন্যাশনাল ব্যাংককে দেওয়া নতুন ঋণের ক্ষেত্রে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রথমত, সাত হাজার কোটি টাকা দিয়ে গ্রাহকদের অর্থ উত্তোলনের চাপ কতটা সামাল দেওয়া সম্ভব হবে। দ্বিতীয়ত, আগের ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ এবং বিপুল খেলাপি ঋণে জর্জরিত ব্যাংকটি এবার নির্ধারিত সময়ে ঋণ ফেরত দিতে পারবে কি না। দ্বিতীয় প্রশ্নটির উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গ্যারান্টি শেষ পর্যন্ত আর্থিক দায়ে পরিণত হবে কি না।














