ডিএসজে কোলাজ
দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মুনাফা যখন বাড়ছে, তখন উল্টো চিত্র বিদেশি ব্যাংকগুলোতে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশে কার্যরত নয়টি বিদেশি ব্যাংকের সম্মিলিত কর-পূর্ব মুনাফা কমেছে ১৮ শতাংশের বেশি। শক্তিশালী মূলধন ও বিপুল তারল্য থাকা সত্ত্বেও সীমিত ঋণ সম্প্রসারণ, খেলাপি ঋণের হার বৃদ্ধি এবং সম্পদের বিপরীতে আয় কমে যাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিভাগের তৈরি ‘বাংলাদেশে বিদেশি ব্যাংকের কার্যক্রম: প্রবণতা ও পরিচালনাগত বিশ্লেষণ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর আর্থিক কার্যক্রম বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বিদেশি ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত কর-পূর্ব মুনাফা হয়েছে ৩ হাজার ৬৩২ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৪ হাজার ৪৫২ কোটি ৬০ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরে মুনাফা কমেছে ৮২০ কোটি ৬০ লাখ টাকা বা ১৮ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
একই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত হিসাবে কর-পরবর্তী নিট মুনাফা ২ হাজার ৮১৫ কোটি ৬০ লাখ থেকে কমে ২ হাজার ৩২১ কোটি ৫০ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। কমেছে ৪৯৪ কোটি ১০ লাখ টাকা বা ১৭ দশমিক ৫৫ শতাংশ।
বিপরীতে দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকের মুনাফায় উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ব্র্যাক ব্যাংকের সমন্বিত নিট মুনাফা বেড়েছে প্রায় ৫৭ শতাংশ। একই সময়ে সিটি ব্যাংকের সমন্বিত কর-পরবর্তী মুনাফা বেড়েছে প্রায় ৭৫ শতাংশ এবং ইস্টার্ন ব্যাংকের সমন্বিত নিট মুনাফা বেড়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ।
বিদেশি ব্যাংকগুলোর মুনাফা কমার সম্ভাব্য কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম ঋণ কার্যক্রমে স্থবিরতা। ২০২৫ সালের জুন শেষে ব্যাংকগুলোর মোট ঋণ ও অগ্রিম ছিল ৪৮ হাজার ৩৫৫ কোটি ২০ লাখ টাকা। চলতি বছরের জুন শেষে তা দাঁড়িয়েছে ৪৮ হাজার ৭০৪ কোটি ২০ লাখ টাকায়। এক বছরে ঋণ বেড়েছে মাত্র ৩৪৯ কোটি টাকা বা শূন্য দশমিক ৭২ শতাংশ।
গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ঋণের স্থিতি আরও কমে ৪৬ হাজার ১২২ কোটি ৫০ লাখ টাকায় নেমেছিল। সেখান থেকে চলতি বছরের প্রথমার্ধে কিছুটা পুনরুদ্ধার হলেও বার্ষিক প্রবৃদ্ধি এক শতাংশের নিচে রয়েছে। দেশের মোট ব্যাংকঋণে বিদেশি ব্যাংকগুলোর অংশও ২ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে কমে ২ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে।
এদিকে মুনাফা কমলেও বিদেশে আয় প্রত্যাবাসন বেড়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে বিদেশি ব্যাংকগুলো মুনাফা ও আয় বাবদ বিদেশে পাঠিয়েছে ১ হাজার ৫৭০ কোটি ১০ লাখ টাকা। আগের বছরের একই সময়ে পাঠিয়েছিল ১ হাজার ২৫২ কোটি ৭০ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রত্যাবাসন বেড়েছে ২৫ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
বিপরীতে পুনর্বিনিয়োগ করা আয় ২ হাজার ৮০৩ কোটি ১০ লাখ থেকে কমে ২ হাজার ১৮০ কোটি ১০ লাখ টাকায় নেমেছে। কমেছে ২২ দশমিক ২৩ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণায় মুনাফা হ্রাসের জন্য কোনো একক কারণ চিহ্নিত করা হয়নি। তবে ঋণের সীমিত প্রবৃদ্ধি, বাজারে অংশীদারত্ব কমে যাওয়া, খেলাপি ঋণের হার বৃদ্ধি এবং সম্পদ ও মূলধনের বিপরীতে আয় হ্রাসের তথ্য বিদেশি ব্যাংকগুলোর ব্যবসায়িক সক্ষমতায় চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অন্যদিকে, আমানত সংগ্রহেও বিদেশি ব্যাংকগুলো পিছিয়ে পড়ছে। ২০২৫ সালের জুন শেষে তাদের মোট আমানত ছিল ৮৭ হাজার ৪৯০ কোটি ১০ লাখ টাকা। চলতি বছরের জুন শেষে তা সামান্য কমে দাঁড়িয়েছে ৮৭ হাজার ৩৭৮ কোটি ৫০ লাখ টাকায়। একই সময়ে দেশের মোট ব্যাংক আমানতে বিদেশি ব্যাংকগুলোর অংশ ৪ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে ৪ শতাংশে নেমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিদেশি ব্যাংকগুলোর আমানতের বড় অংশ তুলনামূলক কম ব্যয়ের। মোট আমানতের ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাবে এবং ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ আবাসিক বৈদেশিক মুদ্রা হিসাবে রয়েছে। ফলে আমানত সংগ্রহে ব্যয়গত সুবিধা থাকলেও সেই অর্থ থেকে পর্যাপ্ত আয় অর্জনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চলতি বছরের জুনে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট আমানতের বিপরীতে ঋণের স্থিতি ছিল প্রায় ৫৬ শতাংশ।
মুনাফার ওপর সম্ভাব্য চাপের আরেকটি উৎস ঋণের মানের অবনতি। ২০২৫ সালের জুন শেষে বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার ছিল ৬ দশমিক ১ শতাংশ। চলতি বছরের জুনে তা বেড়ে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। একই সময়ে ঋণের বিপরীতে সংরক্ষিত প্রভিশনের স্থিতি ৩ হাজার ২৮৬ কোটি ৮০ লাখ থেকে বেড়ে ৩ হাজার ৩৫৬ কোটি ৫০ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
যদিও সামগ্রিক ব্যাংক খাতের তুলনায় বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার কম, নিজেদের আগের অবস্থানের তুলনায় ঋণঝুঁকি কিছুটা বেড়েছে।
বিদেশি ব্যাংকগুলোর আয়ক্ষমতা দুর্বল হওয়ার আরও স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় আর্থিক সক্ষমতার সূচকে। ২০২৫ সালের জুনে তাদের সম্পদের বিপরীতে আয় ছিল ২ দশমিক ০৯ শতাংশ, যা চলতি বছরের জুনে কমে ১ দশমিক ৬২ শতাংশ হয়েছে। একই সময়ে নিজস্ব মূলধনের বিপরীতে আয় ৮ দশমিক ৪৪ শতাংশ থেকে কমে ৭ দশমিক ০৬ শতাংশে নেমেছে।
অথচ ব্যাংকগুলোর মূলধন ও তারল্য পরিস্থিতি শক্তিশালী রয়েছে। জুন শেষে মূলধন পর্যাপ্ততার হার ছিল ৪১ দশমিক ২১ শতাংশ এবং মোট সম্পদের বিপরীতে তারল্যসম্পদের হার ৪৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ। অর্থাৎ ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা থাকলেও সম্পদ ও মূলধন থেকে আগের মতো মুনাফা অর্জিত হচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও বিদেশি ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম বেড়েছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে তাদের মাধ্যমে রপ্তানি আয় এসেছে ৩৯৪ কোটি ৮৫ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। আমদানি মূল্য পরিশোধ বেড়েছে ১৩ শতাংশ।
বাণিজ্যিক লেনদেন বাড়লেও মুনাফা কমার এই প্রবণতা থেকে বোঝা যায়, লেনদেনের পরিমাণ বৃদ্ধি সব ক্ষেত্রে সমান হারে আয় বাড়াতে পারছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, দেশে নয়টি বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ৬৭টি শাখা ও ছয়টি উপশাখা রয়েছে। সীমিত শাখা নেটওয়ার্কের কারণে প্রবাসী আয় সংগ্রহেও তাদের অংশ মাত্র শূন্য দশমিক ২ শতাংশ। ফলে দেশীয় ব্যাংকগুলোর তুলনায় বিদেশি ব্যাংকগুলোর আয়ের উৎস অপেক্ষাকৃত নির্দিষ্ট কিছু ব্যবসায় কেন্দ্রীভূত।















