প্রতীকী ছবি (এআই দ্বারা তৈরী)
বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের বোঝা এখন ১১৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। মাত্র তিন মাসে ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি বেড়ে জুন শেষে মোট বিদেশি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১১৪ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলার। ঋণের এই উল্লম্ফনের পেছনে রয়েছে সরকারি খাত। বিপরীতে একই সময়ে বেসরকারি খাতের বিদেশি ঋণ আরও কমেছে। ফলে দেশের বৈদেশিক ঋণের প্রায় ৮৩ শতাংশই এখন সরকারি খাতের দায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক ঋণসংক্রান্ত পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিক, অর্থাৎ এপ্রিল থেকে জুন সময়ে মোট বিদেশি ঋণ বেড়েছে ৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ। মার্চ শেষে ঋণের স্থিতি ছিল প্রায় ১১০ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলার।
তিন মাসে সরকারি খাতের বিদেশি ঋণ বেড়েছে ৪ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার বা ৪১৯ কোটি ডলার। জুন শেষে এ খাতের ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৯৫ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলারে। মার্চ শেষে যা ছিল ৯০ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে বেসরকারি খাতের বিদেশি ঋণ ১৪ কোটি ডলার কমে জুন শেষে দাঁড়িয়েছে ১৯ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলারে। মার্চ শেষে এ খাতের ঋণ ছিল প্রায় ২০ দশমিক ০৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ সরকারের ঋণ বাড়লেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদেশি ঋণের স্থিতি কমছে।
এই বিপরীতমুখী প্রবণতা দেশের বৈদেশিক অর্থায়নের পরিবর্তিত চিত্র তুলে ধরছে। সরকার যখন বাজেটের অর্থসংস্থান ও অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় বিদেশি উন্নয়ন সহযোগীদের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে, তখন বেসরকারি খাতে স্বল্পমেয়াদি ঋণ ও বাণিজ্যিক অর্থায়ন সংকুচিত হয়েছে।
সরকারি বিদেশি ঋণের সাম্প্রতিক গতিপথ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৫ সালের জুন শেষে এ খাতের ঋণ ছিল ৯৩ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার। পরবর্তী নয় মাসে তা কমে ২০২৬ সালের মার্চ শেষে ৯০ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে।
অর্থাৎ ওই সময়ে সরকারি বিদেশি ঋণের স্থিতি কমেছিল ২ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলার। বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতিকে ঋণ কমার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে অর্থবছরের শেষ তিন মাসে পরিস্থিতি বদলে যায়। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের অর্থনৈতিক অভিঘাত মোকাবিলায় সরকার বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ বহুপক্ষীয় এবং দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা পায়।
এই অর্থায়ন সরকারি বৈদেশিক ঋণের স্থিতি বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ ছাড়ে আগের ধীরগতির পর বাজেট সহায়তার বড় অঙ্ক যুক্ত হওয়ায় সরকারি ঋণ আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। মোট ঋণের স্থিতিতে নতুন ঋণ গ্রহণের পাশাপাশি পুরোনো ঋণ পরিশোধ, বিনিময় হারের পরিবর্তন ও অন্যান্য হিসাবগত সমন্বয়ের প্রভাব থাকতে পারে।
বাজেট সহায়তা সরকারের অর্থসংস্থানে তাৎক্ষণিক স্বস্তি দিতে পারে। বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার জোগান ও সরকারি ব্যয়ের চাপ সামলাতে এ ধরনের অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ঋণ হিসেবে পাওয়া অর্থ নির্ধারিত মেয়াদে সুদসহ পরিশোধ করতে হয়।
নতুন ঋণ সরকারের বর্তমান অর্থায়ন চাহিদা মেটালেও ভবিষ্যতে মূলধন ও সুদ পরিশোধের দায় তৈরি করে। সেই দায় কতটা চাপ সৃষ্টি করবে, তা নির্ভর করে ঋণের মেয়াদ, সুদহার, পরিশোধসূচি এবং অর্থের ব্যবহারের ওপর।
বাংলাদেশের মোট বিদেশি ঋণে সরকারি খাতের অংশ এখন প্রায় ৮২ দশমিক ৭ শতাংশ। বিপরীতে বেসরকারি খাতের অংশ প্রায় ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থাৎ বিদেশি ঋণের প্রতি ১০০ ডলারের প্রায় ৮৩ ডলারই সরকারি খাতের ঋণ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বেসরকারি বিদেশি ঋণ কমার পেছনে মূলত স্বল্পমেয়াদি ঋণ, ক্রেতার ঋণসুবিধা এবং বাণিজ্যিক ঋণের স্থিতি হ্রাসের তথ্য রয়েছে। এসব অর্থায়ন সাধারণত আমদানি, কাঁচামাল সংগ্রহ এবং ব্যবসার চলতি মূলধনের প্রয়োজন মেটাতে ব্যবহৃত হয়।
বেসরকারি খাতে ঋণ কমার অর্থ হতে পারে প্রতিষ্ঠানগুলো আগের ঋণ পরিশোধ করছে কিংবা নতুন বিদেশি ঋণ গ্রহণ কমিয়েছে। আবার আমদানি ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে দুর্বল চাহিদার কারণেও বাণিজ্যিক ঋণের প্রয়োজন কমতে পারে।
বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধির সঙ্গে বিনিময় হারের ঝুঁকিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিদেশি ঋণের মূলধন ও সুদ সাধারণত বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করতে হয়। ডলারের বিপরীতে টাকার দর কমলে একই পরিমাণ ডলার পরিশোধের জন্য বেশি টাকা প্রয়োজন হতে পারে।
এ কারণে ঋণের মোট স্থিতির পাশাপাশি প্রতিবছর কত মূলধন ও সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে, তা বিবেচনা করা জরুরি। রপ্তানি আয়, প্রবাসী আয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সরকারের রাজস্ব সংগ্রহের সক্ষমতার সঙ্গে ঋণ পরিশোধের দায়ের সম্পর্ক রয়েছে।
অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন শুধু বিদেশি ঋণ কতটা বাড়ছে, তা নয়; ঋণের অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে এবং তা ভবিষ্যতে কতটা অর্থনৈতিক সুফল তৈরি করছে। উৎপাদন, রপ্তানি, অবকাঠামো ও রাজস্ব সক্ষমতা বাড়াতে ঋণের কার্যকর ব্যবহার হলে পরিশোধের সক্ষমতাও শক্তিশালী হতে পারে।
কিন্তু ঋণের অর্থ প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল তৈরি করতে না পারলে ভবিষ্যতের বাজেট ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ার ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে নতুন ঋণ দিয়ে চলতি অর্থায়ন চাহিদা মেটানোর প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হলে ঋণ ব্যবস্থাপনায় বাড়তি সতর্কতার প্রয়োজন হয়।














