ঢাকা,  মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, কার্তিক ১২ ১৪৩৩

এনবিআর আন্দোলনে শাস্তি পাওয়া ২১ কর্মকর্তার দণ্ড বাতিল

করপোরেট

প্রকাশিত: ২০:১৪,৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপডেট: ১৭:৫৪,৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এনবিআর আন্দোলনে শাস্তি পাওয়া ২১ কর্মকর্তার দণ্ড বাতিল

রাজস্ব খাতের সংস্কারের দাবিতে নজিরবিহীন আন্দোলনের জেরে শাস্তি পাওয়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ২১ কর্মকর্তা প্রায় এক বছর পর স্বস্তি পেলেন। বদলির আদেশ প্রকাশ্যে ছিঁড়ে ফেলা, দপ্তরের কার্যক্রম বন্ধ রেখে আন্দোলনে অংশ নেওয়া এবং আন্দোলন সংগঠনে ভূমিকা রাখার অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে দেওয়া বিভিন্ন দণ্ড এবার বাতিল করা হয়েছে। মার্জনা চেয়ে করা আবেদন মঞ্জুর করে এসব কর্মকর্তার দণ্ডাদেশ বাতিলের নির্দেশ দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি।

এ ঘটনায় অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি) রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এর ফলে ২০২৫ সালের জুনে রাজস্ব খাতের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে এনবিআরের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া ধারাবাহিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি হলো।

আইআরডির প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, আন্দোলনের সময় এসব কর্মকর্তাকে দেশের বিভিন্ন স্থানে বদলি করা হয়েছিল। পরে তাঁদের কয়েকজন প্রকাশ্যে বদলির আদেশ ছিঁড়ে ফেলেন। কেউ আন্দোলনে সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন, আবার কেউ নিজ নিজ কার্যালয়ের কার্যক্রম বন্ধ রেখে কর্মসূচিতে অংশ নেন।

কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় এসব কর্মকাণ্ড সরকারি চাকরির আচরণবিধির লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হয়। ১৯৭৯ সালের সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালার ৩০এ বিধি লঙ্ঘনের পাশাপাশি সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী এসব কর্মকাণ্ডকে ‘অসদাচরণ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের কারও সাময়িক বরখাস্ত, কারও বেতন গ্রেড অবনমনসহ বিভিন্ন দণ্ড হয়। আন্দোলন শেষ হওয়ার পরও এসব শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এনবিআরের ভেতরে ওই সময়কার বিরোধের দৃশ্যমান পরিণতি হয়ে ছিল।

শেষ পর্যন্ত শাস্তিপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা মার্জনা চেয়ে আবেদন করেন। আইআরডির প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি তাঁদের আপিল আবেদন মঞ্জুর করে দণ্ডাদেশ বাতিলের আদেশ দিয়েছেন।

শাস্তি বাতিল হওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন কমিশনার (চলতি দায়িত্ব) মো. জাকির হোসেন; যুগ্ম কর কমিশনার মোরশেদ উদ্দীন খান, মাসুমা খাতুন, মো. মামুন মিয়া, মোনালিসা শাহরীন সুশমিতা ও মো. সানোয়ারুল কবির; উপ কর কমিশনার ইমাম তৌহিদ হাসান শাকিল, মো. জিল্লুর রহমান, মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম ও মোহাম্মদ শিহাবুল ইসলাম।

এ ছাড়া অতিরিক্ত কর কমিশনার মুরাদ আহমেদ, মির্জা আশিক রানা, হাসান মুহাম্মদ তারেক রিকাবদার, সিফাত-ই-মরিয়ন, সুলতানা হাবীব, চাঁদ সুলতানা চৌধুরানী, আ আ আমীমুল ইহসান খান ও সাধন কুমার কুণ্ডুর শাস্তিও বাতিল হয়েছে। তালিকায় দ্বিতীয় সচিব (উপ কর কমিশনার) মো. শাহাদাৎ জামিল এবং রাজস্ব কর্মকর্তা সবুজ মিয়া ও শফিউল বশরের নামও রয়েছে।

এই দণ্ড বাতিলের পেছনে রয়েছে ২০২৫ সালের রাজস্ব খাতের এক নজিরবিহীন আন্দোলন। ওই বছরের ১২ মে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ জারি হওয়ার পর এর বিরোধিতা করে আন্দোলনে নামেন এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। প্রায় দেড় মাস ধরে চলা কর্মসূচি শেষ পর্যন্ত রাজস্ব প্রশাসনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বড় ধরনের অচলাবস্থা তৈরি করে।

জুনের শেষ দিকে পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়। রাজধানীর এনবিআর কার্যালয়সহ দেশের শুল্ক ও কর কার্যালয়গুলোতে টানা কয়েক দিন কাজ বন্ধ থাকে। অর্থবছরের শেষ সময়ে এমন কর্মবিরতির কারণে রাজস্ব আদায় কার্যক্রমও চাপে পড়ে। এনবিআরের ইতিহাসে দেশজুড়ে এ ধরনের কর্মসূচিকে নজিরবিহীন হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

আন্দোলনের সময় শুধু কর্মবিরতিই নয়, সারা দেশে অবস্থান কর্মসূচি, মিছিল ও সমাবেশও হয়। এতে রাজস্ব প্রশাসনের স্বাভাবিক কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত ব্যবসায়ী নেতাদের মধ্যস্থতায় আন্দোলন স্থগিত করেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

আন্দোলন থেমে গেলেও এর প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া থামেনি। আন্দোলনে অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বদলি, সাময়িক বরখাস্ত, বেতন গ্রেড অবনমনসহ বিভিন্ন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে এসব অভিযোগের নিষ্পত্তিও করা হয়।

এখন রাষ্ট্রপতির আদেশে ২১ কর্মকর্তার সেই দণ্ড বাতিল হওয়ায় প্রায় এক বছর আগের ঘটনাটি নতুন মোড় নিয়েছে। অর্থাৎ আন্দোলনের সময় সরকারি চাকরির আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে যে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, মার্জনার আবেদন মঞ্জুর হওয়ার পর তা আর বহাল থাকছে না।

এই সিদ্ধান্ত একই সঙ্গে এনবিআরের প্রশাসনিক ইতিহাসে ২০২৫ সালের আন্দোলনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও সামনে আনছে। একদিকে ওই আন্দোলন রাজস্ব প্রশাসনের কার্যক্রমকে নজিরবিহীনভাবে ব্যাহত করেছিল, অন্যদিকে আন্দোলনে অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া শাস্তিও প্রায় এক বছর পর রাষ্ট্রপতির আদেশে প্রত্যাহার হলো।