ডিএসজে কোলাজ
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শীর্ষ নেতৃত্ব পুনর্গঠনে বেসরকারি খাতের অভিজ্ঞ ব্যাংকারদের ওপর আস্থা রাখছে সরকার। অগ্রণী ও জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে বেসরকারি ব্যাংকের দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বেসিক ব্যাংকের এমডি পদে মনোনয়ন পেয়েছেন রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের একজন উপব্যবস্থাপনা পরিচালক।
অন্যদিকে, সোনালী ব্যাংকের বর্তমান এমডিকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
রোববার (২৬ অক্টোবর) অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে জারি করা পৃথক প্রজ্ঞাপনে এসব সিদ্ধান্ত জানানো হয়। তিন ব্যাংকের নতুন এমডি পদে মনোনীত ব্যক্তিদের যোগদানের তারিখ থেকে তিন বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে। ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদকে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
সরকারের এই সিদ্ধান্তে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকের শীর্ষ নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। তিন ব্যাংকে নতুন নেতৃত্ব আনার পাশাপাশি দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক সোনালীর বর্তমান এমডিকে দায়িত্বে রাখার পথ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে অগ্রণী ও জনতা ব্যাংকের মতো বড় দুটি সরকারি ব্যাংকের শীর্ষ পদে বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মনোনয়ন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় নতুন নেতৃত্ব আনার উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পদে মনোনয়ন পেয়েছেন যমুনা ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক নূর মোহাম্মদ। তাঁকে যোগদানের তারিখ থেকে তিন বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের উদ্দেশ্যে মনোনীত করা হয়েছে।
অগ্রণী ব্যাংক দেশের অন্যতম বড় রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক। আমানত সংগ্রহ, ঋণ বিতরণ, বৈদেশিক বাণিজ্য ও সরকারি আর্থিক লেনদেনে ব্যাংকটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ এবং ঋণ আদায়ে দুর্বলতার কারণে ব্যাংকটির আর্থিক ব্যবস্থাপনা দীর্ঘদিন ধরে চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণও বেড়েছে। এ সময় খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির মোট ঋণের ৪৪ শতাংশ। এ অবস্থায় বেসরকারি ব্যাংক থেকে আসা নতুন নেতৃত্বের জন্য ঋণ আদায়, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং ব্যাংকের আর্থিক শৃঙ্খলা শক্তিশালী করা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হয়ে উঠবে।
জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পদে মনোনয়ন পেয়েছেন সাউথইস্ট ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান ঝুঁকি কর্মকর্তা (চিফ রিস্ক অফিসার) মো. মাহবুব আলম। তাঁকেও যোগদানের তারিখ থেকে তিন বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে।
জনতা ব্যাংকের ক্ষেত্রে নতুন এমডির মনোনয়ন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে খেলাপি ঋণের চাপে সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত ব্যাংকগুলোর একটি জনতা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৫ হাজার ৭২৯ কোটি টাকা। ব্যাংকটির মোট ঋণের প্রায় ৭৫ দশমিক ৫ শতাংশই খেলাপি।
এমন পরিস্থিতিতে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন ব্যাংকারকে জনতা ব্যাংকের শীর্ষ পদে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। সাউথইস্ট ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পাশাপাশি প্রধান ঝুঁকি কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মাহবুব আলম। ফলে ঋণঝুঁকি মূল্যায়ন, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদারকিতে তাঁর অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, বেসিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পদে মনোনয়ন পেয়েছেন জনতা ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নুরুল হুদা। তাঁকেও যোগদানের তারিখ থেকে তিন বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে।
বেসিক ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে ঋণ অনিয়ম, খেলাপি ঋণ এবং আর্থিক দুর্বলতার কারণে আলোচনায় রয়েছে। ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন, খেলাপি ঋণ আদায় এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন নিশ্চিত করা নতুন নেতৃত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
তিন ব্যাংকে নতুন এমডি মনোনয়নের পাশাপাশি সোনালী ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খানের বিষয়ে আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে সরকার।
গত ১৯ অক্টোবর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে জারি করা আদেশে শওকত আলী খানের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করা হয়েছিল। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে সেই আদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফলে তাঁর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের অবশিষ্ট মেয়াদ বহাল থাকার পথ তৈরি হয়েছে।
সোনালী ব্যাংকের এমডিকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের বিষয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শীর্ষ পদে নিয়োগ ও নেতৃত্ব পরিবর্তনের সাম্প্রতিক প্রক্রিয়ায় একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। একই সময়ে অন্য তিন ব্যাংকের নেতৃত্বে পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সোনালী ব্যাংকের ক্ষেত্রে আগের সিদ্ধান্ত সংশোধন করা হয়েছে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের পৃথক প্রজ্ঞাপনগুলোতে সই করেছেন উপসচিব আফরোজা আক্তার রিবা। প্রজ্ঞাপনে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানদের ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
অর্থাৎ তিন ব্যাংকের এমডি পদে সরকারের মনোনয়ন দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর তাঁদের নিয়োগ কার্যকর হবে। নতুন এমডিদের তিন বছরের চুক্তির মেয়াদও যোগদানের তারিখ থেকে গণনা করা হবে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর নেতৃত্বে এই পরিবর্তন এমন সময়ে এসেছে, যখন দেশের ব্যাংক খাত বিপুল খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি, প্রভিশন সংরক্ষণে দুর্বলতা এবং সুশাসনের সংকট মোকাবিলা করছে। বিশেষ করে অগ্রণী ও জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও অনুপাত ব্যাংক দুটির আর্থিক ব্যবস্থাপনার ওপর বড় চাপ তৈরি করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের জুন ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশই খেলাপি। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ১ লাখ ৫২ হাজার ৪৬৪ কোটি টাকা।
এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শীর্ষ নেতৃত্ব পরিবর্তনকে শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ কম। ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন, বড় ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ আদায়, ঋণ অনুমোদনে শৃঙ্খলা এবং জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার সঙ্গে নতুন নেতৃত্বের কার্যকারিতা সরাসরি সম্পর্কিত।
বিশেষ করে বেসরকারি খাত থেকে আসা দুই ব্যাংকারের জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ভিন্ন পরিচালন কাঠামো, বড় খেলাপি ঋণের চাপ এবং ঋণ আদায়ের দীর্ঘদিনের জটিলতা মোকাবিলা করা হবে বড় পরীক্ষা। অন্যদিকে বেসিক ব্যাংকের নতুন নেতৃত্বের সামনে রয়েছে ব্যাংকটির আর্থিক পুনরুদ্ধারের চ্যালেঞ্জ।
সরকারের সর্বশেষ সিদ্ধান্তে তিন ব্যাংকে নতুন এমডি মনোনয়ন এবং সোনালী ব্যাংকের বর্তমান এমডিকে বহাল রাখার উদ্যোগ স্পষ্ট হয়েছে। তবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থার বাস্তব উন্নয়ন কতটা হবে, তা নির্ভর করবে নতুন নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা, পরিচালনা পর্ষদের সহযোগিতা এবং ঋণ আদায় ও সুশাসনে কার্যকর পদক্ষেপের ওপর।















