প্রতীকী ছবি (এআই দ্বারা তৈরী)
চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বিদেশ থেকে নতুন ঋণ এসেছে ৫৪ কোটি ১৭ লাখ ডলার। বিপরীতে পুরোনো ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ করতে হয়েছে ১৩৫ কোটি ১২ লাখ ডলার। অর্থাৎ নতুন ঋণপ্রাপ্তির প্রায় আড়াই গুণ অর্থ ব্যয় হয়েছে ঋণ পরিশোধে। এক বছরের ব্যবধানে বিদেশি ঋণ ছাড় প্রায় অর্ধেকে নেমে আসায় সরকারের বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় চাপ আরও বেড়েছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ের বৈদেশিক সহায়তাসংক্রান্ত সাময়িক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে এ তথ্য পাওয়া গেছে। এতে দেখা যায়, বিদেশি ঋণ ছাড়ের তুলনায় পরিশোধ বেশি হয়েছে ৮০ কোটি ৯৫ লাখ ডলার। এমনকি নতুন ঋণ থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে পুরোনো ঋণের আসল অংশও পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ঋণ ও অনুদান মিলিয়ে মোট বৈদেশিক সহায়তা ছাড় হয়েছে ৬৬ কোটি ২৩ লাখ ডলার। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে ছাড় হয়েছিল ১১৪ কোটি ৮৬ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বৈদেশিক সহায়তা ছাড় কমেছে ৪৮ কোটি ৬৩ লাখ ডলার বা ৪২ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
তবে সামগ্রিক বৈদেশিক সহায়তার তুলনায় ঋণের অর্থ ছাড় কমেছে আরও বেশি। গত অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে বিদেশি ঋণ ছাড় হয়েছিল ১০৩ কোটি ৮১ লাখ ডলার। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৫৪ কোটি ১৭ লাখ ডলারে। অর্থাৎ ঋণ ছাড় কমেছে ৪৯ কোটি ৬৪ লাখ ডলার বা ৪৭ দশমিক ৮২ শতাংশ।
অন্যদিকে, বৈদেশিক অনুদান কিছুটা বেড়েছে। গত অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে অনুদান পাওয়া গিয়েছিল ১১ কোটি ৫ লাখ ডলার। এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ৬ লাখ ডলারে। এক বছরের ব্যবধানে অনুদান বেড়েছে ৯ দশমিক ১৪ শতাংশ। তবে অনুদানের এই বৃদ্ধি ঋণ ছাড়ের বড় পতন সামাল দিতে পারেনি।
বৈদেশিক সহায়তার অর্থপ্রাপ্তি কমলেও ঋণ পরিশোধের ব্যয় বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ বাবদ মোট ১৩৫ কোটি ১২ লাখ ডলার পরিশোধ করেছে সরকার। গত অর্থবছরের একই সময়ে পরিশোধের পরিমাণ ছিল ১২৭ কোটি ৯৯ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরে পরিশোধ বেড়েছে ৭ কোটি ১৩ লাখ ডলার বা ৫ দশমিক ৫৭ শতাংশ।
এবারের মোট পরিশোধের মধ্যে ঋণের আসল বাবদ ব্যয় হয়েছে ৮৫ কোটি ৮৯ লাখ ডলার। আর সুদ পরিশোধে গেছে ৪৯ কোটি ২৩ লাখ ডলার। অর্থাৎ মোট ঋণ পরিশোধের ৩৬ দশমিক ৪৩ শতাংশই ব্যয় হয়েছে সুদে। টাকার হিসাবে প্রথম তিন মাসে বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধে সরকারের ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৬ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা।
ঋণ ছাড় ও পরিশোধের তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রথম তিন মাসে যে পরিমাণ নতুন বিদেশি ঋণ পাওয়া গেছে, তার চেয়ে ১৪৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে পুরোনো ঋণ পরিশোধে। অর্থাৎ প্রতি ১০০ ডলার নতুন ঋণের বিপরীতে প্রায় ২৪৯ ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, নতুন ঋণ থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে পুরোনো ঋণের আসল অংশটুকুও মেটানো সম্ভব হয়নি। প্রথম তিন মাসে ঋণের আসল পরিশোধ হয়েছে ৮৫ কোটি ৮৯ লাখ ডলার। অথচ নতুন ঋণ ছাড় হয়েছে ৫৪ কোটি ১৭ লাখ ডলার। ফলে শুধু আসল পরিশোধের তুলনায় নতুন ঋণপ্রাপ্তি কম ছিল ৩১ কোটি ৭২ লাখ ডলার।
গত অর্থবছরের একই সময়ে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। তখন নতুন ঋণ ছাড় হয়েছিল ১০৩ কোটি ৮১ লাখ ডলার। সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ে ঋণের আসল পরিশোধের তুলনায় নতুন ঋণপ্রাপ্তি প্রায় ২৭ শতাংশ বেশি ছিল। এবার সেই চিত্র উল্টে গেছে।
ঋণ ও অনুদান মিলিয়ে মোট বৈদেশিক সহায়তার সঙ্গে ঋণ পরিশোধের তুলনা করলেও অর্থপ্রাপ্তির ঘাটতি স্পষ্ট হয়। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে মোট সহায়তা ছাড় হয়েছে ৬৬ কোটি ২৩ লাখ ডলার। বিপরীতে ঋণ পরিশোধ হয়েছে ১৩৫ কোটি ১২ লাখ ডলার। অর্থাৎ মোট সহায়তা ছাড়ের তুলনায় পরিশোধ বেশি হয়েছে ৬৮ কোটি ৮৯ লাখ ডলার বা প্রায় ১০৪ শতাংশ।
গত অর্থবছরের একই সময়ে মোট বৈদেশিক সহায়তা ছাড় ও ঋণ পরিশোধের ব্যবধান ছিল ১৩ কোটি ১৩ লাখ ডলার। এবার তা বেড়ে ৬৮ কোটি ৮৯ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এই ব্যবধান বেড়েছে ৫৫ কোটি ৭৬ লাখ ডলার। আগের বছরের তুলনায় ব্যবধানের পরিমাণ পাঁচ গুণের বেশি হয়েছে।
এই হিসাব থেকে বোঝা যায়, বিদেশি ঋণ ও অনুদান থেকে সরকারের যে পরিমাণ অর্থপ্রাপ্তি হচ্ছে, তার চেয়ে অনেক বেশি অর্থ ব্যয় হচ্ছে অতীতে নেওয়া ঋণের দায় মেটাতে। তবে এটি দেশের সামগ্রিক বৈদেশিক মুদ্রাপ্রবাহ বা রিজার্ভের নিট পরিবর্তনের হিসাব নয়। এটি সরকারি বৈদেশিক সহায়তা ছাড় ও ঋণ পরিশোধের মধ্যকার তুলনামূলক চিত্র।
বিদেশি ঋণ ছাড়ের এই পতন এমন সময়ে ঘটেছে, যখন সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নেও বড় ধরনের ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৮৯ শতাংশ। গত কয়েক বছরের একই সময়ের তুলনায় এটি সর্বনিম্ন বাস্তবায়নের হার।
উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতির সঙ্গে বৈদেশিক ঋণের অর্থ ছাড়ের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। অনেক প্রকল্পে কাজের অগ্রগতি, নির্ধারিত শর্ত পূরণ এবং ব্যয়ের হিসাব জমা দেওয়ার ভিত্তিতে উন্নয়ন সহযোগীরা অর্থ ছাড় করে। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়ন পিছিয়ে পড়লে অনুমোদিত বৈদেশিক ঋণের অর্থও সময়মতো পাওয়া যায় না।
অন্যদিকে, আগের নেওয়া ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ করতে হয় নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী। নতুন প্রকল্পের বাস্তবায়ন ধীর হলেও পুরোনো ঋণের কিস্তি পরিশোধের বাধ্যবাধকতা কমে না। ফলে একদিকে নতুন অর্থপ্রাপ্তি কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে পুরোনো ঋণের দায় মেটাতে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় অব্যাহত রয়েছে।
বিগত বছরগুলোতে বড় অবকাঠামো প্রকল্পে নেওয়া বিদেশি ঋণের রেয়াতকাল শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আসল পরিশোধের চাপও বাড়ছে। এর পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন ডলারে নির্ধারিত ঋণের কিস্তি পরিশোধে সরকারের টাকার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে বৈদেশিক ঋণের চাপ শুধু ডলার ব্যবস্থাপনায় নয়, সরকারের বাজেট ব্যবস্থাপনাতেও প্রভাব ফেলছে।
তবে বৈদেশিক সহায়তার নতুন প্রতিশ্রুতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ১২৭ কোটি ৩০ লাখ ডলারের নতুন সহায়তার প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে প্রতিশ্রুতির পরিমাণ ছিল ৯১ কোটি ৭ লাখ ডলার।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে নতুন বৈদেশিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি বেড়েছে ৩৬ কোটি ২৩ লাখ ডলার বা ৩৯ দশমিক ৭৮ শতাংশ। বৈদেশিক অর্থায়নের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও প্রকৃত অর্থপ্রাপ্তির চিত্র এখনো বিপরীতমুখী।
কারণ প্রতিশ্রুত অর্থের পুরোটা চুক্তি স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যায় না। প্রকল্পের বাস্তবায়ন, ক্রয়প্রক্রিয়া, অর্থছাড়ের শর্ত এবং উন্নয়ন সহযোগীদের অনুমোদনের ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে অর্থ ছাড় হয়। ফলে নতুন সহায়তার প্রতিশ্রুতি বাড়লেও তা তাৎক্ষণিকভাবে সরকারের হাতে ডলারপ্রাপ্তি নিশ্চিত করে না।
চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকেই এই বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়েছে। একদিকে নতুন সহায়তার প্রতিশ্রুতি প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে প্রকৃত বৈদেশিক সহায়তা ছাড় কমেছে ৪২ শতাংশের বেশি। শুধু ঋণের অর্থ ছাড় কমেছে প্রায় ৪৮ শতাংশ।
এ অবস্থায় অনুমোদিত প্রকল্পের বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা, উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানো এবং বৈদেশিক ঋণের অর্থ ছাড়ের প্রতিবন্ধকতা দূর করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে আগামী বছরগুলোতে ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধের সময়সূচির সঙ্গে নতুন বৈদেশিক অর্থায়নের প্রবাহের সমন্বয় প্রয়োজন।
প্রথম তিন মাসের হিসাব বলছে, বাংলাদেশ এখন বিদেশি ঋণ থেকে যতটা অর্থ পাচ্ছে, তার চেয়ে অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করছে আগের ঋণ পরিশোধে। নতুন সহায়তার প্রতিশ্রুতি বাড়লেও প্রকৃত অর্থ ছাড়ের গতি না বাড়লে সরকারের বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় এই চাপ আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।















