প্রতীকী ছবি (এআই দ্বারা তৈরী)
অর্থবছরের এক-চতুর্থাংশ সময় শেষ হলেও সরকারের উন্নয়ন বাজেটের ৯৬ শতাংশের বেশি অর্থ অব্যবহৃত পড়ে রয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) মাত্র ৩ দশমিক ৮৯ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে। ফলে বাকি নয় মাসে ব্যয় করতে হবে প্রায় ২ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। উন্নয়ন ব্যয়ের এমন ধীরগতি গত কয়েক বছরের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে।
রোববার বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রকাশিত জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ের এডিপি বাস্তবায়ন প্রতিবেদন বিশ্লেষণে এ চিত্র পাওয়া গেছে।
চলতি অর্থবছরে এডিপির মোট আকার ৩ লাখ ৮ হাজার ৯২৪ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে মাত্র ১২ হাজার ১৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে বরাদ্দের ৯৬ দশমিক ১১ শতাংশ অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হয়নি। টাকার অঙ্কে অব্যবহৃত অর্থের পরিমাণ ২ লাখ ৯৬ হাজার ৯০৭ কোটি টাকা।
এই অর্থবছরের পুরো বরাদ্দ ব্যয় করতে হলে অক্টোবর থেকে আগামী জুন পর্যন্ত প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৩২ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা খরচ করতে হবে। অথচ প্রথম তিন মাসে মাসিক গড় ব্যয় হয়েছে মাত্র ৪ হাজার ৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ অবশিষ্ট সময়ে মাসিক ব্যয়ের গতি প্রথম তিন মাসের তুলনায় প্রায় ৮ দশমিক ২৪ গুণ বাড়াতে হবে।
উন্নয়ন বাজেটের এই পরিস্থিতি শুধু অর্থ ব্যয়ের হিসাবেই সীমাবদ্ধ নয়। বছরের শুরুতে প্রকল্প বাস্তবায়ন পিছিয়ে পড়লে শেষ দিকে দ্রুত অর্থ ছাড় ও ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়। এতে প্রকল্পের কাজের মান, যথাযথ তদারকি এবং নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করার সক্ষমতা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে এডিপি বাস্তবায়নের হার সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে বাস্তবায়নের হার ছিল ৫ দশমিক ০৯ শতাংশ। এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছিল।
অর্থাৎ গত অর্থবছরের তুলনায় এবার বাস্তবায়নের হার কমেছে ১ দশমিক ২০ শতাংশ পয়েন্ট। চার বছর আগের তুলনায় কমেছে ৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ পয়েন্ট। ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে যে হারে উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়ন হয়েছিল, এবার তার অর্ধেকেরও কম হয়েছে।
সেপ্টেম্বর মাসের একক হিসাবেও উন্নয়ন ব্যয়ে গতি ফেরেনি। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ২ দশমিক ৪০ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই মাসে ছিল ২ দশমিক ৭০ শতাংশ। ফলে অর্থবছরের তৃতীয় মাসেও আগের বছরের তুলনায় বাস্তবায়নের হার পিছিয়ে রয়েছে।
উন্নয়ন ব্যয়ের স্থবিরতা সবচেয়ে স্পষ্ট তিনটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ক্ষেত্রে। অর্থবছরের প্রথম তিন মাস পার হলেও সেতু বিভাগ, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এডিপির বরাদ্দ থেকে কোনো অর্থ ব্যয় করতে পারেনি।
সেতু বিভাগের জন্য চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ রয়েছে ২ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা। পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ ৯৩৬ কোটি এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ১৮৫ কোটি টাকা। তিন সংস্থার মোট বরাদ্দ ৩ হাজার ৭১৮ কোটি টাকা। অথচ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তাদের সম্মিলিত ব্যয় শূন্য।
এ ছাড়া দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ, আইএমইডি এবং মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের উন্নয়ন ব্যয়ও ছিল নামমাত্র।
উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নে স্বাস্থ্য খাতের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগ—দুই সংস্থার জন্য চলতি অর্থবছরে মোট বরাদ্দ রয়েছে ১১ হাজার ৫১৩ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে মাত্র ২৯৯ কোটি টাকা। বিভাগভিত্তিক বাস্তবায়নের হার ২ শতাংশের নিচে।
স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন ব্যয়ে ধীরগতি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ খাতের প্রকল্পগুলোর সঙ্গে হাসপাতালের অবকাঠামো, চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা, চিকিৎসা শিক্ষা এবং জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ন জড়িত। বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হলে জনগণের কাছে এসব বিনিয়োগের সুফল পৌঁছাতেও দেরি হতে পারে।
এডিপির অর্থায়নের উৎসভিত্তিক হিসাবেও দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে। প্রথম তিন মাসে সরকারি তহবিল থেকে ব্যয় হয়েছে ৮ হাজার ৫৮ কোটি টাকা, যা সংশ্লিষ্ট বরাদ্দের ৪ দশমিক ২৪ শতাংশ। অন্যদিকে বিদেশি ঋণের অর্থ থেকে ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা, বাস্তবায়নের হার ৩ দশমিক ১৩ শতাংশ।
অর্থাৎ বিদেশি ঋণনির্ভর প্রকল্পগুলোর অর্থ ব্যয়ের গতি সরকারি অর্থায়নের তুলনায় আরও কম। বিদেশি অর্থায়নের প্রকল্পে নির্ধারিত সময়ে কাজ ও অর্থ ছাড়ের শর্ত পূরণ করা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এই ধীরগতি প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সূচির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
তবে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের চিত্র এক নয়। বাস্তবায়নের শতকরা হারের দিক থেকে এগিয়ে রয়েছে সংসদবিষয়ক সচিবালয়। সংস্থাটির বাস্তবায়নের হার ২২ দশমিক ৮৬ শতাংশ। দুর্নীতি দমন কমিশনের ১৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ, আইন ও বিচার বিভাগের ১৫ দশমিক ৯৭ শতাংশ, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ১৪ দশমিক ৮০ শতাংশ এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ১৩ দশমিক ১৪ শতাংশ।
অন্যদিকে টাকার অঙ্কে বড় ব্যয়ের ক্ষেত্রে এগিয়ে আছে স্থানীয় সরকার বিভাগ ও সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ।
এডিপি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অর্থবছরের শুরুতে ব্যয় তুলনামূলক কম এবং শেষ দিকে বেশি হওয়ার প্রবণতা নতুন নয়। কিন্তু এবারের পরিস্থিতির বিশেষত্ব হলো, আগের কয়েক বছরের তুলনায় প্রথম প্রান্তিকের বাস্তবায়ন আরও নিচে নেমেছে। একই সঙ্গে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের ব্যয় শূন্য এবং স্বাস্থ্য খাতের অগ্রগতিও দুর্বল।
অর্থবছরের বাকি নয় মাসে পুরো উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নের জন্য যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হবে, তা প্রথম তিন মাসের তুলনায় বহুগুণ বেশি। ফলে উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি নিশ্চিত না করে শুধু শেষ দিকে অর্থ ব্যয়ের গতি বাড়ানো হলে কাঙ্ক্ষিত সুফল অর্জন কঠিন হতে পারে।
সরকারের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ শুধু বরাদ্দের অর্থ ব্যয় করা নয়; সময়মতো প্রকল্পের কাজ শেষ করা, ব্যয়ের গুণগত মান বজায় রাখা এবং উন্নয়ন বিনিয়োগের সুফল জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া। প্রথম প্রান্তিকের রেকর্ড ধীরগতি সেই চ্যালেঞ্জকে আরও বড় করে তুলেছে।















