ডিএসজে কোলাজ
দেশের অভিজাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্কলাস্টিকাও বড় ঋণখেলাপির তালিকায়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে আইএফআইসি ব্যাংকে স্কলাস্টিকা লিমিটেডের ৭২৭ কোটি টাকা খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত। অথচ বিপুল ব্যাংকঋণের দায় থাকা প্রতিষ্ঠানটি ক্রিসেন্ট লিমিটেড নামের আরেক কোম্পানিকে ৪২৭ কোটি টাকা ধার দিয়েছে বলে তথ্য রয়েছে। ক্রিসেন্টের পরিচালনায় রয়েছেন বিতর্কিত ও আলোচিত ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমানের বেক্সিমকো-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা।
পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে দেশের উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের শিক্ষার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান স্কলাস্টিকা। মানসম্মত ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষা, কঠোর শৃঙ্খলা এবং উচ্চ শিক্ষাব্যয়ের কারণে প্রতিষ্ঠানটি অভিজাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। রাজধানীর বিভিন্ন শাখায় প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নিয়মিত টিউশন ফি, ভর্তি ফি ও অন্যান্য অর্থ আদায় করা হলেও প্রতিষ্ঠানটির বিপুল ব্যাংকঋণ এবং অন্য কোম্পানিতে শত শত কোটি টাকা দেওয়ার তথ্য এর আর্থিক ব্যবস্থাপনার ভিন্ন চিত্র সামনে এনেছে।
আইএফআইসি ব্যাংকের ঋণসংক্রান্ত নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে স্কলাস্টিকা লিমিটেডের মোট ঋণদায়ের প্রায় পুরোটাই খেলাপি হয়ে পড়েছে। মোট ৭৩০ কোটি টাকার বিপরীতে খেলাপি ঋণ ৭২৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটির মোট ঋণদায়ের প্রায় ৯৯ দশমিক ৬ শতাংশ খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্কলাস্টিকার একজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংকঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ঋণ পরিশোধের সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। যদিও ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ব্যাংক নথিতে বিপুল অঙ্কের ঋণ খেলাপি হিসেবে দেখানো হয়েছে।
স্কলাস্টিকার নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনেও বড় অঙ্কের ঋণ ও অন্যান্য আর্থিক দায়ের তথ্য রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ও ব্যাংক ওভারড্রাফটের হিসাব বিশ্লেষণে বিপুল অর্থের ব্যবহার এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের চিত্র উঠে এসেছে।
সবচেয়ে আলোচিত তথ্য হলো, নিজেই ব্যাংকঋণের দায়ে জর্জরিত থাকা অবস্থায় স্কলাস্টিকা ৪২৭ কোটি টাকা দিয়েছে ক্রিসেন্ট লিমিটেড নামের একটি কোম্পানিকে। নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে এই বিপুল অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়।
ক্রিসেন্ট লিমিটেডের ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও বাস্তব অবস্থান অনুসন্ধান করতে গিয়ে আরও কিছু তথ্য সামনে এসেছে। কোম্পানিটির নিবন্ধনসংক্রান্ত নথি থাকলেও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে এর পরিচালকদের দেওয়া কয়েকটি ঠিকানার সঙ্গে বাস্তব অবস্থানের অসংগতি পাওয়া গেছে।
রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মসের (আরজেএসসি) নথি অনুযায়ী, ক্রিসেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুর রউফ। প্রতিষ্ঠানটির অন্য দুই পরিচালক সালাউদ্দিন খান মজলিস ও গাজী মনিরুল ইসলাম। কোম্পানির পরিচালকদের তথ্যসংবলিত ফরম-১২-তে তাঁদের নাম, ঠিকানা ও দায়িত্বের বিবরণ রয়েছে। ২০২৩ সালের ৩১ মে তাঁদের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বে থাকার তথ্যও নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
ক্রিসেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুর রউফ এবং পরিচালক সালাউদ্দিন খান মজলিসের সঙ্গে নিউ ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিজের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তাঁরা প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বেও ছিলেন। নিউ ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিজ বেক্সিমকো গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত, যেখানে আব্দুর রউফ ও সালাউদ্দিন খান মজলিসের সঙ্গে সালমান এফ রহমান এবং তাঁর ভাই এ এস এফ রহমানও পরিচালক হিসেবে রয়েছেন।
এই যোগসূত্রের মধ্য দিয়ে স্কলাস্টিকার বিপুল আর্থিক লেনদেনে বেক্সিমকো-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতি সামনে এসেছে। বেক্সিমকো গ্রুপের অন্যতম কর্ণধার সালমান এফ রহমান দীর্ঘদিন আইএফআইসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন। ফলে স্কলাস্টিকার ঋণদাতা ব্যাংক এবং ক্রিসেন্টের পরিচালকদের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কের চিত্র পাওয়া যায়।
স্কলাস্টিকা ও এর মূল ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এসেন্ট গ্রুপের সঙ্গে সালমান এফ রহমান ও বেক্সিমকোর দীর্ঘদিনের যোগাযোগের তথ্যও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। সালমান এফ রহমান ও বেক্সিমকো-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা স্কলাস্টিকার সেবাগ্রহীতা ও শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অন্যদিকে বেক্সিমকো-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারাই ছিলেন স্কলাস্টিকার কাছ থেকে বিপুল অর্থ পাওয়া ক্রিসেন্ট লিমিটেডের পরিচালনায়।
ক্রিসেন্ট লিমিটেডের আর্থিক বিবরণীতেও বিপুল ব্যাংকঋণের তথ্য রয়েছে। নিরীক্ষিত প্রতিবেদনের সংশ্লিষ্ট অংশে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ৩১৮ কোটি ৭১ লাখ ২৭ হাজার ২৮৫ টাকা। এর বিপরীতে আইএফআইসি ব্যাংকের গুলশান শাখার তিনটি ঋণ হিসাবের উল্লেখ রয়েছে।
একই আর্থিক বিবরণীতে ব্যাংক ওভারড্রাফটের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ৩৭৬ কোটি ৩৯ লাখ ৫৮ হাজার ৯০৭ টাকা। এর মধ্যে ঢাকা ব্যাংকের বনানী শাখা এবং আইএফআইসি ব্যাংকের গুলশান শাখার ঋণ হিসাব রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ও ওভারড্রাফট মিলিয়ে এই দুই খাতে দায়ের পরিমাণ প্রায় ৬৯৫ কোটি ১১ লাখ টাকা।
এ ছাড়া নিরীক্ষিত হিসাবের সংশ্লিষ্ট অংশে বিভিন্ন অগ্রিম, পাওনা, আয়কর সমন্বয় এবং অন্যান্য দায়ের তথ্য রয়েছে। এসব হিসাব ক্রিসেন্ট লিমিটেডের আর্থিক অবস্থার পাশাপাশি ব্যাংকঋণ ও পারস্পরিক লেনদেনের ব্যাপকতা তুলে ধরে।
ক্রিসেন্টের পরিচালকদের ঠিকানা অনুসন্ধানেও অসংগতি পাওয়া গেছে। মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান অনুযায়ী, কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুর রউফের ঠিকানা দেওয়া হয়েছে রাজধানীর ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার ১ নম্বর সড়কের ৪৮ নম্বর বাড়ি। কিন্তু ওই ঠিকানায় তাঁর অবস্থান নিশ্চিত করা যায়নি। সংশ্লিষ্ট এলাকায় বাড়ির নম্বরের ধারাবাহিকতার সঙ্গেও নথিতে দেওয়া ঠিকানার অসংগতি পাওয়া যায়। অন্য পরিচালক গাজী মনিরুল ইসলামের ঠিকানা দেওয়া হয়েছে মিরপুর-১ এলাকায় বেক্সিমকো রিয়েল এস্টেটের নিয়ন্ত্রণাধীন মানসী লেক ভিউ অ্যাপার্টমেন্টের একটি ভবনে। অনুসন্ধানে নথিতে উল্লিখিত ভবনটি পাওয়া যায়নি।
কোম্পানিটির আরেক পরিচালক সালাউদ্দিন খান মজলিসের ঠিকানা দেওয়া হয়েছে রাজধানীর ইস্কাটন প্লাজায়। সেখানে গিয়ে নিরাপত্তাকর্মীর কাছ থেকে তাঁর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়। তবে অনুসন্ধানের সময় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
ক্রিসেন্ট লিমিটেডের নিবন্ধন নথিতে পরিচালকদের নাম ও ঠিকানা থাকলেও মাঠপর্যায়ে তাঁদের অবস্থান নিশ্চিত করতে না পারার বিষয়টি কোম্পানিটির বাস্তব কার্যক্রম এবং আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে স্কলাস্টিকার মতো একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ৪২৭ কোটি টাকার বেশি অর্থ পাওয়ার তথ্যের কারণে ক্রিসেন্টের ব্যবসায়িক সক্ষমতা ও অর্থ ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
স্কলাস্টিকার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, কূটনীতিক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ইয়াসমিন মুর্শেদ। ২০২৩ সালে তাঁর মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনায় রয়েছেন সৈয়দা মাদিহা মুর্শেদ। দীর্ঘদিনের সুনাম ও শিক্ষার মানের কারণে দেশের উচ্চবিত্ত পরিবারের মধ্যে স্কলাস্টিকার বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
সাধারণত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়মিত আয়ের প্রধান উৎস শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি, ভর্তি ফি এবং অন্যান্য শিক্ষাসংশ্লিষ্ট সেবা। স্কলাস্টিকার ক্ষেত্রেও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে তুলনামূলক উচ্চহারে ফি আদায় করা হয়। এর মধ্যেই শত শত কোটি টাকার ব্যাংকঋণ এবং অন্য কোম্পানিতে বিপুল অর্থ দেওয়ার তথ্য প্রতিষ্ঠানটির মূল শিক্ষা কার্যক্রমের বাইরে আর্থিক লেনদেনের ব্যাপকতা প্রকাশ করেছে।
স্কলাস্টিকার ঋণদাতা আইএফআইসি ব্যাংক নিজেও বিপুল খেলাপি ঋণের চাপে রয়েছে। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ব্যাংকটির মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২৮ হাজার ২৫০ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির মোট বিতরণ করা ঋণের ৬৩ শতাংশ। ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমানের সঙ্গে বেক্সিমকো গ্রুপের সংশ্লিষ্টতা এবং ক্রিসেন্টের পরিচালকদের বেক্সিমকো-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনের তথ্য এই অনুসন্ধানকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করেছে।
ব্যাংকঋণের অর্থ ব্যবহার, ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর মধ্যে অর্থের প্রবাহ তদারকি করা ব্যাংকের অন্যতম দায়িত্ব। স্কলাস্টিকার বিপুল খেলাপি ঋণ এবং ক্রিসেন্ট লিমিটেডের সঙ্গে বড় অঙ্কের লেনদেনের তথ্য সেই তদারকির কার্যকারিতাকেও সামনে এনেছে।
দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পেছনে দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনা, ঋণের অর্থের অপব্যবহার এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর সঙ্গে ব্যাংকের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা রয়েছে। স্কলাস্টিকার ঘটনাটি সেই বৃহত্তর সংকটের মধ্যে একটি ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। কারণ এখানে ঋণগ্রহীতা কোনো প্রচলিত শিল্পকারখানা বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়; দেশের অন্যতম পরিচিত একটি অভিজাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে শিক্ষার মান ও অভিজাত পরিচয়ের মাধ্যমে সুনাম অর্জন করা স্কলাস্টিকার এই আর্থিক চিত্র দেশের ব্যাংক খাতের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ বিপুল ব্যাংকঋণ গ্রহণ, খেলাপি হয়ে পড়া এবং অন্য প্রতিষ্ঠানে শত শত কোটি টাকা দেওয়ার ঘটনা এখন শুধু স্কলাস্টিকার নিজস্ব আর্থিক ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়; ঋণদাতা ব্যাংকের জবাবদিহি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সম্পর্কের সঙ্গেও জড়িয়ে গেছে।














