ডিএসজে কোলাজ
মাত্র সাত মাসে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারদর বেড়েছে ২৫৪ শতাংশের বেশি। গত ৮ মার্চ ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) কোম্পানিটির শেয়ারের দর ছিল ৪৯ টাকা। ধারাবাহিক উত্থানে ৩০ সেপ্টেম্বর তা পৌঁছায় ১৭৩ টাকা ৭০ পয়সায়। শেয়ারের এমন অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়ায় সংঘবদ্ধ কারসাজি এবং অপ্রকাশিত তথ্যের অপব্যবহার তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) মার্কেট অ্যান্ড ইন্টারমিডিয়ারিজ অ্যাফেয়ার্স বিভাগের সার্ভিল্যান্স শাখা থেকে ডিএসইকে এ নির্দেশ দেওয়া হয়। কমিশনের সহকারী পরিচালক মারজিয়া জাহানের সই করা চিঠিতে ১৫ জুন থেকে ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেন বিস্তারিত তদন্ত করতে বলা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে সময় দেওয়া হয়েছে ৩০ কার্যদিবস।
ডিএসইর বাজারতথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৮ মার্চ বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারদর ছিল ৪৯ টাকা। এরপর ধারাবাহিকভাবে দর বাড়তে থাকে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর শেয়ারটির দর দাঁড়ায় ১৭৩ টাকা ৭০ পয়সায়। অর্থাৎ এই সময়ে প্রতিটি শেয়ারের দর বেড়েছে ১২৪ টাকা ৭০ পয়সা। মাত্র ৭ মাসে শেয়ারটির দর বেড়েছে সাড়ে তিন গুণের বেশি।
তবে সেপ্টেম্বরের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে শেয়ারটির দর কিছুটা কমেছে। সোমবার ডিএসইতে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারের সমাপনী দর ছিল ১৬৬ টাকা ৪০ পয়সা। সে হিসাবে ৩০ সেপ্টেম্বরের তুলনায় দর কমেছে ৭ টাকা ৩০ পয়সা বা ৪ দশমিক ২০ শতাংশ।
দর কিছুটা সংশোধন হলেও ৮ মার্চের তুলনায় সোমবার পর্যন্ত প্রতিটি শেয়ারের মূল্য ১১৭ টাকা ৪০ পয়সা বেশি রয়েছে।
এই অস্বাভাবিক উত্থানের সময়ে কোম্পানিটির আর্থিক ফলাফলেও উন্নতি দেখা গেছে। চলতি অর্ধবার্ষিকীতে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারপ্রতি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৭ শতাংশ বেড়েছে।
তবে শেয়ারপ্রতি আয়ের ৪৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির বিপরীতে শেয়ারদর ২৫৪ শতাংশের বেশি বেড়েছে। অর্থাৎ মুনাফার প্রবৃদ্ধির তুলনায় শেয়ারের বাজারদরের উত্থান ছিল অনেক বেশি। অবশ্য শেয়ারের দর শুধু মুনাফার প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে না। বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা, বাজারে শেয়ারের সরবরাহ, ভবিষ্যৎ আয় এবং অন্যান্য বিষয়ও মূল্য নির্ধারণে ভূমিকা রাখে।
কিন্তু বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্সের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক দর পরিবর্তনের পাশাপাশি লেনদেনের আচরণও বিএসইসির নজরে এসেছে। কমিশনের চিঠিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কোম্পানিটির শেয়ারে অস্বাভাবিক মূল্য পরিবর্তন ও লেনদেনের ধরন পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতেই বিস্তারিত তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিএসইসির নির্দেশনা অনুযায়ী, তদন্তে প্রথমেই সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সমন্বিত বা সংঘবদ্ধ লেনদেনের তথ্য খুঁজে বের করতে হবে। বিশেষ করে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কৃত্রিমভাবে শেয়ারের চাহিদা ও লেনদেন সৃষ্টি করে দর বাড়ানোর সঙ্গে জড়িত ছিল কি না, তা শনাক্ত করতে বলা হয়েছে।
একই সঙ্গে প্রকৃত বিনিয়োগের উদ্দেশ্য ছাড়া সংঘটিত লেনদেন বা কৃত্রিম কেনাবেচার তথ্যও খতিয়ে দেখতে হবে। এ ধরনের লেনদেনের মাধ্যমে বাজারে শেয়ারের চাহিদা ও দরের ভুল সংকেত তৈরি করা হতে পারে। ফলে তদন্তে সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীদের লেনদেনের ধরন এবং পারস্পরিক সমন্বয়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
কোম্পানিটির কোনো অপ্রকাশিত তথ্য ব্যবহার করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আগাম শেয়ার কেনাবেচার মাধ্যমে সুবিধা নিয়েছেন কি না, তাও তদন্ত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শেয়ারটির লেনদেনে সংশ্লিষ্ট স্টক ব্রোকার ও স্টক ডিলার এবং তাঁদের অনুমোদিত প্রতিনিধিরা মার্জিন বিধিমালা, কমিশনের আদেশ, প্রজ্ঞাপন ও নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করেছেন কি না, তা পরীক্ষা করতে বলা হয়েছে।
সন্দেহজনক লেনদেন সংঘটনে ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান ও অনুমোদিত প্রতিনিধিদের ভূমিকা নির্ধারণ করতে হবে। কোনো অনিয়ম প্রতিরোধে তাঁদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা ছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় থাকবে।
তদন্তকালে পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট অন্য কোনো আইন, বিধি বা নির্দেশনা লঙ্ঘনের তথ্য পাওয়া গেলে তা শনাক্ত করে প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
কমিশনের নির্দেশনায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা। শুধু বিনিয়োগকারীদের কেনাবেচার তথ্য পর্যালোচনা নয়, সন্দেহজনক লেনদেন সম্পাদনে মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংশ্লিষ্টতা এবং এসব লেনদেন প্রতিরোধে তাদের দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও তদন্ত করতে হবে।
বিএসইসি সংশ্লিষ্ট ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত প্রতিনিধি, কমপ্লায়েন্স কর্মকর্তা এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের সন্দেহজনক লেনদেন সম্পর্কে সচেতন করার নির্দেশ দিয়েছে।
চিঠিতে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (স্টক-ডিলার, স্টক-ব্রোকার ও অনুমোদিত প্রতিনিধি) বিধিমালা, ২০০০-এর দ্বিতীয় তফসিলের আচরণবিধির ৬ ও ৮ নম্বর বিধান এবং ১১ নম্বর বিধির প্রতি বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। এসব বিধান পরিপালনে ব্যর্থতা যাতে না ঘটে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সচেতন করতে বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স ঢাকা ও চট্টগ্রাম উভয় স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত ‘এ’ শ্রেণির একটি সাধারণ বীমা কোম্পানি। ফলে কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে দুই বাজারের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণে বিএসইসির চিঠির অনুলিপি চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তার কাছেও পাঠানো হয়েছে। বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্সের প্রয়োজনীয় লেনদেনের তথ্য দিয়ে ডিএসইকে তদন্তে সহায়তা করতে সিএসইকে অনুরোধ করা হয়েছে।
তদন্তের জন্য কমিশন ১৫ জুন থেকে ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করেছে। যদিও শেয়ারটির দর বৃদ্ধির প্রবণতা শুরু হয়েছিল মার্চ থেকেই। ফলে মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৫৪ শতাংশের বেশি মূল্যবৃদ্ধির সামগ্রিক চিত্রের মধ্যে জুনের মাঝামাঝি থেকে অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত লেনদেনের ওপর তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পুঁজিবাজারে শেয়ারের অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে কোনো শেয়ারের দর অল্প সময়ে কয়েক গুণ বেড়ে গেলে উচ্চমূল্যে বিনিয়োগকারীদের প্রবেশের প্রবণতা বাড়তে পারে। পরে দর সংশোধন হলে তাঁদের লোকসানের ঝুঁকিও তৈরি হয়।














