ঢাকা,  মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, কার্তিক ১২ ১৪৩৩

বিনিয়োগ আকর্ষণে যেসব সুবিধার প্রস্তাব করছে বাংলাদেশ

বিনিয়োগ

প্রকাশিত: ২২:৫০,৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিনিয়োগ আকর্ষণে যেসব সুবিধার প্রস্তাব করছে বাংলাদেশ

ছবি- বাণিজ্য মন্ত্রনালয়

বিদেশি বিনিয়োগ টানতে হংকংয়ের বিনিয়োগকারীদের জন্য অর্থনৈতিক অঞ্চল ও রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় একগুচ্ছ বিশেষ সুবিধার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে রয়েছে ১০ বছরের কর অবকাশ, শুল্কমুক্ত মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির সুযোগ এবং ওয়ান-স্টপ সেবা।

এসব সুবিধার পাশাপাশি তৈরি পোশাকের বাইরে উচ্চপ্রযুক্তি, সবুজ প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, হালকা প্রকৌশল, জুতা ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে হংকংয়ের বিনিয়োগ চেয়েছে সরকার।

বুধবার হংকংয়ে বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল কার্যালয়ে হংকং জেনারেল চেম্বার অব কমার্সের চেয়ারম্যান ড. জ্যাকব কাম-এর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।

বৈঠকে মন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও শিল্পায়নের নতুন সুযোগ কাজে লাগাতে বাংলাদেশ বিদেশি বিনিয়োগকে আরও উৎসাহিত করছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চল ও রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় বিদেশি উদ্যোক্তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে হংকংয়ের বিনিয়োগকারীদের সামনে যে সুবিধাগুলো তুলে ধরা হয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ১০ বছরের কর অবকাশ। পাশাপাশি শিল্প স্থাপনের প্রয়োজনীয় মূলধনি যন্ত্রপাতি শুল্কমুক্তভাবে আমদানির সুযোগ এবং ব্যবসা শুরু ও পরিচালনার বিভিন্ন অনুমোদন সহজ করতে ওয়ান-স্টপ সেবা দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়।

সরকারের প্রত্যাশা, এসব সুবিধা বিনিয়োগের প্রাথমিক ব্যয় কমানোর পাশাপাশি বাংলাদেশে শিল্প স্থাপন ও ব্যবসা পরিচালনার প্রক্রিয়াও সহজ করবে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক অঞ্চল ও রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে এসব সুবিধা বিদেশি উদ্যোক্তাদের আগ্রহ বাড়াতে পারে।

হংকংয়ের বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশের আরেকটি লক্ষ্য হলো শিল্পের বহুমুখীকরণ। বর্তমানে তৈরি পোশাক বাংলাদেশের রপ্তানি ও শিল্প খাতের বড় অংশজুড়ে থাকলেও নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উচ্চপ্রযুক্তি, সবুজ প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, হালকা প্রকৌশল, জুতা ও তথ্যপ্রযুক্তিকে সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

একই সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে সরাসরি হংকংয়ে পণ্য রপ্তানি বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি কৃষিপণ্য, ফল, পাটজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তিনির্ভর পণ্যের বাজার সম্প্রসারণে হংকংকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে চায় বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও হংকংয়ের গুরুত্ব রয়েছে। বর্তমানে দেশের মোট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের ৭ দশমিক ২ শতাংশ আসে হংকং থেকে। এ হিসাবে হংকং বাংলাদেশের ষষ্ঠ বৃহত্তম বিনিয়োগকারী। দুই দেশের মধ্যে দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি কার্যকর রয়েছে। পাশাপাশি বিনিয়োগ সুরক্ষা ও উন্নয়ন চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতিও এগিয়ে চলছে।

বৈঠকে হংকংয়ের পুঁজিবাজারকে বাংলাদেশের অবকাঠামো, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ও শিল্প খাতে বিনিয়োগে যুক্ত করার বিষয়টিও সামনে আসে। এ ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত ২০০ কোটি মার্কিন ডলারের বাংলাদেশ তহবিলে হংকংয়ের বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।

এদিকে শুধু হংকংয়ের স্থানীয় বিনিয়োগকারী নয়, সেখানে অবস্থানরত বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদেরও দেশে বিনিয়োগে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। বুধবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল ও বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স হংকংয়ের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ আহ্বান জানান।

সভায় হংকংয়ে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা, বিনিয়োগের সুযোগ এবং দুই দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। হংকংয়ে বসবাসরত বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, অভিজ্ঞতা ও ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ককে দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

মতবিনিময় সভায় বাংলাদেশের ব্যবসায়ী সংগঠন এফবিসিসিআই, এমসিসিআই ও ডিসিসিআইয়ের সঙ্গে হংকংয়ের ব্যবসায়ী চেম্বারগুলোর সমন্বয়ে একটি প্ল্যাটফর্ম গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। পাশাপাশি ২০২৭ সালের শুরুতে হংকংয়ের একটি উচ্চপর্যায়ের ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দলকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

বাংলাদেশের সঙ্গে ব্যবসা ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে আগ্রহের কথা জানিয়েছে হংকং জেনারেল চেম্বার অব কমার্স। ১৮৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত সংগঠনটি হংকংয়ের অন্যতম পুরোনো ও বৃহৎ ব্যবসায়ী সংগঠন। দুই দেশের ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ বাড়ানো গেলে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

মতবিনিময় সভা শেষে বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স হংকং ও বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত বিশেষ ব্যবসায়িক নির্দেশিকা ‘দ্য বেঙ্গল ভিশনারিজ’-এর মোড়ক উন্মোচন করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। হংকংয়ে কার্যরত বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের পরিচিতি, ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং যোগাযোগের সুযোগ তুলে ধরার লক্ষ্যেই নির্দেশিকাটি প্রকাশ করা হয়েছে।

এর আগে হংকং সফরে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রী জাম কামাল খান, কাতারের বৈদেশিক বাণিজ্যবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড. আহমেদ বিন মোহাম্মদ আল-সায়েদ এবং ইনভেস্ট হংকংয়ের মহাপরিচালক আলফা লাউয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন বাণিজ্যমন্ত্রী।

বাংলাদেশের জন্য হংকংয়ের গুরুত্ব শুধু বিনিয়োগের উৎস হিসেবে নয়, চীনা ও বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবেও। ফলে হংকংয়ের বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে বাংলাদেশের শিল্প বহুমুখীকরণ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং রপ্তানি সম্প্রসারণে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

১৯৭৬ সালে হংকংয়ে বাংলাদেশের ট্রেড কমিশন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দুই পক্ষের বাণিজ্যিক সম্পর্কের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। চলতি বছরের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ-হংকং বাণিজ্যিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্ণ হবে।