ছবি- বাণিজ্য মন্ত্রনালয়
অর্থনৈতিক অঞ্চল, পণ্য পরিবহন অবকাঠামো ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বড় ধরনের অংশীদারত্বের সুযোগ কাজে লাগাতে চায় বাংলাদেশ। উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে স্থানীয় শিল্পকে যুক্ত করা এবং সবুজ অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্যেই বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) কাঠামোয় এসব খাতে বিনিয়োগ ও সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে সরকার।
হংকংয়ে অনুষ্ঠিত ১১তম বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ শীর্ষ সম্মেলনের পলিসি ডায়ালগে বাংলাদেশের এই অবস্থান তুলে ধরেছেন বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। ‘বৈচিত্র্যময় বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে স্থিতিশীল বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কাঠামো’ শীর্ষক অধিবেশনে তিনি বলেন, পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বাংলাদেশের সক্ষমতা ধরে রাখতে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সংযোগ আরও সম্প্রসারণ করতে হবে।
বিআরআই কাঠামোর আওতায় অর্থনৈতিক অঞ্চল, পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বড় ধরনের অংশীদারত্বের সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। সরকারের লক্ষ্য শুধু বিদেশি অর্থ আনা নয়; প্রযুক্তি, দক্ষতা ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে পারে—এমন বিনিয়োগকে বাংলাদেশের শিল্পভিত্তি শক্তিশালী করতে কাজে লাগানো।
মন্ত্রী বলেন, উন্নয়নশীল দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা শুধু বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না। এমন একটি উৎপাদন ও বাণিজ্য কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যা বৈশ্বিক পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারে এবং একই সঙ্গে কর্মসংস্থান ও নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য এ উদ্যোগের গুরুত্ব আরও বেড়েছে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির কারণে। অগ্রাধিকার এখন এমন প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা, যেখানে উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে। এ ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগকে শুধু অর্থের উৎস হিসেবে না দেখে উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা তৈরির হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষ করে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে এই বিনিয়োগ কৌশলের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে দেখছে সরকার। বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে শিল্প স্থাপনের পাশাপাশি স্থানীয় উদ্যোক্তা, সরবরাহকারী ও শ্রমবাজারকে আন্তর্জাতিক উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে বিনিয়োগের অর্থনৈতিক প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে।
পণ্য পরিবহন অবকাঠামোর উন্নয়নও এ পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। উৎপাদন বাড়লেও যদি বন্দর, সড়ক, রেল ও অন্যান্য পরিবহনব্যবস্থায় সময় ও ব্যয় বেশি থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্প উৎপাদনের সঙ্গে সমন্বিত পণ্য পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের ওপর জোর দেওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শিল্পনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বৈশ্বিক বাজারে পরিবেশগত মানদণ্ড ক্রমেই কঠোর হচ্ছে। ফলে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং শিল্পে তুলনামূলক পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো ভবিষ্যতে রপ্তানি সক্ষমতার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত হবে।
মন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং স্থানীয় শিল্পকে আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে সক্ষম বিনিয়োগকে বাংলাদেশ স্বাগত জানায়। অর্থাৎ যে বিনিয়োগের মাধ্যমে শুধু কারখানা স্থাপন নয়, স্থানীয় শিল্পে প্রযুক্তি, জ্ঞান ও দক্ষতার বিস্তার ঘটবে—সেই বিনিয়োগকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এই কৌশলের সঙ্গে রপ্তানি বহুমুখীকরণের বিষয়টিও যুক্ত। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালকা প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি এবং মানবসৃষ্ট তন্তুর মতো খাতকে বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খলে যুক্ত করার উদ্যোগের কথা জানান মন্ত্রী।
বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বিআরআই কাঠামোকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে সরকার। মন্ত্রী জানান, দুই দেশের সম্পর্ক বর্তমানে ‘কম্প্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক কো-অপারেটিভ পার্টনারশিপ’ পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে ১৭টি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং এর আওতায় মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন ও চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।
চীনের সঙ্গে বিনিয়োগ সম্পর্ক আরও জোরদার করতে ইনভেস্ট বাংলাদেশ দেশটিতে প্রথম বিদেশি বিনিয়োগ কার্যালয় চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বলেও জানান মন্ত্রী। এর মাধ্যমে সম্ভাবনাময় খাতে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ তুলে ধরা এবং চীনা বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
হংকংকেও এই বিনিয়োগ কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ। মন্ত্রী হংকংকে চীনের মূল ভূখণ্ড ও বৈশ্বিক বাজারের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সেতু হিসেবে উল্লেখ করে এর অবস্থানকে বাংলাদেশের স্বার্থে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
অর্থনৈতিক অঞ্চল, পণ্য পরিবহন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে এর প্রভাব শুধু বিদেশি পুঁজি প্রবাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। উৎপাদন সক্ষমতা, স্থানীয় শিল্পের সম্পৃক্ততা, প্রযুক্তি স্থানান্তর, কর্মসংস্থান এবং রপ্তানি সক্ষমতার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।
তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবায়নে বিনিয়োগের পরিমাণের পাশাপাশি বিনিয়োগের গুণগত মানও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন অংশীদারত্ব, যা দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করবে, স্থানীয় শিল্পকে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় যুক্ত করবে এবং একই সঙ্গে পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণে সহায়তা করবে।
বিআরআই সম্মেলনে বাংলাদেশের বার্তা তাই শুধু অবকাঠামো বা অর্থায়নকেন্দ্রিক নয়। বরং অর্থনৈতিক অঞ্চল, শিল্প উৎপাদন, পণ্য পরিবহন, প্রযুক্তি এবং সবুজ জ্বালানিকে একই বিনিয়োগ কাঠামোর মধ্যে এনে বৈশ্বিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার কৌশলই সামনে এনেছে সরকার।















