ছবি- বাণিজ্য মন্ত্রনালয়
বাংলাদেশে হংকংয়ের বিনিয়োগ বাড়াতে নতুন পথ খুলেছে। দুই দেশের বিনিয়োগকারী ও পুঁজির সুরক্ষা জোরদার এবং বিনিয়োগের পরিবেশকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক করতে বাংলাদেশ ও হংকং স্বাক্ষর করেছে ‘ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন অ্যান্ড প্রোটেকশন এগ্রিমেন্ট’ (আইপিপিএ)।
চুক্তির আওতায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ন্যায্য ও বৈষম্যহীন আচরণ, বিনিয়োগ অধিগ্রহণ হলে ক্ষতিপূরণ এবং বিনিয়োগ ও এর মুনাফা বিদেশে স্থানান্তরের অধিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর হংকংয়ে অনুষ্ঠিত ১১তম ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড সামিট ২০২৬’-এর উদ্বোধনী পর্বের পাশে চুক্তিটি স্বাক্ষর হয়। বাংলাদেশের পক্ষে শিল্প, বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এবং হংকং সরকারের পক্ষে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়নবিষয়ক সেক্রেটারি আলজের্নন ইএই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
চুক্তিটির গুরুত্ব শুধু নতুন বিনিয়োগ আনার সম্ভাবনায় নয়; বিদেশি বিনিয়োগকারীর অর্থ ও সম্পদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও এর তাৎপর্য রয়েছে।
হংকং সরকারের তথ্য অনুযায়ী, চুক্তিতে দুই পক্ষের বিনিয়োগকে ন্যায্য, সমতাভিত্তিক ও বৈষম্যহীন আচরণ দেওয়ার পাশাপাশি বিনিয়োগ বাজেয়াপ্ত হলে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা এবং বিনিয়োগ ও মুনাফা বিদেশে স্থানান্তরের অধিকার রাখার কথা বলা হয়েছে। বিনিয়োগসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য মধ্যস্থতা ও সালিসসহ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতিও রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ হংকং বর্তমানে দেশের বিদেশি বিনিয়োগের সপ্তম বৃহত্তম উৎস। গত পাঁচ বছরে হংকং থেকে বাংলাদেশ প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ পেয়েছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালেই এসেছে ১২২ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হংকং বাংলাদেশের জন্য উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ উৎস হলেও বিনিয়োগের পরিমাণ আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
নতুন চুক্তির ফলে তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্পসহ সম্ভাবনাময় বিভিন্ন খাতে হংকংয়ের বিনিয়োগ বাড়তে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে বিনিয়োগের ঝুঁকি ও আইনি অনিশ্চয়তা কমলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের আস্থা বাড়তে পারে। এর পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে নতুন অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রও তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে চুক্তি স্বাক্ষরই তাৎক্ষণিকভাবে বিনিয়োগের প্রবাহ বাড়ার নিশ্চয়তা দিচ্ছে না। হংকং সরকারের তথ্য অনুযায়ী, দুই পক্ষের প্রয়োজনীয় অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই আইপিপিএ কার্যকর হবে। অর্থাৎ চুক্তির বাস্তব সুফল পেতে হলে এখন প্রয়োজন এর বাস্তবায়ন কাঠামো দ্রুত সম্পন্ন করা এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য ঘোষিত সুরক্ষাগুলো বাস্তবে কার্যকর করা।
বিনিয়োগ সুরক্ষার পাশাপাশি চুক্তিটি দুই পক্ষের মধ্যে মূলধন প্রবাহকে দ্বিমুখী করার সুযোগও তৈরি করছে। অর্থাৎ শুধু হংকং থেকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ নয়, বাংলাদেশের বিনিয়োগকারীরাও হংকংয়ে বিনিয়োগ করলে চুক্তির আওতায় নির্ধারিত সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এতে দুই অর্থনীতির মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
৯ ও ১০ সেপ্টেম্বর হংকংয়ে অনুষ্ঠিত ১১তম বেল্ট অ্যান্ড রোড সামিটে সরকারি ও ব্যবসায়ী পর্যায়ের প্রতিনিধিরা বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন সুযোগ নিয়ে আলোচনা করছেন। এই সম্মেলনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ-হংকং আইপিপিএ স্বাক্ষর দুই পক্ষের বিনিয়োগ সম্পর্ককে আরও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, চুক্তির মাধ্যমে বিনিয়োগের পাশাপাশি সামগ্রিক দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সম্পর্কও জোরদার হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগ ও উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হলে কর্মসংস্থান, রপ্তানি এবং শিল্প খাতেও এর পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে।
তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তব বিনিয়োগে রূপ দিতে শুধু বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তি যথেষ্ট নয়। বিনিয়োগ অনুমোদন, মুনাফা প্রত্যাবাসন, করব্যবস্থা, জমি ও অবকাঠামো, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন এবং বিরোধ নিষ্পত্তির বাস্তব প্রক্রিয়াও বিনিয়োগকারীবান্ধব হতে হবে। আইপিপিএ সেই কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে; এখন এর কার্যকর বাস্তবায়নই হবে মূল পরীক্ষা।















