ঢাকা,  মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, কার্তিক ১২ ১৪৩৩

কুতুবজোমে তৃতীয় এফএসআরইউ: চীন না যুক্তরাষ্ট্র?

বিনিয়োগ

প্রকাশিত: ০১:১১,৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপডেট: ২৩:০৬,৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কুতুবজোমে তৃতীয় এফএসআরইউ: চীন না যুক্তরাষ্ট্র?

ডিএসজে কোলাজ

বাংলাদেশের গ্যাস সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে একটি মার্কিন কোম্পানির প্রভাব ইতিমধ্যেই বেশ বড়। মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটির মালিকানা ও পরিচালনায় রয়েছে এক্সিলারেট এনার্জি। অন্যটি সামিট গ্রুপের হলেও এর কারিগরি পরিচালনার দায়িত্বও একই কোম্পানির।

এবার কুতুবজোমে তৃতীয় এফএসআরইউ নির্মাণেও মার্কিন কোম্পানিগুলো আগ্রহ দেখিয়েছে। যদিও একই প্রকল্পে চীনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের প্রস্তাবও সরকারি প্রক্রিয়ায় এগিয়েছে।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) ঢাকার মতিঝিলে এফবিসিসিআই কার্যালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে বৈঠকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন জানান, বাংলাদেশে আরও এফএসআরইউ নির্মাণে মার্কিন কোম্পানিগুলোর গভীর আগ্রহ রয়েছে। বড় অবকাঠামো প্রকল্পে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

এ অবস্থায় তৃতীয় টার্মিনাল ঘিরে মূল প্রশ্ন শুধু বিনিয়োগ বা দ্রুত নির্মাণ নয়। প্রশ্ন হলো, দেশের গুরুত্বপূর্ণ গ্যাস অবকাঠামো কি ধীরে ধীরে একটি দেশ বা কোম্পানির প্রযুক্তি ও পরিচালনার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে?

প্রশ্নটির গুরুত্ব বোঝা যায় দেশের বর্তমান গ্যাস সংকট থেকে। দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে আনুমানিক ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট।

দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এফএসআরইউ থেকে আসছে আরও প্রায় ৭০০ থেকে ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট।

অর্থাৎ আমদানি করা এলএনজি এখন দেশের গ্যাস সরবরাহের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। জাহাজে আসা এলএনজিকে গ্যাসে রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে দেওয়ার দায়িত্বে থাকা এফএসআরইউগুলো তাই কৌশলগত অবকাঠামোতে পরিণত হয়েছে।

এর কোনো একটি বড় সমস্যায় শুধু গ্যাস সরবরাহ নয়, বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদনও ব্যাহত হতে পারে। মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির পরিচালিত একটি এফএসআরইউ কারিগরি সমস্যায় সাময়িক বন্ধ হওয়ার ঘটনাতেও এমন চাপ দেখা গেছে।

বর্তমান কাঠামোতে এক্সিলারেট এনার্জির ভূমিকা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। একটি এফএসআরইউ সরাসরি তাদের মালিকানা ও পরিচালনায় রয়েছে।

অন্যটি সামিট গ্রুপের হলেও ১৫ বছরের চার্টার চুক্তির মাধ্যমে এক্সিলারেট এনার্জির কাছ থেকে নেওয়া। ফলে মালিকানা আলাদা হলেও কারিগরি পরিচালনায় একই মার্কিন কোম্পানির ওপর নির্ভরতা রয়েছে।

মার্কিন কোম্পানির অংশগ্রহণ নিজে কোনো ঝুঁকির প্রমাণ নয়। উন্নত প্রযুক্তি ও পরিচালন অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য সুবিধা হতে পারে।

ঝুঁকির জায়গাটি তৈরি হয় নির্ভরতার ঘনত্ব থেকে। একই কোম্পানি বা দেশের প্রযুক্তি ও পরিচালনার ওপর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নির্ভর করলে কোনো কারিগরি, বাণিজ্যিক বা ভূরাজনৈতিক সংকটে বিকল্প ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক এলএনজি বাজারের অস্থিরতা। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনার মধ্যে কাতারএনার্জি ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করায় কাতার থেকে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ কমেছে।

ঘাটতি সামাল দিতে স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। প্রতি ইউনিটের দাম ২৮ মার্কিন ডলারের ওপরে ওঠায় আমদানি ব্যয়ের পাশাপাশি সরকারের ভর্তুকির চাপও বেড়েছে।

পেট্রোবাংলার এলএনজি ভর্তুকি ব্যয় প্রায় ১৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা মূল বাজেট বরাদ্দের প্রায় তিন গুণ।

সরবরাহের উৎস বাড়াতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গানভর গ্রুপের সঙ্গেও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করেছে। ২০২৬ থেকে ২০৩৮ সাল পর্যন্ত ১৩ বছরে এই চুক্তির আওতায় ১১৭টি এলএনজি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে।

ফলে এলএনজি সরবরাহের পাশাপাশি অবকাঠামোতেও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই বাস্তবতায় তৃতীয় এফএসআরইউতে মার্কিন কোম্পানির অংশগ্রহণ হলে নির্ভরতার মাত্রা আরও বাড়বে কি না, সেটিই এখন বিবেচনার বিষয়।

অন্যদিকে কুতুবজোমের তৃতীয় এফএসআরইউ নিয়ে চীনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেড নির্মাণ, মালিকানা ও পরিচালনা ভিত্তিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব দিয়েছে।

সরকার-টু-সরকার ব্যবস্থায় প্রকল্পটি নেওয়ার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি নীতিগত অনুমোদনও দিয়েছে। অর্থাৎ তৃতীয় টার্মিনাল নিয়ে চীনা বিকল্পটি ইতিমধ্যে সরকারি পর্যায়ে জায়গা করে নিয়েছে।

এদিকে বাণিজ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, সবচেয়ে কম সময়ে এফএসআরইউ সরবরাহের সক্ষমতা দেখাতে পারলে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে সর্বোচ্চ বিবেচনা দেওয়া হবে। ফলে সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সময়, ব্যয় ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি নির্ভরতার বিষয়টিও সামনে রাখার প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।

দেখতে হবে প্রকল্পের মোট ব্যয়, বাস্তবায়নের সময়, পরিচালন ব্যয়, চুক্তির মেয়াদ এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায়। একই সঙ্গে কোনো সংকটে রাষ্ট্র কতটা স্বাধীনভাবে বিকল্প সরবরাহ বা পরিচালনা ব্যবস্থা নিতে পারবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

তৃতীয় এফএসআরইউ নিয়ে সামিট গ্রুপও তাদের আগের প্রকল্প পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছে। আগের সরকারের সময়ে করা চুক্তি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাতিল করার পর পেট্রোবাংলাকে দেওয়া চিঠিতে সামিট দাবি করেছে, তাদের প্রকল্প পুনর্বহাল হলে চীনা প্রস্তাবের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হতে পারে।

তবে এটি সামিটের দাবি। স্বাধীনভাবে হিসাব যাচাই না করে এটিকে নিশ্চিত সাশ্রয় হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

তাই বাংলাদেশের সামনে এখন মূল প্রশ্ন ‘চীন না যুক্তরাষ্ট্র’ নয়। কোন প্রকল্পে কম খরচে, দ্রুত এবং নির্ভরযোগ্যভাবে গ্যাস পাওয়া যাবে—তার পাশাপাশি কোন ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতার ঝুঁকি কম থাকবে, সেটিই হওয়া উচিত সিদ্ধান্তের ভিত্তি।

একটি টার্মিনাল বন্ধ হলে অন্যগুলো কতটা দ্রুত ঘাটতি পূরণ করতে পারবে, কোনো নির্দিষ্ট প্রযুক্তিতে সমস্যা হলে বিকল্প ব্যবস্থা আছে কি না এবং পরিচালনায় দেশের নিজস্ব সক্ষমতা কতটা—এসব বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।

কারণ বর্তমান অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, এলএনজি সরবরাহে সামান্য বিঘ্নও বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদনে বড় চাপ তৈরি করতে পারে। তৃতীয় এফএসআরইউ তাই শুধু গ্যাস আমদানির সক্ষমতা বাড়ানোর প্রকল্প নয়; এটি ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জ্বালানি নির্ভরতার কাঠামোও নির্ধারণ করবে।

মার্কিন ও চীনা—দুই পক্ষের বিনিয়োগই বাংলাদেশের জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে। কিন্তু কোনো একটি দেশ বা কোম্পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা যেন সেই সুযোগকে নতুন কৌশলগত ঝুঁকিতে পরিণত না করে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।