ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অর্থ ও আমানত বাড়লেও ব্যবসা-বাণিজ্যে সেই অর্থের প্রবাহে গতি নেই। বরং সরকারের ঋণ দ্রুত বাড়ছে, বিপরীতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ নেমে এসেছে কয়েক বছরের তুলনায় ধীর গতিতে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ঋণেও দেখা যাচ্ছে একই প্রবণতা। এর সঙ্গে আমদানি ব্যয় বাড়লেও রপ্তানিতে জুলাইয়ে কিছুটা পতন হয়েছে। ফলে রেমিট্যান্স, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও মূল্যস্ফীতিতে স্বস্তি এলেও অর্থনীতির উৎপাদন ও বিনিয়োগমুখী অংশে চাপের ইঙ্গিত স্পষ্ট হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৬ থেকে ৩১ জুলাই ২০২৬ সময়ের প্রতিবেদনে অর্থনীতির এই পরিবর্তিত চিত্র উঠে এসেছে। এতে দেখা যায়, জুন ২০২৬ শেষে এক বছরে মোট দেশীয় ঋণ বেড়েছে ১০ দশমিক ৫৭ শতাংশ। কিন্তু এই বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে সরকারি খাত থেকে। একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ বেড়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ।
জুন শেষে দেশের মোট দেশীয় ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৫ লাখ ২৫ হাজার ৮১৪ কোটি টাকা। এক বছরে সরকারি খাতে ঋণ বেড়েছে ৩০ দশমিক ৪৩ শতাংশ। ফলে জুন শেষে সরকারের ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৯৯ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিট ঋণ বেড়েছে ৩৪ দশমিক ৫১ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, রাজস্ব আদায়ে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি না হওয়া, ঋণ পরিশোধের ব্যয় বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির কারণে বাড়তি ব্যয় মেটাতে সরকারকে বেশি ঋণ নিতে হয়েছে। ফলে ব্যাংকিং ব্যবস্থাসহ অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সরকারের অর্থ নেওয়ার চাপ বেড়েছে।
অন্যদিকে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহে গতি আরও কমেছে। জুন ২০২৬ শেষে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ। আগের বছরের একই সময়ে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ০২ শতাংশীয় পয়েন্ট কমেছে।
জুন শেষে বেসরকারি খাতে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ২৫ হাজার ৮৬৫ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণ বেড়েছে ৭৮ হাজার ১৭৮ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে একই সময়ে এ বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৬ হাজার ৪৫৮ কোটি টাকা।
বেসরকারি ঋণের এই দুর্বলতার আরও স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যাচ্ছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বা এসএমই খাতে। চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি-মার্চ সময়ে এসএমই ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৯৮ হাজার ৮৮ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ে এই ঋণের স্থিতি ছিল ৩ লাখ ৬ হাজার ১২০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এসএমই খাতে ঋণের স্থিতি কমেছে ৮ হাজার ৩২ কোটি টাকা।
দেশের কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও স্থানীয় ব্যবসার বড় একটি অংশ এসএমই খাতনির্ভর হওয়ায় এই ঋণ কমে যাওয়াকে বেসরকারি বিনিয়োগের দুর্বলতার গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। বৃহৎ ব্যবসার পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন কমে গেলে নতুন বিনিয়োগ, ব্যবসা সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতিতেও চাপ তৈরি হতে পারে।
অর্থাৎ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অর্থের জোগান থাকলেও সেই অর্থের গন্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। একদিকে সরকারের ঋণ দ্রুত বাড়ছে, অন্যদিকে বেসরকারি খাত এবং বিশেষ করে এসএমই খাতে ঋণের প্রবাহ দুর্বল। এতে অর্থনীতিতে সরকারি অর্থায়নের ওজন বাড়লেও উৎপাদনমুখী বেসরকারি অর্থায়নের গতি কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আমদানির বাড়তি চাপ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কাস্টমস ভিত্তিক আমদানি ১০ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ৭৫ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে আমদানি ঋণপত্র খোলা বেড়েছে ৬ দশমিক ৬ শতাংশ। তবে ঋণপত্র নিষ্পত্তির প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ০২ শতাংশ।
রপ্তানিতে অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা দুর্বলতা দেখা দিয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে রপ্তানি ১ দশমিক ৬ শতাংশ কমে ৪৭২ কোটি ৯৭ লাখ ডলারে নেমেছে। একই সময়ে তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে ১ দশমিক ৮৮ শতাংশ। তবে পুরো ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট রপ্তানি সামান্য বেড়ে ৪৮৩৮ কোটি ৩৪ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
বৈদেশিক খাতে অবশ্য পুরোপুরি চাপের চিত্র নেই। বরং রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে শক্তিশালী উন্নতি হয়েছে। জুলাই ২০২৬-এ দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ১৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ বেশি। পুরো ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রেমিট্যান্স এসেছে ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার, আগের অর্থবছরের তুলনায় যা ১৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেশি।
রেমিট্যান্সের এই প্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ৩১ জুলাই ২০২৬ শেষে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার। এক বছর আগে একই সময়ে রিজার্ভ ছিল ২৯ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার।
মূল্যস্ফীতিতেও এসেছে কিছুটা স্বস্তি। জুলাইয়ে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমেছে, জুনে যা ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। একই সময়ে ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশে।
তবে বৈদেশিক খাতের এই স্বস্তির মধ্যেও চলতি হিসাবের ভারসাম্য নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চলতি হিসাবের ঘাটতি বেড়ে ১ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আগের অর্থবছরে এই ঘাটতি ছিল মাত্র ১৪ কোটি ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, বাণিজ্য ঘাটতি ও প্রাথমিক আয় ঘাটতি বাড়ায় চলতি হিসাবের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
রাজস্ব পরিস্থিতিও সরকারের ঋণনির্ভরতার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হয়ে উঠেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ৪ লাখ ১৫ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় এটি ১২ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি হলেও নির্ধারিত ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৮২ দশমিক ৬ শতাংশ পূরণ হয়েছে।
নতুন অর্থবছরের শুরুতেও সরকারের ব্যাংকঋণ বাড়ার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। জুলাই ২০২৬-এ ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণ বেড়েছে ৬ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৮৮ কোটি টাকা।
এদিকে ব্যাংক খাতে আমানত বেড়েছে ১০ দশমিক ৭৪ শতাংশ। জুন শেষে ব্যাংকগুলোর মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ২০ লাখ ৭৯ হাজার ৯১১ কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আমানত বাড়লেও তার বিপরীতে বেসরকারি খাতে ঋণ সম্প্রসারণের গতি তুলনামূলকভাবে কম।
সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে এখন একই সঙ্গে দুটি বিপরীত প্রবণতা স্পষ্ট হচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রার জোগান বাড়ছে, রিজার্ভ শক্তিশালী হচ্ছে এবং মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমছে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ অর্থায়নে সরকারের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে, আর বেসরকারি খাতের পাশাপাশি এসএমই উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তিও দুর্বল হচ্ছে।
এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে অর্থনীতির জন্য বড় প্রশ্ন হবে—ব্যাংকিং ব্যবস্থায় জমা হওয়া অর্থ কতটা উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে যাচ্ছে। কারণ সরকারের ঋণ দ্রুত বাড়ার বিপরীতে বেসরকারি ও এসএমই ঋণের গতি কমে যাওয়া অর্থনীতির পুনরুদ্ধারকে শুধু অর্থের জোগানের বিষয় নয়, বরং অর্থের সঠিক ব্যবহার ও বিনিয়োগের সক্ষমতার প্রশ্নেও নিয়ে যাচ্ছে।















