উপজেলা পর্যায় থেকে নতুন উদ্যোক্তা তুলে আনতে বড় ধরনের অর্থায়ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ‘উদ্যোগ: উপজেলাভিত্তিক তরুণ উদ্যোক্তা অনুসন্ধান, চিহ্নিতকরণ ও অর্থায়ন কর্মসূচি’র আওতায় নির্বাচিত প্রতিটি তরুণ সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকার অর্থায়ন পাবেন। এর অর্ধেক হবে ব্যাংক ঋণ, আর বাকি অর্ধেক দেওয়া হবে অনুদান হিসেবে। ঋণের সুদ বা মুনাফার হারও রাখা হয়েছে সর্বোচ্চ ৪ থেকে ৫ শতাংশ।
শুধু অর্থায়ন নয়, নির্বাচিত উদ্যোক্তাদের ব্যবসা শুরু ও পরিচালনায় প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞ মেন্টরের পরামর্শ, ব্যবসা নিবন্ধন, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরি এবং বাজারের সঙ্গে সংযোগ তৈরির সুযোগও দেওয়া হবে। অর্থাৎ উপজেলা পর্যায়ের তরুণদের শুধু ঋণ দিয়ে ছেড়ে না দিয়ে ব্যবসা দাঁড় করানোর পুরো প্রক্রিয়ায় সহায়তা করার পরিকল্পনা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কর্মসূচির বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান, সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস ডিপার্টমেন্টের উদ্যোগে কর্মসূচিটি বাস্তবায়ন করা হবে। তফসিলি ব্যাংকগুলো তাদের বিদ্যমান শাখা নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে দেশের বিভিন্ন উপজেলার সম্ভাবনাময় তরুণ-তরুণীদের খুঁজে বের করবে। এরপর আবেদনকারীর ব্যবসায়িক ধারণা, প্রকৃত অর্থের প্রয়োজন এবং উদ্যোগের সম্ভাব্যতা যাচাই করে অর্থায়ন করা হবে।
কর্মসূচিতে নির্বাচিত উদ্যোক্তার প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকার অর্থায়ন প্যাকেজ নির্ধারণ করা হবে। এর ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যাংক ঋণ এবং সমপরিমাণ অর্থ অনুদান হিসেবে দেওয়ার সুযোগ থাকবে। ঋণের ক্ষেত্রে কোনো সহায়ক জামানত দিতে হবে না।
তবে এই সুবিধার সঙ্গে উদ্যোক্তার জন্য দায়বদ্ধতাও থাকছে। নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে অনুদানের অর্থ সুদবিহীন ঋণে রূপান্তরিত হবে। এরপর পুরো ঋণ হিসাব প্রচলিত নিয়মে শ্রেণিকৃত হয়ে খেলাপি হিসেবে বিবেচিত হবে। ফলে ভবিষ্যতে ওই উদ্যোক্তার নতুন ঋণ পাওয়ার যোগ্যতা হারানোর ঝুঁকি থাকবে।
আবেদনের জন্য বয়স ও বসবাসের নির্দিষ্ট শর্তও রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের যেকোনো প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক, যার বয়স আবেদনের শেষ তারিখে সর্বোচ্চ ২৮ বছর এবং যিনি সংশ্লিষ্ট উপজেলার বাসিন্দা, তিনি আবেদন করতে পারবেন। আগে ব্যবসা করার অভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক নয়। তবে আবেদনকারীর একটি বাস্তবসম্মত ব্যবসায়িক ধারণা থাকতে হবে।
কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ থেকে শুরু করে হস্তশিল্প, মৎস্য, পশুপালন, পর্যটন, সেবা ও প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্যোগ—সব ধরনের বৈধ ব্যবসায়িক উদ্যোগ এ কর্মসূচির আওতায় আসতে পারবে। আবেদনের জন্য কোনো ফি দিতে হবে না। সংশ্লিষ্ট উপজেলার বাসিন্দারা যেকোনো তফসিলি ব্যাংকের শাখায় নির্ধারিত ফর্মে আবেদন করতে পারবেন।
প্রাথমিকভাবে দেশের আট বিভাগের আট জেলা থেকে ৬৪টি উপজেলায় কর্মসূচিটি শুরু হবে। জেলাগুলো হলো মানিকগঞ্জ, ফেনী, নওগাঁ, ঝিনাইদহ, ভোলা, হবিগঞ্জ, রংপুর ও নেত্রকোনা। প্রতিটি উপজেলা থেকে ১০ জন করে মোট ৬৪০ জন তরুণ উদ্যোক্তাকে প্রথম ধাপে নির্বাচিত করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য জেলার উপজেলাগুলোতেও কর্মসূচিটি সম্প্রসারণ করা হবে। তখন প্রতি বছর প্রায় ৫ হাজার তরুণ উদ্যোক্তাকে অর্থায়ন ও অন্যান্য সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
কর্মসূচির বিস্তারিত নির্দেশনা সংবলিত সার্কুলার আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর জারি করা হবে। সার্কুলার জারির পর এক মাস আবেদন গ্রহণ করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগের বিশেষত্ব হলো, প্রচলিত ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা অর্থায়নের বাইরে গিয়ে উপজেলা পর্যায়ে ব্যবসার সম্ভাবনা থাকা তরুণদের খুঁজে বের করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ব্যাংকের শাখা নেটওয়ার্ককে শুধু ঋণ বিতরণের মাধ্যম হিসেবে নয়, সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা শনাক্ত করার মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহার করা হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রত্যাশা, কম সুদের ঋণের সঙ্গে অনুদান, প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ যুক্ত থাকায় নতুন উদ্যোক্তাদের প্রাথমিক ঝুঁকি কমবে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে নতুন ব্যবসা তৈরি হলে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং উপজেলা অর্থনীতিতে নতুন কর্মকাণ্ড তৈরি হবে।
সব মিলিয়ে, কর্মসূচিটির লক্ষ্য শুধু ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন দেওয়া নয়; বরং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের তরুণদের ব্যবসার ধারণাকে বাস্তব উদ্যোগে রূপ দেওয়ার জন্য অর্থ, দক্ষতা ও বাজার—তিন ধরনের সহায়তা একসঙ্গে নিশ্চিত করা।















