ডিএসজে
বিদেশ থেকে ঋণ নেওয়ার পর সেই অর্থ দ্রুত টাকায় ভাঙানোর বাধ্যবাধকতা না রেখে এখন দেশীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা হিসাবেই ধরে রাখতে পারবেন বেসরকারি খাতের শিল্পোদ্যোক্তারা। অনুমোদিত বিদেশি ঋণের অর্থ সংরক্ষণের জন্য ঋণগ্রহীতার নামে বৈদেশিক মুদ্রা হিসাব খোলার অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এর ফলে বিদেশি ঋণে যন্ত্রপাতি বা কাঁচামাল আমদানি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বিদেশে অর্থ পরিশোধ করতে হলে একই অর্থ আগে টাকায় রূপান্তর করে পরে আবার ডলার বা অন্য বৈদেশিক মুদ্রা কেনার প্রয়োজন কমবে। বিশেষ করে বড় শিল্পপ্রকল্পে বৈদেশিক মুদ্রায় আয় ও ব্যয়ের মধ্যে সময়ের ব্যবধান থাকলে বিনিময় হারের ওঠানামা থেকে তৈরি হওয়া ঝুঁকিও কিছুটা সামলানোর সুযোগ পাবেন উদ্যোক্তারা।
বুধবার (৭ অক্টোবর) বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগ-২ এ-সংক্রান্ত সার্কুলার জারি করেছে। নতুন ব্যবস্থা অবিলম্বে কার্যকর হয়েছে। দেশে বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান আগে থেকেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন নিয়ে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি অর্থায়ন নিতে পারে। নতুন সিদ্ধান্তে সেই অনুমোদিত ঋণের অর্থ বৈদেশিক মুদ্রায় সংরক্ষণের পথ তৈরি করা হলো।
তবে এই হিসাবে যেকোনো বিদেশি ঋণের অর্থ রাখা যাবে না। অনুমোদিত ঋণের ক্ষেত্রেই মনোনীত অনুমোদিত ডিলার ব্যাংক ঋণগ্রহীতার নামে হিসাব খুলতে পারবে। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ইনভেস্ট বাংলাদেশ অথরিটির বৈদেশিক ঋণ বা সরবরাহকারী ঋণ যাচাই কমিটির অনুমোদন নিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক কিংবা নন-কনসেশনাল লোনসংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির অনুমোদন প্রয়োজন হলে ব্যাংককে সেই নথিও সংরক্ষণ করতে হবে।
হিসাবে রাখা বৈদেশিক মুদ্রা ইচ্ছামতো খরচ করার সুযোগ থাকছে না। যে কাজের জন্য বিদেশি ঋণ অনুমোদিত হয়েছে, সেই কাজেই অর্থ ব্যবহার করতে হবে। প্রচলিত আমদানি নীতি ও বৈদেশিক মুদ্রা বিধি মেনে আমদানি মূল্য পরিশোধ করা যাবে। সংশ্লিষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রকৃত সেবা ব্যয়ও এই হিসাব থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় মেটানো যাবে।
ধরা যাক, একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিদেশি ঋণে নতুন কারখানা স্থাপন করছে। ঋণের অর্থের একটি অংশ দিয়ে বিদেশ থেকে যন্ত্রপাতি কিনবে, আরেকটি অংশ বিদেশি কারিগরি বা প্রকৌশল সেবার মূল্য পরিশোধে লাগবে। নতুন ব্যবস্থায় অনুমোদনের শর্ত মেনে এসব অর্থ সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রার হিসাব থেকে পরিশোধ করা সম্ভব হবে।
সেবা খাতের অর্থ পরিশোধে প্রযোজ্য কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিতে হবে। ব্যাংককে লেনদেন যাচাইয়ের পাশাপাশি প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রযোজ্য কর ও মূল্য সংযোজন কর কেটে সরকারি কোষাগারে জমা নিশ্চিত করতে হবে। আবার প্রকল্পের স্থানীয় কেনাকাটার প্রয়োজন হলে অনুমোদনের শর্ত মেনে বৈদেশিক মুদ্রা টাকায় নগদায়ন করা যাবে।
আরও একটি সুবিধা রাখা হয়েছে। ঋণের অর্থ যে বৈদেশিক মুদ্রা হিসাবে থাকবে, সেই হিসাবে ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্কের প্রচলিত শর্ত অনুযায়ী সুদ বা মুনাফা পাওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ বিদেশি ঋণের অব্যবহৃত অংশ অনুমোদিত কাজে ব্যবহারের অপেক্ষায় হিসাবে পড়ে থাকলেও ব্যাংকের শর্ত অনুযায়ী তা থেকে আয় করার সুযোগ থাকবে।
অর্থ ব্যবহারের ওপর অবশ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারি থাকবে। অনুমোদিত ডিলার ব্যাংককে প্রতি তিন মাসে নির্ধারিত ‘ফরম এলইউ’-তে ঋণের অর্থ কীভাবে ব্যবহার হয়েছে, তার তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা বিনিয়োগ বিভাগে জমা দিতে হবে। ডিসেম্বর, মার্চ, জুন ও সেপ্টেম্বর—প্রতি প্রান্তিক শেষে এই প্রতিবেদন দিতে হবে।
সার্কুলারের সঙ্গে দেওয়া ফরমে ঋণগ্রহীতা ও ঋণদাতার পরিচয়, অনুমোদিত ঋণের পরিমাণ, মুদ্রা, অর্থ উত্তোলন ও হিসাবে জমার তারিখ, বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ, টাকায় নগদায়ন, সুবিধাভোগীর নাম এবং অর্থ ব্যবহারের উদ্দেশ্য পর্যন্ত জানাতে হবে। ঋণগ্রহীতার ঘোষণার পাশাপাশি অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকের প্রতিস্বাক্ষরও লাগবে।
ঋণের অর্থ তোলা ও ব্যবহার শেষ হলে সাধারণভাবে বৈদেশিক মুদ্রা হিসাবটি বন্ধ করতে হবে। তবে ঋণচুক্তিতে ঋণ পরিশোধের অর্থ ধরে রাখার শর্ত থাকলে মেয়াদপূর্তি পর্যন্ত হিসাবটি চালু রাখা যাবে। সেখানে রপ্তানি আয় থেকে আমদানি ব্যয় বাদ দেওয়ার পর অবশিষ্ট অর্থ এবং বৈধ স্থানীয় উৎসের টাকা বৈদেশিক মুদ্রায় রূপান্তর করেও জমা দেওয়া যাবে।
এখানে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সীমাও বেঁধে দিয়েছে। ঋণ পরিশোধের জন্য ওই হিসাবে সর্বোচ্চ পরবর্তী তিন কিস্তির সমপরিমাণ অর্থ রাখা যাবে। ফলে বিদেশি ঋণ নেওয়া প্রতিষ্ঠান আগেভাগে কিছু বৈদেশিক মুদ্রা জমিয়ে রেখে আসন্ন কিস্তির জন্য প্রস্তুতি নিতে পারবে। ডলারের দর হঠাৎ বেড়ে গেলে কিস্তির সময় একসঙ্গে বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহের চাপও এতে কিছুটা কমতে পারে।
নতুন সুবিধা ইনভেস্ট বাংলাদেশ অথরিটি, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং নন-কনসেশনাল লোনসংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির অনুমোদন পাওয়া যোগ্য ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। তবে মূল শর্ত একটিই—বিদেশি ঋণ যে উদ্দেশ্যে অনুমোদন করা হয়েছে, অর্থ ব্যবহার করতে হবে সেই উদ্দেশ্যেই।
নতুন ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন তাই ঋণের পরিমাণে নয়, বিদেশি ঋণের অর্থ ব্যবস্থাপনায়। একটি প্রতিষ্ঠান ডলারে ঋণ নিয়ে বিদেশেই অর্থ পরিশোধ করবে—এখন সেই অর্থ দেশীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা হিসাবে রেখে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করতে পারবে। পাশাপাশি সামনে থাকা তিন কিস্তির অর্থ ধরে রাখার সুযোগ বিদেশি ঋণ পরিশোধের পরিকল্পনাও কিছুটা সহজ করতে পারে।















