ঢাকা,  শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, কার্তিক ৮ ১৪৩৩

পুঁজিবাজারে না এলে কোম্পানিকে বাধ্য করবে বিএসইসি

পুঁজিবাজার

ডিএসজে প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৯:২৩,১০ অক্টোবর ২০২৬

আপডেট: ১৪:৪৭,১১ অক্টোবর ২০২৬

সর্বশেষ

পুঁজিবাজারে না এলে কোম্পানিকে বাধ্য করবে বিএসইসি

ছবি- আইডিএলসি

দেশের বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে স্বেচ্ছায় পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এই আহ্বানে সাড়া না দিলে বিদ্যমান আইনি ক্ষমতা প্রয়োগ করে কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে আসতে বাধ্য করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন কমিশনের চেয়ারম্যান মাসুদ খান। 

তিনি জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে বেশ কিছু দেশি-বিদেশি ও বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে সরাসরি আলোচনা হয়েছে। প্রথমে স্বেচ্ছায় তালিকাভুক্তির সুযোগ দেওয়া হবে। এরপরও যারা বাজারের বাইরে থাকবে, তাদের ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করবে কমিশন।

শনিবার (১০ অক্টোবর) রাজধানীর গুলশানের রেনেসাঁ ঢাকা হোটেলে আয়োজিত ‘আইডিএলসি ক্যাপিটাল মার্কেট কনক্লেভ ২০২৬’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। আইডিএলসি ফাইন্যান্সের সহযোগী প্রতিষ্ঠান আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টস আয়োজিত অনুষ্ঠানে পুঁজিবাজারে বড় কোম্পানির অংশগ্রহণ বাড়ানো, ব্যাংকঋণনির্ভরতা কমানো, প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) অনুমোদন সহজ করা এবং বন্ডবাজার শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

মাসুদ খান বলেন, ‘পুঁজিবাজারে আসার বিষয়টি বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের গুরুত্ব দিয়ে চিন্তা করা উচিত। প্রথমে দেখা হবে, তাদের মধ্যে কারা কারা আসছে, আর কারা কারা আসছে না। আমার হাতে অস্ত্র আছে। সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ আইনে বিএসইসিকে স্পষ্ট ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কমিশন চাইলে যেকোনো কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে নির্দেশ দিতে পারে।’

তিনি বলেন, কমিশন চায় কোম্পানিগুলো বাধ্যবাধকতার পরিবর্তে স্বপ্রণোদিত হয়ে বাজারে আসুক এবং তালিকাভুক্তির সুবিধা গ্রহণ করুক। এ জন্য দেশি-বিদেশি ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা হচ্ছে। তবে স্বেচ্ছায় অংশগ্রহণের উদ্যোগ কার্যকর না হলে আইন প্রয়োগের পথও খোলা থাকবে।

দীর্ঘদিন ধরে দেশের বড় শিল্পগোষ্ঠী ও লাভজনক বহুজাতিক কোম্পানির উল্লেখযোগ্য অংশ পুঁজিবাজারের বাইরে রয়েছে। ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক সাফল্যের অংশীদার হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহেও ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরশীলতা বজায় রয়েছে।

মাসুদ খানের মতে, শুধু ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করে ব্যবসা সম্প্রসারণ কিংবা দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যবসা বিস্তার, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন এবং মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার মধ্যে কার্যকর পৃথকীকরণের জন্য পুঁজিবাজার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশেষ করে পরিবারনিয়ন্ত্রিত বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে তালিকাভুক্তি দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে সহায়ক হতে পারে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, উত্তরাধিকার পরিবর্তনের সময় ব্যবসা পরিচালনায় যে জটিলতা তৈরি হয়, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা সেই ঝুঁকি কমাতে পারে।

করব্যবস্থার স্বয়ংক্রিয়করণ এবং ব্যাংকিং লেনদেনে ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রসারের কথাও উল্লেখ করেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। তাঁর মতে, এসব পরিবর্তনের ফলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক কার্যক্রম অস্বচ্ছ রাখার সুযোগ কমছে। ফলে স্বচ্ছ হিসাব, যথাযথ কোম্পানি মূল্যায়ন ও টেকসই সম্প্রসারণের জন্য পুঁজিবাজারে আসার যৌক্তিকতা আরও জোরালো হচ্ছে।

অনুষ্ঠানে আইপিও অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতা কমাতে নেওয়া সংস্কারের কথাও জানান মাসুদ খান। তিনি বলেন, যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া পুনর্গঠন করে নিরীক্ষকদের জবাবদিহি বাড়ানো হচ্ছে। কোম্পানির আর্থিক বিবরণীর নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিধিবদ্ধ নিরীক্ষকদের দায়িত্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ করা হয়েছে।

পাশাপাশি আইপিওতে শেয়ারের মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মূল্য নিয়ে ঐকমত্য তৈরির কিছু অবাস্তব শর্ত বাদ দিয়ে ডাচ নিলামভিত্তিক স্বচ্ছ মূল্য আবিষ্কার পদ্ধতির দিকে এগোচ্ছে কমিশন। এর উদ্দেশ্য কোম্পানির শেয়ারের যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ এবং নতুন কোম্পানির বাজারে আসার প্রক্রিয়া কার্যকর করা।

বন্ডবাজার সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও আলোচনায় আসে। বর্তমানে নিষ্ক্রিয় বিকল্প লেনদেন বোর্ডের পরিবর্তে স্টক এক্সচেঞ্জের মূল বোর্ডের মাধ্যমে করপোরেট বন্ড অনুমোদনের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ রয়েছে। একই সঙ্গে সেন্ট্রাল কাউন্টারপার্টি বাংলাদেশ লিমিটেডকে (সিসিবিএল) কার্যকর করার প্রচেষ্টার কথাও জানান বিএসইসি চেয়ারম্যান। প্রতিষ্ঠানটি চালু হলে শেয়ার লেনদেন নিষ্পত্তির ব্যবস্থায় উন্নতি এবং ভবিষ্যতে ডেরিভেটিভস ও শর্ট সেলিংয়ের মতো আধুনিক লেনদেনপদ্ধতি চালুর প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি হতে পারে। 

মূল প্রবন্ধে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক নাজনীন আহমেদ বলেন, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় মূলধন ও ঋণ দেওয়ার সক্ষমতায় চাপ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানিসংকট ও ব্যাংকিং খাতের সমস্যার কারণে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ উদ্বেগজনকভাবে কমেছে।

তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় সঞ্চয় এবং বিনিয়োগের সক্ষমতাও দুর্বল হচ্ছে। এ অবস্থায় নতুন বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি বড় চ্যালেঞ্জ। বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যাংক খাতের পাশাপাশি পুঁজিবাজারের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি। দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিবেশেও আস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

অনুষ্ঠানে আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থায়নের প্রায় ৭৫ শতাংশ ব্যাংকঋণনির্ভর। তাঁর উপস্থাপিত তুলনামূলক তথ্য অনুযায়ী, ভারতে এই হার প্রায় ৫৩ শতাংশ এবং উন্নত পুঁজিবাজারে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। তিনি বলেন, ব্যাংক খাত দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য আরও ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো প্রয়োজন।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে দেশের পুঁজিবাজারের বাজারমূলধন মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৭ দশমিক ৪ শতাংশ বা তারও কম। ২০৩০ সালের মধ্যে তা জিডিপির ২০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। তাঁর প্রত্যাশা, বন্ড ও সরকারি সিকিউরিটিজসহ বাজারের আকার বর্তমান প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের ইক্যুইটি বাজার থেকে ২০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি হতে পারে। তবে এই লক্ষ্য অর্জনে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন।

আইডিএলসি ফাইন্যান্সের চেয়ারম্যান কাজী মাহমুদ সাত্তার বলেন, বাংলাদেশে মিউচুয়াল ফান্ড পরিচালনায় ভালো চর্চা গড়ে না ওঠায় অনেক সঞ্চয়কারী পুঁজিবাজারের পরিবর্তে ব্যাংকের স্থায়ী আমানতের ওপর নির্ভর করেন। অথচ সব বিনিয়োগকারী সরাসরি শেয়ারে উচ্চ ঝুঁকি নিতে চান না। তাঁদের জন্য আস্থাযোগ্য মিউচুয়াল ফান্ড ও অন্যান্য বিনিয়োগব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টসের চেয়ারম্যান এম জামাল উদ্দিন বলেন, অর্থনীতির সম্প্রসারণের সঙ্গে অর্থায়নের চাহিদাও বাড়ছে। দীর্ঘমেয়াদি করপোরেট অর্থায়নের কার্যকর উৎস হিসেবে পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করা গেলে ব্যাংক খাতের ওপর চাপ কমানো সম্ভব হবে।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ইমাম আবু সাঈদ, বিএসইসির কমিশনার তানভীর হাবিব রহমানসহ ব্যাংক, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও পুঁজিবাজারের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
 

সর্বশেষ