ডিএসজে
দীর্ঘদিন নিয়মিত পর্ষদ সভা হয়নি। আটকে আছে একের পর এক আর্থিক প্রতিবেদন। ফলে কোম্পানি দুটির প্রকৃত আয়-ব্যয়, মুনাফা-লোকসান কিংবা আর্থিক অবস্থার হালনাগাদ চিত্রও জানতে পারছেন না বিনিয়োগকারীরা। এমন অচলাবস্থার মধ্যে বেক্সিমকো লিমিটেড ও শাইনপুকুর সিরামিকস পিএলসির সাত সদস্যের নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠনের প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত বিএসইসির ১০৩২তম কমিশন সভায় দুই কোম্পানির পর্ষদ পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। কমিশনের প্যানেলভুক্ত আইনজীবীর মাধ্যমে হাইকোর্ট বিভাগের মৌখিক নির্দেশনার বিষয়টি জানার পর এবং বিনিয়োগকারীদের সার্বিক স্বার্থ বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে বিএসইসির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
শাইনপুকুর সিরামিকসের নতুন সাত সদস্যের পর্ষদে উদ্যোক্তা এ এস এফ রহমান চেয়ারম্যান থাকছেন। উদ্যোক্তা গোষ্ঠীর মনোনীত পরিচালক হচ্ছেন ও কে চৌধুরী, ইকবাল আহমেদ, আজমল কবির ও কামরুন নাহার আহমেদ। করপোরেট গভর্ন্যান্স কোড, ২০১৮ অনুসরণ করে আরও দুজন স্বাধীন পরিচালক নিয়োগ দিতে হবে।
বেক্সিমকো লিমিটেডেও চেয়ারম্যান হচ্ছেন এ এস এফ রহমান। তবে এখানে ও কে চৌধুরী থাকছেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে। ইকবাল আহমেদ, আজমল কবির ও কামরুন নাহার আহমেদ উদ্যোক্তা গোষ্ঠীর মনোনীত পরিচালক। শাহ মঞ্জুরুল হক স্বাধীন পরিচালক হিসেবে থাকছেন। আরেকজন স্বাধীন পরিচালক নিয়োগ দিতে হবে করপোরেট গভর্ন্যান্স কোড অনুসারে। ফলে এই কোম্পানির পর্ষদও হবে সাত সদস্যের।
নতুন পর্ষদ গঠনের মধ্য দিয়ে প্রায় দুই বছর ধরে চলা আইনি ও নিয়ন্ত্রক জটিলতা কাটিয়ে কোম্পানি দুটির নিয়মিত কার্যক্রমে ফেরার একটি পথ তৈরি হলো। পর্ষদ অকার্যকর থাকায় আর্থিক প্রতিবেদন অনুমোদন, বার্ষিক সাধারণ সভা এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো স্বাভাবিক কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল।
এর প্রভাব সবচেয়ে সরাসরি পড়েছে সাধারণ বিনিয়োগকারীর ওপর। শেয়ার কিনে একটি কোম্পানির অংশীদার হলেও মাসের পর মাস তাঁরা জানতে পারছেন না কোম্পানিটি কত আয় করছে, কত ব্যয় হচ্ছে কিংবা মুনাফা ও আর্থিক অবস্থার কী পরিবর্তন ঘটছে। বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য সবচেয়ে মৌলিক যে তথ্যগুলো প্রয়োজন, সেগুলোই সময়মতো বাজারে আসেনি।
বেক্সিমকো লিমিটেড ও শাইনপুকুর সিরামিকস সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিক, অর্থাৎ ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এরপর অন্তত পাঁচ প্রান্তিকের আর্থিক তথ্য প্রকাশ বাকি পড়েছে। এর মধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক হিসাবের পাশাপাশি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তিন প্রান্তিকের প্রতিবেদনও রয়েছে। এখন ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের সময়ও এসে গেছে।
অচলাবস্থার সূত্রপাত সরকার পরিবর্তনের পর বেক্সিমকো গ্রুপের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর পর্ষদে স্বাধীন পরিচালক নিয়োগকে কেন্দ্র করে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারির মধ্যে বেক্সিমকো লিমিটেড, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস ও শাইনপুকুর সিরামিকসে স্বাধীন পরিচালক নিয়োগ দেয় বিএসইসি। ওই সিদ্ধান্ত আদালতে চ্যালেঞ্জ করে বেক্সিমকো। এরপর আইনি ও নিয়ন্ত্রক জটিলতার মধ্যে নিয়মিত পর্ষদ সভা বন্ধ হয়ে যায়।
এদিকে কোম্পানিগুলো নিয়মিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ না করায় সমস্যা আরও গভীর হয়েছে। আর্থিক প্রতিবেদন অনুমোদনের জন্যও পর্ষদ সভা প্রয়োজন। একইভাবে লভ্যাংশ ঘোষণা, বার্ষিক সাধারণ সভা আয়োজন এবং কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণেও সক্রিয় পরিচালনা পর্ষদের ভূমিকা রয়েছে। এসব কার্যক্রম আটকে থাকায় বিএসইসি এর আগে কোম্পানিগুলোকে পর্ষদ সভা করার নির্দেশও দিয়েছিল।
এবার নতুন পর্ষদ অনুমোদনের সঙ্গে আগের বিরোধ নিষ্পত্তির পথও তৈরি হচ্ছে। বেক্সিমকো গ্রুপের পক্ষ থেকে বিএসইসিকে জানানো হয়েছিল, নতুন পর্ষদ অনুমোদন পেলে স্বাধীন পরিচালক নিয়োগসহ কমিশনের আগের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে করা রিট প্রত্যাহার করা হবে।
বিএসইসিও দুই কোম্পানির ক্ষেত্রে মামলা প্রত্যাহার সাপেক্ষে ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করেছে। অর্থাৎ পুরোনো পর্ষদ-সংক্রান্ত ব্যবস্থার বদলে এখন নতুন সাত সদস্যের পর্ষদ নিয়ে এগোনোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বেক্সিমকো গ্রুপের কোম্পানিগুলোর জন্য এই পরিবর্তন এমন সময়ে এলো, যখন গ্রুপটির আর্থিক ও ব্যবসায়িক পরিস্থিতি নিয়ে বড় ধরনের চাপ রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আদালতে দেওয়া প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের নভেম্বর শেষে বেক্সিমকো গ্রুপের মোট ঋণ ও দায় ছিল ৫০ হাজার ৯৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২৫ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা তখনই খেলাপি হয়ে পড়েছিল। অর্থসংকট ও কার্যক্রমে বিঘ্নের কারণে গ্রুপের কিছু প্রতিষ্ঠানে কাঁচামাল আমদানিও বাধাগ্রস্ত হয়েছে; শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি পরিশোধ নিয়েও সংকট তৈরি হয়েছিল।
ফলে নতুন পর্ষদের সামনে কাজ শুধু সভা শুরু করা নয়। দীর্ঘদিন আটকে থাকা হিসাব অনুমোদন, আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ এবং কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থার তথ্য বিনিয়োগকারীদের সামনে আনাও এখন গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে বেক্সিমকো ও শাইনপুকুরের শেয়ারধারীদের জন্য নতুন পর্ষদের প্রথম কয়েকটি সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। দীর্ঘ অচলাবস্থার পর কোম্পানি দুটি কত দ্রুত বকেয়া আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারে, নিয়মিত পর্ষদ সভা ও বার্ষিক সাধারণ সভায় ফিরতে পারে এবং ব্যবসার স্বাভাবিক কার্যক্রম কতটা সচল করতে পারে—এখন নজর থাকবে সেদিকেই।















