ঢাকা,  মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, কার্তিক ১২ ১৪৩৩

আইএমএফের শর্ত নয়, বাজার থেকেই অর্থ তুলতে চায় সরকার

পুঁজিবাজার

ডিএসজে প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২২:৩১,৪ অক্টোবর ২০২৬

আপডেট: ০০:৪০,৭ অক্টোবর ২০২৬

আইএমএফের শর্ত নয়, বাজার থেকেই অর্থ তুলতে চায় সরকার

ছবি- বিএসইসি

আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও এডিবির ঋণের ওপর নির্ভর করে অর্থনীতি চালানোর পথ থেকে সরে বাজার থেকে বড় অঙ্কের অর্থ সংগ্রহের পথে যেতে চায় সরকার। লক্ষ্য বছরে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন। সেই অর্থের জন্য দেশীয় পুঁজিবাজার ও বন্ড বাজারের পাশাপাশি নিউইয়র্ক, চীন ও জাপানের বাজারেও যেতে চায় বাংলাদেশ।

এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দেশের আর্থিক কাঠামোই বদলে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তাঁর ঘোষণা অনুযায়ী, নিউইয়র্কে ডলার বন্ডের পাশাপাশি পাণ্ডা বন্ড, সামুরাই বন্ড ও স্থানীয় মুদ্রার বন্ড ছাড়ার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থ সংগ্রহে কাজে লাগানো হবে পদ্মা ও যমুনা সেতুর মতো আয় সৃষ্টিকারী রাষ্ট্রীয় সম্পদও।

আর এই নতুন অর্থায়ন ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে চান দেশের পুঁজিবাজারকে।

রবিবার (৪ অক্টোবর) রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশে ‘বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সরকারের এই পরিকল্পনা তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের পুঁজিবাজারের চেহারায় বড় পরিবর্তনের কথাও বলেন।

আমির খসরুর বক্তব্যে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত এসেছে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থায়ন সম্পর্ক নিয়ে।

তিনি বলেন, আইএমএফের শর্ত দেশের কাছে গ্রহণযোগ্য না হলে সরকার তা মেনে নেবে না। আইএমএফ কর্মসূচি বাতিল করার কথাও অনুষ্ঠানে জানান তিনি।

অর্থমন্ত্রীর হিসাব, বাংলাদেশের প্রয়োজন বছরে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার। বিপরীতে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীরা সম্মিলিতভাবে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার দিতে পারে। এই অর্থ দিয়ে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে নেওয়া সম্ভব নয় বলে মনে করেন তিনি।

তাই তাঁর বার্তা—অর্থের জন্য বাজারে যেতে হবে।

দেশের ভেতরে পুঁজিবাজার ও বন্ড বাজার। দেশের বাইরে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজার।

নিউইয়র্কে ডলার বন্ড ছাড়ার পরিকল্পনার পাশাপাশি হংকংয়ে বাংলাদেশকেন্দ্রিক তহবিল গঠন, চীনের বাজারে পাণ্ডা বন্ড, জাপানে সামুরাই বন্ড এবং স্থানীয় মুদ্রায় বন্ডের মতো আর্থিক উপকরণ তৈরির কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী।

অর্থাৎ সরকারের পরিকল্পনায় পরিবর্তনটি শুধু নতুন একটি বন্ড ছাড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সরকারি অর্থায়ন, বেসরকারি খাতের মূলধন সংগ্রহ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার অর্থ—তিন ক্ষেত্রেই ব্যাংক ও উন্নয়ন সহযোগীনির্ভরতা কমিয়ে বাজারের অংশ বাড়াতে চায় সরকার।

পদ্মা-যমুনার আয়ও অর্থের উৎস

সরকারের নতুন অর্থায়ন পরিকল্পনায় রাষ্ট্রীয় সম্পদের ভবিষ্যৎ আয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

পদ্মা সেতু ও যমুনা সেতুর মতো বড় অবকাঠামোর ভবিষ্যৎ আয়কে সিকিউরিটিজে রূপান্তর করে বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।

এর ফলে ইতিমধ্যে নির্মিত ও আয় করা সরকারি সম্পদকে কেন্দ্র করে নতুন অর্থ সংগ্রহের পথ তৈরি হবে। সরকারের হাতে থাকা সম্পদের ভবিষ্যৎ নগদ প্রবাহকে ব্যবহার করে বর্তমানেই মূলধন সংগ্রহ করা যাবে।

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায় সরাসরি সরকারি অর্থ দেওয়ার ব্যবস্থাও বদলাতে চান আমির খসরু।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের উড়োজাহাজ কেনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, একটি প্রতিষ্ঠান ব্যবসা করবে আর সেই ব্যবসার জন্য করদাতার অর্থ সরকার দিয়ে যাবে—এই ব্যবস্থা আর চলবে না। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকেও প্রয়োজনীয় অর্থ বাজার থেকে সংগ্রহ করতে হবে।

সরকার নিজে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ‘চেক লেখক’ হয়ে থাকবে না—এমন অবস্থানের কথাও তুলে ধরেন তিনি।

এই নীতি কার্যকর হলে সরকারি প্রতিষ্ঠানের মূলধন সংগ্রহেও বড় পরিবর্তন আসবে। বিমান কেনা থেকে ব্যবসা সম্প্রসারণ—বড় বিনিয়োগের অর্থের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাজারমুখী হতে হবে।

একই পরিবর্তন চান বেসরকারি খাতেও।

অর্থমন্ত্রীর মতে, উচ্চ সুদে ব্যাংক থেকে বিপুল ঋণ নিয়ে বাংলাদেশের ব্যবসা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারবে না। ব্যবসার অর্থের ব্যয় কমাতে হলে দীর্ঘমেয়াদি মূলধনের উৎস হিসেবে পুঁজিবাজার ও বন্ড বাজারকে শক্তিশালী করতে হবে।

এই লক্ষ্যেই এতদিন আলাদাভাবে কাজ করা বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বিএসইসি ও আর্থিক খাতের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে একই অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আমির খসরুর ভাষায়, প্রতিষ্ঠানগুলো এতদিন ‘বিচ্ছিন্ন দ্বীপের’ মতো কাজ করেছে। এখন নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নিয়মিত সমন্বয় করা হচ্ছে।

এক বছরে বাজার বদলের লক্ষ্য

এত বড় অর্থায়ন পরিকল্পনার জন্য বর্তমান পুঁজিবাজার যথেষ্ট নয়। অর্থমন্ত্রী নিজেও বাংলাদেশের বাজারকে গভীরতাহীন বা ‘শ্যালো মার্কেট’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

গত এক দশকে স্টক এক্সচেঞ্জ ও মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যর্থতার কথাও বলেন তিনি। তাঁর ভাষায়, অর্থনীতির সঙ্গে পুঁজিবাজারও একই ‘গর্তে’ পড়ে গিয়েছিল। এখন সরকার সেখান থেকে বাজারকে তুলে আনার চেষ্টা করছে।

আগামী এক বছরের মধ্যে এই বাজারের চেহারা বদলে দেওয়ার লক্ষ্য ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী।

তাঁর দাবি, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরছে। বাংলাদেশের বাজার নিয়ে বড় বিদেশি কোম্পানির সঙ্গেও তিনি কথা বলেছেন এবং তাদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পেয়েছেন। এসব প্রতিষ্ঠান নিয়মিত বাংলাদেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং দেশের বর্তমান নেতৃত্বের ওপর তাদের আস্থা রয়েছে বলে জানান তিনি।

বাজারে স্বচ্ছতা আনতে শুধু নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর নির্ভর করতেও চান না আমির খসরু।

ব্রোকার, স্টক এক্সচেঞ্জ, বিনিয়োগকারী ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান—প্রত্যেককে নিজেদের কার্যক্রমে স্বনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, সততা ও স্বচ্ছতার জন্য প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানকেই নিজের ভেতরে নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।

বাণিজ্যমন্ত্রী থাকার সময় তৈরি পোশাকশিল্পে ইউডি সনদ দেওয়ার দায়িত্ব ইপিবির কাছ থেকে বিজিএমইএর হাতে দেওয়ার অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন তিনি। সেই উদাহরণ দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, সক্ষমতা তৈরি করে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের দায়িত্ব নিজেরাই নিতে হবে।

পুঁজিবাজারে সেই সক্ষমতা তৈরির একটি বড় পরীক্ষা হবে ভালো কোম্পানি বাজারে আনা।

তিন মাসে আইপিও, আসবে সরাসরি তালিকাভুক্তি

দেশের পুঁজিবাজারে প্রায় দুই বছরের আইপিও খরা কাটাতে আবেদন থেকে অনুমোদনের সময় সর্বোচ্চ তিন মাসে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ঘোষণা করেছেন বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান।

অতীতে একটি আইপিও অনুমোদন পেতে এক থেকে দেড় বছর পর্যন্ত সময় লাগত। নতুন ব্যবস্থায় ডিএসই, সিএসই ও বিএসইসির কার্যক্রম সমন্বিতভাবে পরিচালনা করে পুরো প্রক্রিয়াটি দ্রুত শেষ করতে চায় কমিশন।

মাসুদ খান বলেছেন, আবেদন পাওয়ার তিন মাসের মধ্যে আইপিও অনুমোদন দেওয়াই হবে নতুন লক্ষ্য।

শুধু প্রচলিত আইপিও নয়। বড় স্থানীয় ও বহুজাতিক কোম্পানিকে বাজারে আনতে সরাসরি তালিকাভুক্তির পথও তৈরি করা হচ্ছে।

সরাসরি তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে যোগ্যতার মানদণ্ড কঠোর থাকবে। মৌলভিত্তি শক্তিশালী কোম্পানিকে এই সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

এর সঙ্গে আসছে হাইব্রিড পদ্ধতি।

এই ব্যবস্থায় একটি কোম্পানি নতুন শেয়ার ছেড়ে মূলধন সংগ্রহের পাশাপাশি বিদ্যমান মালিকদের শেয়ারের একটি অংশও বাজারে ছাড়তে পারবে। বিএসইসি মনে করছে, বহুজাতিক ও বড় দেশীয় কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আনতে এই ব্যবস্থা নতুন পথ খুলতে পারে।

ইতিমধ্যে সরাসরি তালিকাভুক্তির খসড়া বিধি নিয়ে ইউনিলিভার, মেটলাইফ, নেসলে বাংলাদেশ, বাংলালিংক, বিকাশ, ইনসেপ্টা, প্রাণ-আরএফএল, মেঘনা গ্রুপ, আবুল খায়ের গ্রুপ, ওয়ালটন, আকিজ রিসোর্সেস ও এসিআইসহ দুই ডজনের বেশি বড় দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেছে বিএসইসি। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সরাসরি তালিকাভুক্তি বা হাইব্রিড ব্যবস্থায় বাজারে আসার আগ্রহও জানিয়েছে।

বাজারের অবকাঠামোতেও পরিবর্তন আনছে কমিশন।

ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের ব্যাক অফিস সফটওয়্যার সমন্বিত ব্যবস্থায় আনা হবে। রিয়েল-টাইম সংযোগের মাধ্যমে ব্রোকারদের হিসাব ও ব্যাংক স্থিতি দেখার সক্ষমতা তৈরি করতে চায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা। কাগজের স্লিপের পরিবর্তে স্বয়ংক্রিয় অর্ডার ব্যবস্থাপনা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।

নজরদারিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের পাশাপাশি বন্ড, ডেরিভেটিভস ও মিউচুয়াল ফান্ড বাজার সম্প্রসারণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগও রয়েছে।

পেনশন, গ্র্যাচুইটি ও বিমা খাতের দীর্ঘমেয়াদি অর্থের একটি অংশ করপোরেট বন্ড ও শেয়ারবাজারে আনার নীতিগত সুযোগও ভবিষ্যতে তৈরি হতে পারে বলে জানিয়েছেন বিএসইসি চেয়ারম্যান।

সব মিলিয়ে সরকারের পরিকল্পনাটি পুঁজিবাজারের সূচক বাড়ানো বা নতুন কয়েকটি আইপিও আনার চেয়ে অনেক বড়।

সরকার চাইছে দেশের অর্থ সংগ্রহের ঠিকানা বদলাতে।

ব্যবসার অর্থ শুধু ব্যাংক থেকে নয়—শেয়ার ও বন্ড বাজার থেকে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের অর্থ শুধু সরকারের কোষাগার থেকে নয়—বাজার থেকে। বড় অবকাঠামোর অর্থ শুধু বাজেট বা বিদেশি ঋণ থেকে নয়—সম্পদের ভবিষ্যৎ আয় থেকেও। আর বৈদেশিক অর্থ শুধু আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক বা এডিবি থেকে নয়—আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজার থেকেও।

একদিকে নিউইয়র্কের ডলার বন্ড, পাণ্ডা ও সামুরাই বন্ড। অন্যদিকে পদ্মা-যমুনার আয় সিকিউরিটাইজেশন। দেশের বাজারে তিন মাসে আইপিও, সরাসরি তালিকাভুক্তি, হাইব্রিড পদ্ধতি এবং বড় বহুজাতিক কোম্পানিকে আনার চেষ্টা।

এই পুরো পরিকল্পনার কেন্দ্রে রাখা হয়েছে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে।

আর তাই অর্থমন্ত্রীর আগামী এক বছরের ঘোষণার পরীক্ষাটিও শুধু শেয়ারদর বা সূচকে হবে না।

বাজারটি সত্যিই বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় অঙ্কের মূলধন জোগানোর জায়গা হয়ে উঠতে পারে কি না—পরিবর্তনের আসল হিসাব হবে সেখানে।