ছবি- অর্থমন্ত্রনালয়
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে উত্থান-পতনের বড় ধাক্কা শেষ পর্যন্ত এসে লাগে সাধারণ বিনিয়োগকারীর পুঁজিতে। কারণ বাজারটি এখনো অতিমাত্রায় ব্যক্তি বা খুচরা বিনিয়োগকারীনির্ভর। এই কাঠামো বদলে বড় ও পেশাদার প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে চায় সরকার। একই সঙ্গে শেয়ারবাজারের কাগজনির্ভর প্রক্রিয়া তুলে দিয়ে তালিকাভুক্তির আবেদন থেকে অনুমোদন ও সিদ্ধান্ত—সবকিছু অনলাইনে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) সুবর্ণজয়ন্তী ও প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে সরকারের এই অবস্থান তুলে ধরেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে খুচরা বিনিয়োগকারীনির্ভর অবস্থা থেকে প্রতিষ্ঠাননির্ভর বাজারে নিয়ে যেতে আইসিবিকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে হবে।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল দেশের শেয়ারবাজারের দীর্ঘদিনের একটি কাঠামোগত দুর্বলতা। তিনি বলেন, বিশ্বের পুঁজিবাজারগুলো প্রধানত প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের দ্বারা পরিচালিত হলেও বাংলাদেশের বাজার দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত খুচরা বিনিয়োগকারীনির্ভর।
প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী বলতে সাধারণত আইসিবি, মিউচুয়াল ফান্ড, মার্চেন্ট ব্যাংক, বিমা কোম্পানি, পেনশন বা প্রভিডেন্ট ফান্ড এবং অন্যান্য বড় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানকে বোঝানো হয়। ব্যক্তি বিনিয়োগকারীর তুলনায় এসব প্রতিষ্ঠান সাধারণত গবেষণা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ভিত্তিতে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করে।
ফলে সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বাজারে শুধু বিনিয়োগকারীর ধরনই বদলাবে না; আইসিবির ভূমিকাও বদলাতে হবে।
অর্থমন্ত্রী প্রতিষ্ঠানটিকে তার ‘ঐতিহ্যগত ধারা’ থেকে বেরিয়ে সম্পূর্ণ বাজারভিত্তিক, প্রতিযোগিতামূলক ও পেশাদার প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আইসিবি প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ মানুষের সঞ্চয়কে পুঁজিবাজারের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে বিনিয়োগে নিয়ে আসা।
এখন সেই প্রতিষ্ঠানকেই বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের ভিত শক্ত করার দায়িত্ব নিতে বলছে সরকার।
শুধু বিনিয়োগকারীর কাঠামো নয়, পুঁজিবাজার পরিচালনার পদ্ধতিতেও বড় পরিবর্তনের কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), স্টক এক্সচেঞ্জ, ব্রোকারেজ হাউস ও আইসিবিসহ বাজারের প্রতিটি স্তরে শতভাগ স্বয়ংক্রিয় ও ডিজিটাল ব্যবস্থা চালুর কাজ শুরুর কথা জানিয়েছেন তিনি।
অর্থমন্ত্রীর ভাষায় নীতি হবে—‘নো পেপার ট্রানজ্যাকশন’। অর্থাৎ তালিকাভুক্তির আবেদন, বিভিন্ন অনুমতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া অনলাইনে সম্পন্ন করার লক্ষ্য সরকারের।
একজন বিনিয়োগকারীর কাছে এর গুরুত্ব প্রযুক্তির চেয়েও বেশি। তালিকাভুক্তি বা অনুমোদনের প্রক্রিয়া পুরোপুরি ডিজিটাল হলে কোন আবেদন কখন জমা পড়েছে, কত দিন কোথায় আটকে ছিল এবং কখন সিদ্ধান্ত হয়েছে—এসবের ডিজিটাল রেকর্ড তৈরির সুযোগ থাকে। তবে এই ব্যবস্থা কত দিনের মধ্যে পুরোপুরি কার্যকর হবে, তার নির্দিষ্ট সময়সীমা জানানো হয়নি।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীনতা নিয়েও কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী। তাঁর দাবি, অর্থনৈতিক সংস্কারের অংশ হিসেবে বিএসইসিসহ আর্থিক খাতের শীর্ষ পদগুলোতে রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়া নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ না দেওয়াকে সরকারের নীতি হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশি মূলধন আনার পরিকল্পনার কথাও অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। তিনি জানান, সম্প্রতি নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিশ্বের ১৫টি বড় প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বৈঠক হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত নেটওয়ার্ক প্রায় ৩৬ ট্রিলিয়ন ডলারের বলে উল্লেখ করেন তিনি।
অর্থমন্ত্রীর দাবি, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের পুঁজিবাজার ও অর্থনৈতিক সংস্কারে আস্থা প্রকাশ করেছেন। বেসরকারি তহবিল, জলবায়ু অর্থায়ন এবং ডেরিভেটিভস পণ্যের মাধ্যমে বৈশ্বিক মূলধন বাংলাদেশে আনার পরিবেশ তৈরির কথাও বলেন তিনি।
অর্থমন্ত্রী দেশীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রচলিত ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের বাইরে গিয়ে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারের চর্চায় অভ্যস্ত হওয়ার আহ্বান জানান। বেসরকারি তহবিল, জলবায়ু অর্থায়ন ও নতুন ধরনের আর্থিক পণ্য ব্যবহার করে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, একদিকে আইসিবিকে বাজারভিত্তিক ও পেশাদার হতে হবে, অন্যদিকে পুরো বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়াতে ভূমিকা রাখতে হবে।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান মাসুদ খান, অর্থ বিভাগের সচিব ড. মো. খায়রুজ্জামান মজুমদার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক এবং আইসিবির চেয়ারম্যান আবু আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নিরঞ্জন চন্দ্র দেবনাথ।















