ডিএসজে কোলাজ
বেক্সিমকো গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিপুল ঋণ খেলাপি হলেও বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস নিজে খেলাপি প্রতিষ্ঠান নয়। এই অবস্থায় কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের প্রস্তাবে অনাপত্তি দিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। প্রস্তাবিত পর্ষদে সালমান এফ রহমান থাকছেন না; তবে উদ্যোক্তাদের প্রতিনিধিত্ব করবেন এ এস এফ রহমান, ওসমান কায়সার চৌধুরী ও ইকবাল আহমেদ।
ফলে গ্রুপের ঋণখেলাপি অবস্থার কারণে তাঁদের বেক্সিমকো ফার্মার পরিচালক হতে আইনগত বাধা আছে কি না—সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) বিএসইসির ১০১৩তম কমিশন সভায় হাইকোর্টের নির্দেশনা ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থসহ সার্বিক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে পর্ষদ পুনর্গঠনের প্রস্তাবে অনাপত্তি দেওয়া হয়। প্রস্তাবিত নয় সদস্যের পর্ষদে তিন উদ্যোক্তা পরিচালক, নতুন একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক, আইএফআইসি ব্যাংকের একজন প্রতিনিধি এবং চারজন স্বতন্ত্র পরিচালক থাকবেন। চার স্বতন্ত্র পরিচালকের তিনজন নতুন করে নিয়োগ পাবেন এবং তাঁদের মধ্যে অন্তত একজন নারী থাকবেন।
আইন পর্যালোচনায় দেখা যায়, গ্রুপের কোনো কোম্পানি ঋণখেলাপি হলেই একই গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেক উদ্যোক্তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্য একটি তালিকাভুক্ত কোম্পানির পরিচালক হওয়ার অযোগ্য হন—এমন সাধারণ বিধান নেই। বিএসইসির করপোরেট গভর্ন্যান্স কোডে স্বতন্ত্র পরিচালকের ক্ষেত্রে ঋণখেলাপিসংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট যোগ্যতার শর্ত রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ সিআইবি প্রতিবেদনে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ, অগ্রিম বা দায় পরিশোধে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তি স্বতন্ত্র পরিচালক হওয়ার যোগ্য নন। তবে বেক্সিমকো ফার্মার প্রস্তাবিত এ এস এফ রহমান, ওসমান কায়সার চৌধুরী ও ইকবাল আহমেদকে স্বতন্ত্র নয়, উদ্যোক্তা পরিচালক হিসেবে রাখা হচ্ছে।
ব্যাংক কোম্পানি আইনেও ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির জন্য কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। ইচ্ছাকৃত খেলাপির তালিকা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পরও বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত সর্বোচ্চ পাঁচ বছর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হতে পারেন না। কিন্তু বেক্সিমকো ফার্মা ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান নয়। ফলে ব্যাংক কোম্পানি আইনের এই বিধিনিষেধ সরাসরি কোম্পানিটির উদ্যোক্তা পরিচালক পদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
বিএসইসির মুখপাত্রও ডিএসজেকে জানিয়েছেন, ব্যাংক কোম্পানি ছাড়া কোনো খেলাপি কোম্পানির উদ্যোক্তাদের তালিকাভুক্ত কোম্পানির পরিচালক হতে বাধা নেই।
অর্থাৎ বেক্সিমকো গ্রুপের অন্য প্রতিষ্ঠান ঋণখেলাপি হওয়ার কারণে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেক্সিমকো ফার্মার পরিচালক হওয়ার অযোগ্য হবেন না। তবে কোনো ব্যক্তির নিজের ঋণখেলাপি অবস্থা, আদালতের আদেশ কিংবা অন্য কোনো প্রযোজ্য আইনি নিষেধাজ্ঞা থাকলে সেটি আলাদাভাবে বিবেচ্য হবে।
পর্ষদ পুনর্গঠনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সালমান এফ রহমানের বাদ পড়া। তাঁর ভাই এ এস এফ রহমান প্রস্তাবিত পর্ষদে থাকলেও সালমান এফ রহমান ও তাঁর ছেলে আহমেদ শায়ান ফজলুর রহমানকে ২০২৫ সালে পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্ট কার্যক্রম থেকে আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ করে বিএসইসি। ‘আইএফআইসি আমার বন্ড’ নামে পরিচিত আইএফআইসি গ্যারান্টিড শ্রীপুর টাউনশিপ গ্রিন জিরো কুপন বন্ডসংক্রান্ত অনিয়মের ঘটনায় সালমানকে ১০০ কোটি এবং শায়ানকে ৫০ কোটি টাকা জরিমানাও করা হয়।
সালমানের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা শুধু শেয়ার লেনদেনে সীমাবদ্ধ নয়। বিএসইসির আদেশে তাঁকে পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্ট কার্যক্রম থেকে আজীবনের জন্য অযোগ্য করার পাশাপাশি তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে পদ ধারণেরও অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে তাঁর ভাই এ এস এফ রহমানের প্রস্তাবিত পর্ষদে থাকা এবং সালমানের বাদ পড়া দুটি পৃথক আইনগত অবস্থান।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আদালতে দেওয়া প্রতিবেদনে গ্রুপটির ৭৮ প্রতিষ্ঠানের ২০২৪ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত মোট ঋণ ও দায় ছিল ৫০ হাজার ৯৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২৫ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা ছিল শ্রেণিকৃত। তবে এই পরিসংখ্যান দিয়ে বেক্সিমকো ফার্মাকে ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না; কোম্পানিটির নিজস্ব ঋণ পরিস্থিতি গ্রুপের সামগ্রিক হিসাব থেকে আলাদা।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে হাইকোর্ট প্রথমে বেক্সিমকো গ্রুপের প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় রিসিভার নিয়োগ ও সম্পদ সংযুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। পরে বেক্সিমকো ফার্মাকে স্বাধীনভাবে পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের মার্চে গ্রুপের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও রিসিভার রাখার আগের নির্দেশ বাতিল করেন হাইকোর্ট; তবে আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠান পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নজরদারি অব্যাহত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।
বেক্সিমকো ফার্মার পর্ষদ নিয়ে দুটি রিটও হাইকোর্টে বিচারাধীন। কোম্পানিটি জানিয়েছে, পর্ষদ পরিবর্তনের প্রস্তাব ওই মামলা নিষ্পত্তির আলোচনার অংশ। মঙ্গলবার বিএসইসি জানিয়েছে, কোম্পানির মামলা প্রত্যাহার সাপেক্ষে বিএসইসির এ সংক্রান্ত আগের দুটি নির্দেশনা প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে।
ফলে গ্রুপের বিপুল খেলাপি ঋণ বেক্সিমকো ফার্মার পর্ষদ পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হলেও সেটিই উদ্যোক্তা পরিচালকদের অযোগ্য করার আইনি ভিত্তি নয়। এখানে গ্রুপের খেলাপি অবস্থা, বেক্সিমকো ফার্মার নিজস্ব ঋণস্থিতি এবং প্রত্যেক পরিচালকের ব্যক্তিগত আইনগত যোগ্যতা—তিনটি বিষয় আলাদাভাবে বিবেচনা করাই গুরুত্বপূর্ণ।















