ছবি- ডিএসই
ব্রোকারেজ হাউসে বিনিয়োগকারীর অর্থের নিরাপত্তায় বিদ্যমান নজরদারির দুর্বলতা কাটাতে এবার রিয়েল-টাইম তদারকির দিকে যাচ্ছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা। ট্রেকহোল্ডার প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাক-অফিস ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী ও সুরক্ষিত করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও কনসলিডেটেড কাস্টমারস অ্যাকাউন্টে (সিসিএ) গ্রাহকের অর্থের অবস্থান নিয়মিত পর্যবেক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
একাধিক ব্রোকারেজ হাউসে হাজারো বিনিয়োগকারীর অর্থ আটকে যাওয়ার পর সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) এমন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা শক্তিশালী করার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
মশিহর সিকিউরিটিজ লিমিটেডের ১৫ বিনিয়োগকারীর হাতে চেক তুলে দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অর্থ পরিশোধ শুরু করেছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। প্রতিষ্ঠানটির মোট ৯ হাজার ৩৮৬ বিনিয়োগকারীর যাচাইকৃত দাবির বিপরীতে ইনভেস্টর প্রটেকশন ফান্ড (আইপিএফ) থেকে ৪২ কোটি ৭৩ লাখ টাকা পরিশোধ করা হবে। একজন বিনিয়োগকারী সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত পাবেন।
অর্থ ফেরতের অনুষ্ঠানে বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা ঠেকাতে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদারের কথা জানান। তিনি বলেন, ট্রেকহোল্ডার প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাক-অফিস ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী, সুরক্ষিত এবং রিয়েল-টাইম মনিটরিংয়ের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও সিসি অ্যাকাউন্টে বিনিয়োগকারীদের অর্থের অবস্থান নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। তাঁর ভাষ্য, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার যুগে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির বিকল্প নেই।
এই উদ্যোগ কার্যকর হলে ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব হিসাবের পাশাপাশি গ্রাহকের অর্থসংক্রান্ত তথ্য আরও দ্রুত পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হবে। ফলে গ্রাহকের হিসাবে যে পরিমাণ অর্থ থাকার কথা এবং সংশ্লিষ্ট হিসাবে বাস্তবে কত অর্থ রয়েছে—এ ধরনের অসামঞ্জস্য দ্রুত শনাক্ত করার সক্ষমতা বাড়তে পারে।
তবে কীভাবে রিয়েল-টাইম নজরদারি চালানো হবে, সব ট্রেকহোল্ডারকে কবে এর আওতায় আনা হবে এবং অস্বাভাবিকতা শনাক্ত হলে কী ধরনের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে—সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি বিএসইসি চেয়ারম্যান।
মাসুদ খান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে যে সমস্যার কারণে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতির মুখে পড়েছেন, তার সমাধানের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সব যাচাইকৃত বিনিয়োগকারীর প্রাপ্য অর্থ পরিশোধ সম্ভব হবে বলে তিনি আশা করেন।
ব্রোকারেজ হাউসে গ্রাহকের অর্থের নিরাপত্তার প্রশ্নটি নতুন নয়। বিনিয়োগকারীর অর্থ ও ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব অর্থ আলাদা রাখার ব্যবস্থা থাকলেও একাধিক প্রতিষ্ঠানের গ্রাহক দীর্ঘদিন নিজেদের পাওনা ফেরত পাননি। এখন সেই ক্ষতি পূরণে ইনভেস্টর প্রটেকশন ফান্ড ব্যবহার করতে হচ্ছে।
মশিহর সিকিউরিটিজের ক্ষেত্রে যেসব বিনিয়োগকারী ২০২৬ সালের ২১ এপ্রিলের মধ্যে ডিএসইতে অভিযোগ করেছেন এবং যাচাইয়ে যাদের দাবি গ্রহণযোগ্য হয়েছে, তাদের অর্থ পরিশোধ করা হচ্ছে। ইনভেস্টরস প্রটেকশন ফান্ড রেগুলেশন, ২০১৪ অনুযায়ী একজন বিনিয়োগকারী আইপিএফ থেকে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত পাবেন।
মশিহরের ৯ হাজার ৩৮৬ বিনিয়োগকারীর বিপরীতে ৪২ কোটি ৭৩ লাখ টাকা হিসাবে মাথাপিছু গড় পরিশোধের অঙ্ক প্রায় ৪৫ হাজার ৫২০ টাকা।
কারও পাওনা ৫ লাখ টাকার বেশি হলে আইপিএফ থেকে পুরো অর্থ ফেরত পাওয়ার সুযোগ নেই। ডিএসই চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, যাদের সম্পূর্ণ পাওনা এই পর্যায়ে দেওয়া সম্ভব হবে না, তাদের অবশিষ্ট অর্থ আইনানুগ প্রক্রিয়ায় দ্রুত পরিশোধের জন্য ডিএসই সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে।
ডিএসই জানিয়েছে, পর্যায়ক্রমে ১৭ হাজার ৩০০ জনের বেশি যাচাইকৃত ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীকে ইনভেস্টর প্রটেকশন ফান্ড থেকে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত দেওয়া হবে।
মশিহর ছাড়াও এই প্রক্রিয়ার আওতায় রয়েছে ব্যাংকো সিকিউরিটিজ লিমিটেড, ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ লিমিটেড, তামহা সিকিউরিটিজ লিমিটেড এবং শাহ মোহাম্মদ সগীর অ্যান্ড কো. লিমিটেড। এসব প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগকারীদের যাচাইকৃত দাবিও পর্যায়ক্রমে পরিশোধ করা হবে।
এত বিপুলসংখ্যক বিনিয়োগকারীর অর্থ ফেরতের প্রয়োজনীয়তা বিদ্যমান নজরদারি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন সামনে আনছে। কারণ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর বিনিয়োগকারীকে সুরক্ষা তহবিল থেকে অর্থ ফেরত দেওয়া এক ধরনের প্রতিকার; কিন্তু গ্রাহকের অর্থে অনিয়ম বা ঘাটতি তৈরি হওয়ার আগেই তা শনাক্ত করা নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার প্রতিরোধমূলক অংশ।
বিএসইসি কমিশনার নাফিজ আল তারিক বলেন, বর্তমান কমিশনের সংস্কার, সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রমে বিনিয়োগকারীর স্বার্থ সুরক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কমিশনার হোসেইন শাদাতও অতীতের ঘটনার প্রতিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
ডিএসই চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের যাচাইকৃত পাওনা পরিশোধ শুরু হওয়া দেশের পুঁজিবাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগকারীর আস্থা ও স্বার্থ সুরক্ষাকে তিনি একটি সুশৃঙ্খল ও টেকসই পুঁজিবাজারের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।
ইনভেস্টর প্রটেকশন ফান্ডের চেয়ারম্যান নাসরিন বেগম বলেন, বিনিয়োগকারীর স্বার্থ সুরক্ষা এবং পুঁজিবাজারে আস্থা ও বিশ্বাস বজায় রাখা তাদের অন্যতম দায়িত্ব।
ডিএসই জানিয়েছে, অর্থ ফেরতের অগ্রগতি ও সময়সূচি সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীদের নিয়মিত এসএমএসের মাধ্যমে জানানো হবে।
মশিহর সিকিউরিটিজের বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরতের মধ্য দিয়ে পুরোনো ক্ষতি মেটানোর প্রক্রিয়া শুরু হলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্য বড় পরীক্ষা সামনে। হাজারো বিনিয়োগকারীর অর্থ আটকে যাওয়ার পর আইপিএফ থেকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পরিবর্তে ব্রোকারেজ হাউসে গ্রাহকের অর্থের ঘাটতি বা অস্বাভাবিক স্থানান্তর ঘটার সময়ই তা শনাক্ত করতে হবে। রিয়েল-টাইম নজরদারির উদ্যোগ কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তার ওপরই সেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করবে।















