ঢাকা,  শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, কার্তিক ৭ ১৪৩৩

সিটি ইন্স্যুরেন্সে কারসাজি, আনোয়ার গ্রুপ ও রহস্যময় দুই প্রতিষ্ঠান

শেয়ারদর বেড়েছে ৩৬৪ শতাংশ; নিষিদ্ধ সময়ে লেনদেন, অর্ধেক কেনাবেচা পাঁচ পক্ষের,  সিরিজ ট্রেডিং, স্বজনদের মধ্যে বিপরীতমুখী লেনদেন 

অন্দরমহল

আলতাফ মাসুদ

প্রকাশিত: ১১:৪৮,১৫ অক্টোবর ২০২৬

আপডেট: ২১:৫৫,১৯ অক্টোবর ২০২৬

সর্বশেষ

সিটি ইন্স্যুরেন্সে কারসাজি, আনোয়ার গ্রুপ ও রহস্যময় দুই প্রতিষ্ঠান

প্রতীকী ছবি (এআই দ্বারা তৈরী)

দেড় বছরেরও কম সময়ে সিটি ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারদর বেড়েছে প্রায় ৩৬৪ শতাংশ। ২৮ টাকা ১০ পয়সার শেয়ার পৌঁছেছে ১৩০ টাকার ঘরে। কিন্তু এই অস্বাভাবিক উত্থানের নেপথ্যে কোম্পানির মৌলভিত্তির উন্নতি নয়, উঠে এসেছে সংঘবদ্ধ কারসাজির নানা কৌশল।

ধারাবাহিক কেনাবেচা বা সিরিজ ট্রেডিং, স্বজনদের হিসাবে বিপরীতমুখী লেনদেন, প্রকৃত মালিকানা অপরিবর্তিত রেখে শেয়ার হাতবদল এবং কয়েক সেকেন্ডে বিপুল শেয়ার কিনে দর বাড়ানোর তথ্য পেয়েছেন তদন্তকারীরা। এসব কর্মকাণ্ডে পুঁজিবাজারের একাধিক আইন ও বিধি লঙ্ঘনের চিত্র উঠে এসেছে।

এই দরবৃদ্ধির মধ্যেই বড় অঙ্কের কেনাবেচায় জড়িয়েছে আনোয়ার গ্রুপসংশ্লিষ্ট দুই তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান—আনোয়ার গ্যালভানাইজিং ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্স। প্রথমটি নিষিদ্ধ সময়ে শেয়ার লেনদেন করেছে, দ্বিতীয়টি পূর্বঘোষণা ছাড়াই বিপুল শেয়ার কিনেছে ও বিক্রি করেছে। 

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তদন্তে এসব তথ্য উঠে এসেছে। অন্যদিকে, কারসাজিতে জড়িত সন্দেহভাজন দুই প্রতিষ্ঠানের বিও হিসাবে দেওয়া ঠিকানায় কোনো কার্যালয় খুঁজে পায়নি ঢাকা স্ট্রিট জার্নাল।

ডিএসইর তদন্তকারীরা ২০২৫ সালের ৪ মে থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত সিটি ইন্স্যুরেন্সের লেনদেন পরীক্ষা করেছেন। ওই সময়ে শেয়ারটির দর বেড়েছে ২১০ দশমিক ৬৮ শতাংশ। ৩০ ডিসেম্বর সমাপনী দর ছিল ৮৭ টাকা ৩০ পয়সা। এরপরও উত্থান থামেনি। ২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর দর দাঁড়ায় ১৩০ টাকা ২০ পয়সায়। ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিলের ২৮ টাকা ১০ পয়সার তুলনায় শেয়ারপ্রতি দর বেড়েছে ১০২ টাকা ১০ পয়সা।

আইন ভেঙেছে আনোয়ার গ্রুপের দুই প্রতিষ্ঠান

সিটি ইন্স্যুরেন্সের শেয়ার নিয়ে ডিএসইর তদন্তে আনোয়ার গ্রুপসংশ্লিষ্ট দুই প্রতিষ্ঠানের বিধিলঙ্ঘনের তথ্য বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এর মধ্যে আনোয়ার গ্যালভানাইজিংয়ের বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ সময়ে লেনদেন এবং বাংলাদেশ ফাইন্যান্সের বিরুদ্ধে পূর্বঘোষণা ছাড়া শেয়ার কেনাবেচার অভিযোগ রয়েছে।

দুই প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র আনোয়ার পরিবারের সদস্য হোসেইন মেহমুদ। প্রয়াত শিল্পোদ্যোক্তা আনোয়ার হোসেইনের ছেলে হোসেইন মেহমুদ আনোয়ার গ্যালভানাইজিংয়ের পরিচালক এবং সিটি ইন্স্যুরেন্সের উদ্যোক্তা শেয়ারহোল্ডার। ব্যাংক এশিয়া সিকিউরিটিজে পরিচালিত আনোয়ার গ্যালভানাইজিংয়ের বিও হিসাবের পরিচালক ও অনুমোদিত স্বাক্ষরকারীও তিনি।

সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২ নভেম্বর আনোয়ার গ্যালভানাইজিংয়ের হিসাব থেকে ১৯ হাজার ৭৮২টি, ৪ নভেম্বর ৩০ হাজার এবং ৬ নভেম্বর ২ লাখ ৬৪ হাজার ৩১০টি শেয়ার বিক্রি বা স্থানান্তর করা হয়। ১১ নভেম্বর হিসাবে যুক্ত হয় ২ লাখ ৪৩ হাজার শেয়ার। তদন্তকালে মোট ২ লাখ ৪৩ হাজার শেয়ার যুক্ত হয়েছে এবং বের হয়েছে ৩ লাখ ৬৪ হাজার ৯২টি।

এসব লেনদেনের সময় সিটি ইন্স্যুরেন্সের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য শেয়ার কেনাবেচায় নিষেধাজ্ঞা কার্যকর ছিল। কোম্পানিটির ২০২৫ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী অনুমোদনের আগে ১ নভেম্বর থেকে নিষিদ্ধ সময় শুরু হয়। ডিএসইর তদন্তে এসব লেনদেনে বিএসইসির সুবিধাভোগী ব্যবসা নিষিদ্ধকরণ বিধিমালা, ২০২২-এর বিধি ৫ লঙ্ঘনের তথ্য পাওয়া গেছে। 

পূর্বঘোষণা না দেওয়ায় ২০১০ সালের ১৪ জুলাইয়ের প্রজ্ঞাপন লঙ্ঘনের অভিযোগও রয়েছে। ডিসেম্বর শেষে আনোয়ার গ্যালভানাইজিংয়ের হিসাবে সিটি ইন্স্যুরেন্সের ৪৯ লাখ ৬৭ হাজার ৬৯৮টি শেয়ার ছিল।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ ফাইন্যান্স সহযোগী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ফাইন্যান্স সিকিউরিটিজের মাধ্যমে ২০ লাখ ৩১ হাজার ৮০৫টি শেয়ার কিনেছে এবং ২১ লাখ ৪৩ হাজার ৮৫টি বিক্রি করেছে। মোট কেনাবেচা ৪১ লাখ ৭৪ হাজার ৮৯০টি শেয়ার, যা তদন্তকালীন লেনদেনের ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ। শীর্ষ ক্রেতাদের তালিকায় প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান চতুর্থ।

বাংলাদেশ ফাইন্যান্সের উদ্যোক্তা শেয়ারহোল্ডারও হোসেইন মেহমুদ। প্রতিষ্ঠানটিতে তাঁর নিজ নামে ৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। অথচ এত বড় অঙ্কের লেনদেনের আগে বাংলাদেশ ফাইন্যান্স প্রয়োজনীয় ঘোষণা দেয়নি বলে।

অবশ্য আনোয়ার গ্যালভানাইজিংয়ের বিরুদ্ধে পূর্বঘোষণা ছাড়া শেয়ার বিক্রির অভিযোগ নতুন নয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সের শেয়ারদর কারসাজিসংক্রান্ত আগের এক ঘটনায় বিএসইসি আনোয়ার গ্যালভানাইজিংকে ৭ কোটি ১০ লাখ এবং সিটি জেনারেল ইন্স্যুরেন্সকে ৮৫ লাখ টাকা জরিমানা করেছিল। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সের শেয়ার বিক্রির আগে করপোরেট ঘোষণা না দেওয়ায় এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

ওই তদন্তে ২০২০ সালের আগস্ট থেকে ২০২১ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশ ফাইন্যান্সের শেয়ারে সমন্বিত লেনদেনের মাধ্যমে কৃত্রিম সক্রিয়তা সৃষ্টি ও দর কারসাজির তথ্যও উঠে এসেছিল। এবার সিটি ইন্স্যুরেন্সের তদন্তেও আনোয়ার গ্যালভানাইজিংয়ের বিধিলঙ্ঘন ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সের অঘোষিত লেনদেন সামনে এসেছে।

অর্ধেক লেনদেন পাঁচ পক্ষের

সিটি ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারদর অস্বাভাবিকভাবে বাড়ার সময় মোট কেনাবেচার প্রায় অর্ধেকই কেন্দ্রীভূত ছিল পাঁচ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হিসাবে। বিপুল লেনদেনের আড়ালে বাজারে প্রকৃত চাহিদার পরিবর্তে কয়েকটি পক্ষের প্রভাব বিস্তারের তথ্য পেয়েছেন তদন্তকারীরা।

সবচেয়ে বেশি লেনদেন করেছে মো. ইদ্রিস আলীর প্রতিনিধিত্বাধীন সিনিয়র ট্রেডিং। একাধিক ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৯৯ লাখ ৫৭ হাজার ৮৮১টি শেয়ার কিনেছে এবং ৭০ লাখ ৭০ হাজার ২২৫টি বিক্রি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। মোট কেনাবেচা ১ কোটি ৭০ লাখ ২৮ হাজার ১০৬টি শেয়ার, যা তদন্তকালীন লেনদেনের ২৩ দশমিক ৮৯ শতাংশ।

মনজুরুল হকের প্রতিনিধিত্বাধীন নিলফা ট্রেডিং কিনেছে ২৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫৭৫টি এবং বিক্রি করেছে ২০ লাখ ৪৬ হাজার ৭৬৩টি শেয়ার। মোট লেনদেন ৪৬ লাখ ৯১ হাজার ৩৩৮টি।

আরেক বড় লেনদেনকারী আতাহার ইশরাক শাবাব চৌধুরী। তাঁর একাধিক হিসাবে ৫০ লাখ ৩ হাজার ৩৫২টি শেয়ার কেনা এবং ৪০ লাখ ১৬ হাজার ২২৯টি বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে। মোট কেনাবেচা ৯০ লাখ ১৯ হাজার ৫৮১টি শেয়ার।

এই তিন পক্ষের সম্মিলিত লেনদেন ৩ কোটি ৭ লাখ ৩৯ হাজার ২৫টি শেয়ার। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সের লেনদেন যোগ করলে চার পক্ষের মোট কেনাবেচা দাঁড়ায় ৩ কোটি ৪৯ লাখ ১৩ হাজার ৯১৫টি শেয়ার।

ডিএসইর তদন্তে সিনিয়র ট্রেডিং, নিলফা ট্রেডিং ও আতাহার ইশরাক শাবাব চৌধুরীর বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ক্রয়ের মাধ্যমে দর প্রভাবিত করার অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের লেনদেনে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অধ্যাদেশ, ১৯৬৯-এর ১৭(ই)(৫) ধারার লঙ্ঘন হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।

রহস্যময় দুই প্রতিষ্ঠান, ঠিকানায় নেই কার্যালয়

কারসাজির তদন্তে সবচেয়ে রহস্যজনক দুই প্রতিষ্ঠান সিনিয়র ট্রেডিং ও নিলফা ট্রেডিং। সিটি ইন্স্যুরেন্সের মোট লেনদেনের প্রায় ৩০ শতাংশ হয়েছে তাদের মাধ্যমে। অথচ বিও হিসাবে দেওয়া ঠিকানায় সরেজমিন অনুসন্ধান চালিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় খুঁজে পায়নি ঢাকা স্ট্রিট জার্নাল। যোগাযোগের জন্য দেওয়া দুটি মুঠোফোন নম্বরও বন্ধ পাওয়া গেছে।

শুধু লেনদেনের পরিমাণ নয়, শেয়ার কেনার সময় ও কৌশলও ছিল অস্বাভাবিক।

২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর নির্দিষ্ট সময়ে বাজারে লেনদেন হওয়া ৭৩ হাজার ৪৮৭টি শেয়ারের মধ্যে ৭১ হাজার ৫৮৬টিই কিনেছে সিনিয়র ট্রেডিং। অর্থাৎ প্রায় ৯৭ শতাংশ। একই সময়ে দর ৭১ টাকা ১০ পয়সা থেকে বেড়ে ৭২ টাকা ৮০ পয়সায় ওঠে।

১ ডিসেম্বর মাত্র ৪৪ সেকেন্ডে বাজারে লেনদেন হওয়া সব ৮ হাজার ৭৬৫টি শেয়ার কিনে নেয় প্রতিষ্ঠানটি। দর বেড়ে যায় ৭৬ টাকা ৭০ পয়সা থেকে ৭৭ টাকা ৯০ পয়সায়। আবার ৩০ ডিসেম্বর দুই মিনিটের কিছু বেশি সময়ে লেনদেন হওয়া ৪৩ হাজার ৫৮৭টি শেয়ারের মধ্যে ৪৩ হাজার ৮২টি কিনেছে সিনিয়র ট্রেডিং। ওই সময়ে দর ৮৩ টাকা ৭০ পয়সা থেকে ৮৪ টাকা ৯০ পয়সায় পৌঁছায়।

ডিএসইর হিসাবে, তদন্তকালে সিনিয়র ট্রেডিং ১ কোটি ৯৭ লাখ টাকা মুনাফা তুলে নেয়। আর ডিসেম্বর শেষে প্রতিষ্ঠানটির পোর্টফোলিওতে অবিক্রীত শেয়ারে মুনাফা ছিল আরও ১৬ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।

নিলফা ট্রেডিংয়ের লেনদেনেও একই কৌশল পাওয়া গেছে। ২০২৫ সালের ৬ অক্টোবর মাত্র দুই মিনিট ৫২ সেকেন্ডে বাজারে লেনদেন হওয়া সব ৩০ হাজার ৫৯৬টি শেয়ার কিনেছে প্রতিষ্ঠানটি। এতে দর ৬৮ টাকা ৩০ পয়সা থেকে বেড়ে ৬৯ টাকা ১০ পয়সায় ওঠে।

২৯ অক্টোবর নির্দিষ্ট প্রায় ৫৭ মিনিটে লেনদেন হওয়া শেয়ারের ৯১ শতাংশের বেশি কিনেছে নিলফা ট্রেডিং। ডিসেম্বর শেষে প্রতিষ্ঠানটির পোর্টফোলিওতে অবিক্রীত শেয়ারে মুনাফা ছিল প্রায় ৮ কোটি টাকা।

ডিএসই এসব লেনদেনকে দর প্রভাবিত করার কার্যক্রম হিসেবে চিহ্নিত করেছে। দুই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অধ্যাদেশের ১৭(ই)(৫) ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে।

এত বিপুল শেয়ার কেনাবেচা করা প্রতিষ্ঠান দুটির কার্যালয় ও প্রতিনিধিদের সন্ধান না মেলায় তাদের প্রকৃত সুবিধাভোগী মালিক, লেনদেনের নির্দেশদাতা এবং অর্থের উৎস ঘিরে নতুন রহস্য তৈরি হয়েছে।

সিরিজ ট্রেডিং, স্বজনদের হিসাবে বিপরীত লেনদেন

সিটি ইন্স্যুরেন্সের কারসাজিতে শুধু বিপুল ক্রয়াদেশ নয়, একই ব্যক্তির একাধিক হিসাব এবং স্বজনদের মধ্যে বিপরীতমুখী লেনদেনের তথ্যও পাওয়া গেছে। কোথাও শেয়ার হাতবদল হয়েছে, কিন্তু প্রকৃত মালিক বদলায়নি। কোথাও একই ব্রোকারেজের একটি ওয়ার্কস্টেশন থেকে দুই গ্রাহকের বিপরীত আদেশ কার্যকর হয়েছে।

তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ নাম কায়সার কাফি রেমন। তাঁর পেশাগত পরিচিতিতে আনোয়ার গ্রুপের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। ডিএসই তাঁর নিজের হিসাবের পাশাপাশি বোন ফারহানা আহমেদ ও ভগ্নিপতি এস এম তানভীর হাসানের লেনদেন পরীক্ষা করেছে।

২০২৫ সালের ১০ আগস্ট ও ২৬ অক্টোবর রেমন ও তাঁর স্বজনদের মধ্যে ২৪টি লেনদেনে ৯০ হাজার ৭৫০টি শেয়ার হাতবদল হয়। বিশেষ করে ২৬ অক্টোবর সকাল ১০টা ৪ মিনিট ৪৮ সেকেন্ডে রেমনের হিসাব থেকে তানভীর হাসানের হিসাবে ৭৩ টাকা ১০ পয়সা দরে পরপর একাধিক লেনদেন সম্পন্ন হয়।

নিজের তিনটি বিও হিসাবের মধ্যেও রেমন ১০ আগস্ট ও ২৩ সেপ্টেম্বর ২১টি লেনদেনে ৪১ হাজার ৯৯৮টি শেয়ার কেনাবেচা করেন। হিসাব বদলালেও প্রকৃত সুবিধাভোগী মালিকানা অপরিবর্তিত ছিল। ডিএসই এসব ঘটনায় সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অধ্যাদেশ, ১৯৬৯-এর ১৭(ই)(২) ও ১৭(ই)(৩) ধারার সম্ভাব্য লঙ্ঘন চিহ্নিত করেছে।

অন্যদিকে, আতাহার ইশরাক শাবাব চৌধুরী ১৩ অক্টোবর মাত্র ৪০ সেকেন্ডে লেনদেন হওয়া সব ২৭ হাজার ৩৬৫টি শেয়ার কিনেছেন। ৮ ও ১০ ডিসেম্বরও নির্দিষ্ট স্বল্প সময়ে বাজারে লেনদেন হওয়া শেয়ারের ৯৯ শতাংশের বেশি তাঁর হিসাবে কেনা হয়। এসব সময়ে শেয়ারদর বেড়েছে। তাঁর বিরুদ্ধেও ১৭(ই)(৫) ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে।

সিটি ইন্স্যুরেন্সের শেয়ার কারসাজিতে বড় ভূমিকা রাখা সিনিয়র ট্রেডিং ও নিলফা ট্রেডিংয়ের সঙ্গে আনোয়ার গ্রুপের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই বলে দাবি করেছেন আনোয়ার গ্যালভানাইজিংয়ের কোম্পানি সচিব তৌহিদুল ইসলাম। তবে সিটি ইন্স্যুরেন্সের শেয়ার কেনাবেচার আগে প্রয়োজনীয় করপোরেট ঘোষণা না দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সরাসরি কোনো জবাব দেননি।

ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের ভূমিকাও ডিএসইর তদন্তে উঠে এসেছে। ২৩ ডিসেম্বর এসবিএসি ব্যাংক ইনভেস্টমেন্টের দুই গ্রাহক মো. রাশেদ ও মো. জোবায়ের হোসেনের মধ্যে আটটি লেনদেনে ৪০ হাজার শেয়ার হাতবদল হয়। একই ট্রেডিং ওয়ার্কস্টেশন থেকে বিপরীতমুখী আদেশ কার্যকর করেন অনুমোদিত প্রতিনিধি শাজারাতুল মুনতাহা।

এসবিএসি ব্যাংক ইনভেস্টমেন্টের দাবি, অনভিজ্ঞতার কারণে পৃথক গ্রাহকের নির্দেশে লেনদেনগুলো হয়েছে; কারসাজির উদ্দেশ্য ছিল না। তবে সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য ডিএসইকে না জানানোয় প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধির বিরুদ্ধে বিধিলঙ্ঘনের পর্যবেক্ষণ রয়েছে।

ডিএসইর তদন্তে সব মিলিয়ে সিটি ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারদর বৃদ্ধির আড়ালে উঠে এসেছে কৃত্রিম চাহিদা সৃষ্টি, সংঘবদ্ধ লেনদেন, নিষিদ্ধ সময়ে শেয়ার কেনাবেচা এবং একই মালিকের বিভিন্ন হিসাবে শেয়ার হাতবদলের বিস্তৃত চিত্র। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আনোয়ার গ্রুপসংশ্লিষ্ট দুই প্রতিষ্ঠানের বিধিলঙ্ঘন এবং বিপুল লেনদেনকারী দুই রহস্যময় প্রতিষ্ঠানের ঠিকানায় কার্যালয় না পাওয়ার ঘটনা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবুল কালাম ঢাকা স্ট্রিট জার্নালকে বলেন, সিটি ইন্স্যুরেন্সের শেয়ার লেনদেন নিয়ে ইতিমধ্যে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সর্বশেষ