ঢাকা,  মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, কার্তিক ১২ ১৪৩৩

তিন মাসে মানুষের হাতে নগদ কমেছে ৩০ হাজার কোটি টাকা

টাকা-কড়ি

প্রকাশিত: ২২:১২,২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তিন মাসে মানুষের হাতে নগদ কমেছে ৩০ হাজার কোটি টাকা

প্রতীকী ছবি (এআই দ্বারা তৈরী)

মাত্র তিন মাসে মানুষের হাত থেকে প্রায় ৩০ হাজার ২৭৮ কোটি টাকা নগদ অর্থ সরে গেছে। মে মাস শেষে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে মানুষের হাতে নগদ অর্থের পরিমাণ রেকর্ড ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকায় উঠেছিল। আগস্ট শেষে তা নেমে এসেছে ৩ লাখ ১৯ হাজার ৯৬ কোটি ৪ লাখ টাকায়। অর্থাৎ মে মাসের হঠাৎ নগদ-উল্লম্ফনের পর টানা তিন মাস ধরে উল্টো পথে হাঁটছে মানুষের হাতে থাকা টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণে এই চিত্র পাওয়া গেছে। জুনে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থ কমে ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৩৭৫ কোটি ২ লাখ টাকায় নামে। জুলাইয়ে আরও কমে দাঁড়ায় ৩ লাখ ২৮ হাজার ৬৬৮ কোটি ২ লাখ এবং আগস্টে নেমে আসে ৩ লাখ ১৯ হাজার ৯৬ কোটি ৪ লাখ টাকায়। ফলে মে থেকে আগস্ট—তিন মাসে হ্রাসের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ২৭৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা।

শুধু আগস্টেই মানুষের হাতে নগদ অর্থ কমেছে ৯ হাজার ৫৭১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। জুলাইয়ের তুলনায় এই পতন প্রায় ২ দশমিক ৯১ শতাংশ। অর্থাৎ জুনে শুরু হওয়া নগদ অর্থ কমার ধারা টানা তৃতীয় মাসেও অব্যাহত রয়েছে।

ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থ বলতে সাধারণভাবে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে জনসাধারণের হাতে থাকা নোট ও কয়েনকে বোঝায়। ফলে এই অঙ্ক কমা মানেই পুরো অর্থ ব্যাংক আমানত হিসেবে ফিরে এসেছে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া যাবে না। তবে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে নগদ অর্থের চাহিদা কমার একটি স্পষ্ট চিত্র এতে পাওয়া যাচ্ছে।

বছরের প্রথম পাঁচ মাসে চিত্রটি ছিল বেশ অস্থির। জানুয়ারিতে মানুষের হাতে নগদ অর্থ ছিল ২ লাখ ৮২ হাজার ৬২৬ কোটি ৮ লাখ টাকা। ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে ২ লাখ ৮৬ হাজার ৪০৪ কোটি ১ লাখ এবং মার্চে ৩ লাখ ৩ হাজার ১৮ কোটি ৭ লাখ টাকায় ওঠে। এপ্রিলে কিছুটা কমে ২ লাখ ৯৯ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা হলেও মে মাসে এক লাফে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা বেড়ে ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকায় পৌঁছে যায়।

ফলে জুন থেকে টানা তিন মাসের পতন সত্ত্বেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়ে গেছে। আগস্টে মানুষের হাতে যে ৩ লাখ ১৯ হাজার ৯৬ কোটি টাকা রয়েছে, তা এখনো বছরের শুরু অর্থাৎ জানুয়ারির তুলনায় প্রায় ৩৬ হাজার ৪৭০ কোটি টাকা বেশি। অর্থাৎ সাম্প্রতিক তিন মাসে নগদ অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থার দিকে ফিরলেও বছরের প্রথম ভাগে তৈরি হওয়া অতিরিক্ত নগদ চাহিদা পুরোপুরি কাটেনি।

দীর্ঘমেয়াদি তথ্যেও একই ধরনের ওঠানামা দেখা যায়। ২০২৪ সালের আগস্টে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ ছিল ২ লাখ ৯২ হাজার ৪৩৪ কোটি ৪ লাখ টাকা। সেপ্টেম্বর থেকে তা কমতে শুরু করে এবং ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে নেমেছিল ২ লাখ ৭১ হাজার ৪৯৫ কোটি ৬ লাখ টাকায়। পরে আবার কয়েক দফায় বেড়েছে ও কমেছে। ফলে শুধু নগদ অর্থের মাসভিত্তিক পরিবর্তন দিয়ে ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা বেড়েছে বা কমেছে—এমন সরল সিদ্ধান্ত টানা কঠিন।

মানুষের হাতে নগদ কমার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ মানিও আগস্টে কমেছে। জুলাইয়ে রিজার্ভ মানির স্থিতি ছিল ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৬৪১ কোটি ৪০ লাখ টাকা। আগস্টে তা কমে ৪ লাখ ৬০ হাজার ২৬৪ কোটি ৬০ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এক মাসে কমেছে ৩ হাজার ৩৭৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা।

রিজার্ভ মানির সঙ্গে মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থের সরাসরি এক-এক সম্পর্ক নেই। রিজার্ভ মানির মধ্যে প্রচলিত মুদ্রার পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকে ব্যাংকগুলোর সংরক্ষিত অর্থসহ অন্যান্য উপাদান থাকে। ফলে মানুষের হাতে নগদ অর্থ প্রায় ৯ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা কমলেও একই সময়ে রিজার্ভ মানি কমেছে প্রায় ৩ হাজার ৩৭৭ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের আগের প্রকাশিত তথ্যেও নগদ অর্থের বড় ওঠানামা দেখা গেছে। জুন ২০২৬ শেষে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৩৭৫ কোটি ২ লাখ টাকা, যা এক বছর আগের তুলনায় ১৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ বেশি ছিল। একই সময়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থার আমানতও বছরওয়ারি ১০ দশমিক ৭৪ শতাংশ বেড়েছিল।

ফলে জুন থেকে আগস্টের টানা পতন একটি নতুন প্রবণতার ইঙ্গিত দিলেও এটিকে এখনই স্থায়ী পরিবর্তন বলা যাচ্ছে না। এর আগে একাধিকবার কয়েক মাস কমার পর ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ আবার বেড়েছে। তবে মে মাসের চূড়া থেকে তিন মাসে ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি নগদ অর্থ কমে যাওয়া এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রা পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।