ঢাকা,  মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, কার্তিক ১২ ১৪৩৩

টাকা আছে ব্যাংকে, ঋণ নিচ্ছে না ব্যবসা—মুদ্রানীতির নতুন পরীক্ষা

টাকা-কড়ি

ডিএসজে প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২১:২২,২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপডেট: ২৩:৫২,৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

টাকা আছে ব্যাংকে, ঋণ নিচ্ছে না ব্যবসা—মুদ্রানীতির নতুন পরীক্ষা

ডিএসজে

ব্যাংকে টাকা আছে, নীতি সুদহারও কমিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু নতুন ঋণ নিতে এগিয়ে আসছেন না উদ্যোক্তারা। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি এখনো ৫ শতাংশের নিচে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতিও ৮ শতাংশের ওপরে। এমন এক পরিস্থিতিতে বুধবার অক্টোবর-ডিসেম্বর সময়ের জন্য নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এবারের বড় পরীক্ষা তাই শুধু মূল্যস্ফীতি কমানো নয়—ব্যবসায় ঋণের চাহিদা ফেরানোও।

বুধবার বিকেল ৩টায় বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের জাহাঙ্গীর আলম কনফারেন্স হলে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হবে। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান। অন্য ডেপুটি গভর্নর, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের প্রধান কর্মকর্তা, গবেষণা বিভাগের নির্বাহী পরিচালক এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্রসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামনে সমস্যাটি এখন বেশ স্পষ্ট। জুন শেষে বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি নেমেছিল ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে। জুলাইয়ে তা সামান্য বেড়ে প্রায় ৪ দশমিক ৬৪ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ এক মাসে কিছুটা বাড়লেও ঋণপ্রবাহ এখনো ৫ শতাংশের নিচে। অথচ ডিসেম্বর পর্যন্ত এ খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ৬ দশমিক ৮০ শতাংশ। বর্তমান প্রবৃদ্ধি থেকে সেই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে পরবর্তী মাসগুলোতে ঋণের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে হবে।

এই দুর্বলতা কাটাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে একটি বড় পদক্ষেপ নিয়েছে। ২ আগস্ট থেকে নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ কার্যকর করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটির হার ১১ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটির হার ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ রয়েছে। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণের খরচ কমানোর দিকে প্রথম পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু তার পরও বেসরকারি ঋণপ্রবাহে বড় উল্লম্ফন দেখা যায়নি।

এখানেই বুধবারের মুদ্রানীতির মূল প্রশ্ন—সমস্যা কি টাকার দামে, নাকি ঋণের চাহিদায়?

উচ্চ সুদের পাশাপাশি বিনিয়োগে স্থবিরতা, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা ও জ্বালানি সংকট নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে বলে খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন। বিশেষ করে শিল্প, নির্মাণ ও পরিবহন খাতে নতুন ঋণের চাহিদা দুর্বল। ফলে ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার সামর্থ্য থাকলেও উদ্যোক্তার বিনিয়োগ পরিকল্পনা না থাকলে শুধু নীতি সুদ কমিয়ে ঋণপ্রবাহ দ্রুত বাড়ানো কঠিন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানেও আরেকটি বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে। জুনে বেসরকারি খাতে ঋণ বেড়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ, অথচ সরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ছিল ৩০ দশমিক ৪৩ শতাংশ। ফলে অর্থনীতির মোট ঋণ সম্প্রসারণে বেসরকারি বিনিয়োগের পরিবর্তে সরকারি ঋণের ভূমিকা অনেক বেশি হয়ে উঠেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন চাইলেই সুদ কমানোর পথে দ্রুত হাঁটতে পারছে না। কারণ মূল্যস্ফীতি কিছুটা নামলেও এখনো স্বস্তির পর্যায়ে আসেনি। আগস্টে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ, জুলাইয়ে যা ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। ফলে ঋণ সস্তা করতে গিয়ে অর্থনীতিতে টাকার প্রবাহ বেশি বাড়লে মূল্যস্ফীতির চাপ আবার বাড়ার ঝুঁকিও বিবেচনায় রাখতে হবে।

এই দুই বিপরীত চাপই বুধবারের সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সতর্ক রাখছে, অন্যদিকে দুর্বল ঋণপ্রবাহ বলছে অর্থনীতিতে বিনিয়োগের গতি বাড়ানো দরকার। তাই নীতি সুদহার আরও কমানো হবে কি না, তার পাশাপাশি ব্যাংকিং ব্যবস্থার তারল্য কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হবে এবং উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে নতুন কোনো নীতিসংকেত দেওয়া হয় কি না—সেদিকেও নজর থাকবে।

আরেকটি পরিবর্তনও সামনে আসছে। বছরে দুইবারের পরিবর্তে তিন মাস পরপর মুদ্রানীতি ঘোষণার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। সংসদীয় কমিটিতেও বছরে চারবার মুদ্রানীতি ঘোষণার প্রস্তাব এসেছে। অর্থনীতির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে নীতি সমন্বয়ের সময় কমিয়ে আনা এর উদ্দেশ্য।

শেষ পর্যন্ত বুধবারের মুদ্রানীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হতে পারে নীতি সুদের সংখ্যায় নয়, নীতি বাস্তব অর্থনীতিতে কতটা কাজ করছে—সেখানে। কারণ ব্যাংকে ঋণ দেওয়ার মতো অর্থ থাকলেও উদ্যোক্তা যদি কারখানা সম্প্রসারণ, নতুন প্রকল্প বা ব্যবসা বাড়াতে ঋণ নিতে না চান, তাহলে শুধু সুদহার বদলে বিনিয়োগের চাকা ঘোরানো কঠিন।