ঢাকা,  শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, কার্তিক ৭ ১৪৩৩

বন্ধ কারখানা চালুতে ঋণ, পাঁচ মাসে বিতরণ মাত্র ৫৬১ কোটি

কর্মসংস্থানের লক্ষ্য ২৫ লাখ মানুষের, অথচ বিশেষ তহবিলের ৯৭ শতাংশের বেশি এখনো অবিতরিত

দেশ ও প্রবৃদ্ধি

ডিএসজে প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২০:৩৫,১৮ অক্টোবর ২০২৬

আপডেট: ১৪:৩৬,১৯ অক্টোবর ২০২৬

সর্বশেষ

বন্ধ কারখানা চালুতে ঋণ, পাঁচ মাসে বিতরণ মাত্র ৫৬১ কোটি

ডিএসজে কোলাজ

বন্ধ কারখানার চাকা ঘুরিয়ে ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে বিপুল অর্থায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কিন্তু পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও বন্ধ শিল্প ও সেবা খাত চালুর জন্য বরাদ্দ ২০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে উদ্যোক্তাদের হাতে পৌঁছেছে মাত্র ৫৬১ কোটি টাকা। অর্থাৎ ঘোষিত অর্থের ৯৭ শতাংশের বেশিই এখনো বিতরণ হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, বন্ধ শিল্প ও সেবা খাত পুনরায় চালুর বিশেষ স্কিমে বিতরণ করা হয়েছে ৫৬০ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। এটি ওই খাতের মোট বরাদ্দের মাত্র ২ দশমিক ৮০ শতাংশ। বিপরীতে অবিতরিত রয়েছে ১৯ হাজার ৪৩৯ কোটি ৭ লাখ টাকা।

এ খাতে আরও ৯২৯ কোটি ৫০ লাখ টাকার অর্থায়ন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বিতরণ ও প্রক্রিয়াধীন অর্থ মিলিয়ে মোট পরিমাণ দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৯০ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রক্রিয়াধীন অর্থের পুরোটাই শেষ পর্যন্ত বিতরণ হলেও বরাদ্দের প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশ উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, বন্ধ কলকারখানা চালু, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে ১৫টি প্রাক্-অর্থায়ন ও পুনঃঅর্থায়ন স্কিম চালু করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এসব স্কিমে ৬০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণা দেওয়া হয়। পরে তহবিলের আকার বাড়িয়ে ৬২ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে।

কিন্তু পাঁচ মাসে ১৫টি স্কিম থেকে মোট বিতরণ হয়েছে ১১ হাজার ৯৫৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা। প্রাথমিক ৬০ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দের হিসাবে বিতরণের হার ১৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১০০ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে উদ্যোক্তাদের হাতে পৌঁছেছে প্রায় ২০ টাকা।

এর বাইরে আরও ২ হাজার ৫৫৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকার অর্থায়ন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বিতরণ ও প্রক্রিয়াধীন অর্থ মিলিয়ে মোট পরিমাণ ১৪ হাজার ৫১৯ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। তবে প্রক্রিয়াধীন অর্থ এখনো উদ্যোক্তাদের হাতে পৌঁছায়নি।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বন্ধ কারখানা চালুর তহবিল ঘিরে। এ খাতেই মোট প্রাথমিক বরাদ্দের এক-তৃতীয়াংশ রাখা হয়েছে। অথচ অর্থ বিতরণের হার অন্য কয়েকটি স্কিমের তুলনায় অনেক কম।

বন্ধ কারখানা পুনরায় চালু করতে শুধু ঋণ অনুমোদন যথেষ্ট নয়। উৎপাদন শুরুর জন্য কাঁচামাল কেনা, শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ, যন্ত্রপাতি সচল করা এবং বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ প্রয়োজনীয় সরবরাহ নিশ্চিত করাও জরুরি। ফলে অর্থায়নে বিলম্ব হলে কারখানা চালুর পরিকল্পনাও পিছিয়ে যেতে পারে।

তবে কতটি বন্ধ কারখানা ইতিমধ্যে ঋণ পেয়েছে, কতটি উৎপাদনে ফিরেছে এবং কতজন শ্রমিক নতুন করে কাজে যোগ দিয়েছেন—বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্যের সারসংক্ষেপে এসব পরিসংখ্যান নেই। 

১৫টি স্কিমের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ বিতরণ হয়েছে প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট পুনঃঅর্থায়ন স্কিমে। এ খাতে বিতরণ করা হয়েছে ৬ হাজার ৯১৭ কোটি টাকা। সব স্কিমে মোট বিতরণ করা অর্থের প্রায় ৫৮ শতাংশই গেছে এই একটি খাতে।

রপ্তানির প্রস্তুতিমূলক অর্থায়নে বড় অঙ্কের অর্থ বিতরণ ইতিবাচক হলেও অন্যান্য স্কিমে অর্থপ্রবাহের অসম চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

কটেজ, ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টির বিশেষ স্কিমে বিতরণ করা হয়েছে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। সিএমএসএমই খাতের চলতি মূলধন পুনঃঅর্থায়ন তহবিল থেকে বিতরণ হয়েছে ৯০৭ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।

সৃজনশীল অর্থনীতির স্কিমে ৫০০ কোটি টাকা এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ, খাদ্যনিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির পুনঃঅর্থায়ন স্কিমে ২৯২ কোটি ৯০ লাখ টাকা বিতরণ হয়েছে।

বৈদেশিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির স্কিমে বিতরণ করা হয়েছে ২০০ কোটি টাকা। উত্তরবঙ্গে কৃষিভিত্তিক বিশেষ অর্থনৈতিক কেন্দ্র গঠনের স্কিমে বিতরণ হয়েছে ৪৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।

নতুন উদ্যোক্তা তৈরির গুরুত্বপূর্ণ খাত স্টার্টআপেও অর্থ বিতরণ সীমিত। এ খাতে পাঁচ মাসে বিতরণ করা হয়েছে মাত্র ৩২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। আরও পাঁচ কোটি টাকার অর্থায়ন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

অন্যদিকে বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য এক হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত কোনো অর্থ বিতরণের তথ্য পাওয়া যায়নি। পুরো এক হাজার কোটি টাকাই প্রক্রিয়াধীন হিসেবে দেখানো হয়েছে।

গ্রিন ফ্যাক্টরি বিল্ডিং ও গ্রিন ইন্ডাস্ট্রিজ খাতে ৫২৭ কোটি ৪৭ লাখ টাকা এবং চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা রপ্তানিমুখী খাতে ৯৮ কোটি টাকার অর্থায়ন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

আরও উদ্বেগের বিষয়, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আনা এবং হিমায়িত চিংড়ি ও অন্যান্য মাছ রপ্তানিমুখী খাতের তিনটি স্কিমে পাঁচ মাসেও কোনো অর্থ বিতরণ করা হয়নি।

ফলে একটি স্কিমে বড় অঙ্কের অর্থ বিতরণ হলেও কর্মসংস্থান, শিল্প পুনরুজ্জীবন ও রপ্তানি বহুমুখীকরণের একাধিক লক্ষ্যভিত্তিক তহবিলে অর্থায়ন এখনো সীমিত।

সরকার ঘোষিত উদ্যোগে শিল্পোদ্যোক্তাদের সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদ দেওয়ার কথা রয়েছে। বাকি ৬ শতাংশ সুদ সরকার ভর্তুকি হিসেবে বহন করবে। তুলনামূলক কম সুদে অর্থায়নের মাধ্যমে বন্ধ শিল্পকারখানা সচল করা, উৎপাদন বাড়ানো এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য। তবে কম সুদের সুবিধা ঘোষণার পরও অর্থ বিতরণে গতি আসছে না।

বর্তমানে জ্বালানিসংকটসহ বিভিন্ন সমস্যায় শিল্প খাত চাপে রয়েছে। বন্ধ কারখানা চালুর জন্য অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ হলেও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, বাজারের চাহিদা এবং ব্যবসা পরিচালনার অনুকূল পরিবেশ ছাড়া শুধু ঋণ দিয়ে উৎপাদন টেকসই করা কঠিন।

সর্বশেষ