ছবি: পিপিআরসি
দারিদ্র্যসীমার সামান্য ওপরে কোনোমতে টিকে আছেন দেশের প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ মানুষ। আয় কমে যাওয়া, অসুস্থতা কিংবা আকস্মিক কোনো আর্থিক বিপর্যয় তাঁদের ঠেলে দিতে পারে দারিদ্র্যের নিচে। অথচ দেশের একটি পরিবারের গড় মাসিক আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান মাত্র ৭০ টাকা। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, চিকিৎসার ব্যয় ও অপর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের চাপে এই জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।
শনিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে প্রকাশিত পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) ‘স্টেট অব দ্য রিয়েল ইকোনমি: ডায়নামিকস অব রিভার্সালস অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে।
দেশের আট বিভাগের গ্রামীণ ও নগর এলাকার ৮ হাজার ৬৭টি পরিবারের ওপর পরিচালিত জরিপের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা যায়, ২০২৫ সালের মে মাসে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ। চরম দারিদ্র্যের হার ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ। এর বাইরে আরও ১৭ দশমিক ৯৭ শতাংশ জনগোষ্ঠী দারিদ্র্যসীমার সামান্য ওপরে অবস্থান করছে। গবেষকেরা তাঁদের চিহ্নিত করেছেন ‘ভঙ্গুর মধ্যবিত্ত’ হিসেবে। জনসংখ্যার হিসাবে এই জনগোষ্ঠীর আকার প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ।
তাঁরা বর্তমানে দারিদ্র্যসীমার নিচে না থাকলেও সামান্য আর্থিক ধাক্কা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা সীমিত। ফলে চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান হারানো কিংবা নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তাঁদের জীবনযাত্রায় বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
মাস শেষে উদ্বৃত্ত মাত্র ৭০ টাকা
জরিপে দেশের একটি পরিবারের গড় মাসিক আয় পাওয়া গেছে ৩২ হাজার ৬৮৫ টাকা। বিপরীতে গড় ব্যয় ৩২ হাজার ৬১৫ টাকা। অর্থাৎ আয় থেকে ব্যয় বাদ দিলে উদ্বৃত্ত থাকে মাত্র ৭০ টাকা।
এটি সব পরিবারের প্রকৃত সঞ্চয়ের পরিমাণ নয়; বরং জাতীয় পর্যায়ে গড় আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান। তবে এই সামান্য উদ্বৃত্ত পরিবারগুলোর সীমিত আর্থিক সক্ষমতার চিত্র তুলে ধরে।
সবচেয়ে দরিদ্র ১০ শতাংশ পরিবারের অবস্থা আরও সংকটাপন্ন। তাদের গড় মাসিক আয় ৮ হাজার ৪৭৭ টাকা হলেও ব্যয় ১২ হাজার ২৯৪ টাকা। অর্থাৎ প্রতি মাসে ঘাটতি ৩ হাজার ৮১৭ টাকা।
খাদ্যব্যয়ও পরিবারগুলোর ওপর বড় চাপ তৈরি করছে। জাতীয়ভাবে মোট পারিবারিক ব্যয়ের ৫৪ দশমিক ৯ শতাংশ চলে যায় খাবার কিনতে। গ্রামাঞ্চলে এই হার ৫৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ। ফলে চিকিৎসা, শিক্ষা ও জরুরি প্রয়োজনের জন্য অর্থ সংরক্ষণের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।
আর্থিক বিপর্যয়ের বড় কারণ চিকিৎসা
গবেষণায় পরিবারের আর্থিক সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে চিকিৎসা ব্যয়। জরিপ অনুযায়ী, ৫২ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবারে অন্তত একজন সদস্য দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভুগছেন।
দেশে মোট স্বাস্থ্যব্যয়ের ৭৯ দশমিক ৩১ শতাংশ নাগরিকদের নিজেদের পকেট থেকে বহন করতে হয়। জরিপে চিহ্নিত আর্থিক সংকটের ৬৭ দশমিক ৪ শতাংশের পেছনে চিকিৎসাসংক্রান্ত ব্যয়কে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অসুস্থতার কারণে একদিকে চিকিৎসার খরচ বাড়ে, অন্যদিকে পরিবারের উপার্জনও ব্যাহত হতে পারে। সঞ্চয় সীমিত থাকায় অনেক পরিবারকে তখন ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়।
গবেষণার হিসাবে, একটি পরিবারের গড় ঋণের পরিমাণ তাদের গড় সঞ্চয়ের তুলনায় ৪৪ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। দরিদ্রতম ১০ শতাংশ পরিবারের ক্ষেত্রে এই ব্যবধান ২১৮ শতাংশ।
অর্থাৎ আর্থিক বিপর্যয় মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সঞ্চয় না থাকায় ঋণের বোঝা আরও বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
কাজ আছে, পর্যাপ্ত আয় নেই
পিপিআরসির গবেষণায় কর্মসংস্থানের সংখ্যার পাশাপাশি কাজের মান ও পর্যাপ্ত আয়ের সংকটও উঠে এসেছে।
জরিপ অনুযায়ী, কর্মরত প্রাপ্তবয়স্কদের ৩৭ দশমিক ৭ শতাংশ সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টার কম কাজ পান। গবেষকেরা একে পর্যাপ্ত কাজের অভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে দেখিয়েছেন।
মোট কর্মসংস্থানের ৪৪ দশমিক ৯ শতাংশ আত্মকর্মসংস্থান এবং ১৮ দশমিক ১ শতাংশ দিনমজুরিভিত্তিক। বিপরীতে নিয়োগকর্তার অংশ মাত্র ৩ দশমিক ১ শতাংশ।
এই কর্মসংস্থান কাঠামোয় আয় অনিয়মিত হলে পরিবারগুলোর পক্ষে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তা গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে।
সামাজিক সুরক্ষায়ও বড় ঘাটতি
অর্থনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর আওতা ও সুবিধাভোগী নির্বাচনে দুর্বলতা পেয়েছেন গবেষকেরা।
জরিপে দেখা যায়, দেশের মাত্র ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার সরকারি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধা পাচ্ছে।
অন্যদিকে সুবিধাভোগীদের প্রায় ৪৪ শতাংশ দারিদ্র্যসীমার ওপরে অবস্থান করছে। এর মধ্যে ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ ভঙ্গুর মধ্যবিত্ত এবং ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ অন্য অদরিদ্র জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত।
এ ছাড়া ন্যায্যমূল্যের কার্ড পাওয়ার যোগ্য দরিদ্র পরিবারগুলোর মাত্র ৫ দশমিক ৩ শতাংশ এ সুবিধা পাচ্ছে বলে জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষকদের মতে, সামাজিক সুরক্ষার সুবিধা প্রকৃত প্রয়োজন অনুযায়ী বণ্টন করা না গেলে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হবে।
প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি মানুষের নিরাপত্তায় গুরুত্ব
পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিলুর রহমান ও গবেষক নামিরা শামীম সংকট মোকাবিলায় পাঁচ স্তম্ভবিশিষ্ট ‘ট্রানজিশন কম্প্যাক্ট’ বা সমন্বিত পরিবর্তনের রূপরেখা প্রস্তাব করেছেন।
এতে অর্থনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর জন্য মৌলিক সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা, তথ্যভিত্তিক পরিবীক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
গবেষণার মূল পর্যবেক্ষণ হলো, শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়লেই পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। আয়, ব্যয়, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা কমাতে না পারলে দারিদ্র্যসীমার সামান্য ওপরে থাকা বিপুল জনগোষ্ঠী আবারও দারিদ্র্যের নিচে নেমে যেতে পারে।















