ছবি: পিপিআরসি
সরকারি ও প্রশাসনিক সেবা পেতে টাকা ছাড়া কাজ হয় না বলে মনে করেন দেশের ৭৪ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ। সরকারি দপ্তরে অনিয়ম, হয়রানি ও অনানুষ্ঠানিক অর্থ লেনদেনের এই সংস্কৃতি নাগরিকদের জন্য একধরনের অঘোষিত কর হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর আর্থিক সংকট আরও বাড়িয়ে তুলছে সেবা পাওয়ার এই বাড়তি খরচ।
পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) জাতীয় জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে। শনিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘স্টেট অব দ্য রিয়েল ইকোনমি: ডায়নামিকস অব রিভার্সালস অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।
দেশের আট বিভাগের গ্রামীণ ও নগর এলাকার ৮ হাজার ৬৭টি পরিবারের ওপর পরিচালিত জরিপে সরকারি সেবা, প্রশাসনিক জটিলতা, অনানুষ্ঠানিক লেনদেন এবং নাগরিকদের অর্থনৈতিক দুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
গবেষণায় প্রশাসনিক হয়রানি ও অনানুষ্ঠানিক অর্থ লেনদেনকে নাগরিক জীবনের ওপর ‘অনানুষ্ঠানিক কর’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, সেবা পেতে নির্ধারিত অর্থের বাইরে অতিরিক্ত টাকা দেওয়া কিংবা বারবার সরকারি দপ্তরে ঘুরতে হওয়া সাধারণ মানুষের অর্থ ও সময়ের অপচয় ঘটায়। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাও দুর্বল করে।
জরিপে দেখা যায়, স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে ৪৮ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ বিভিন্ন ধরনের হয়রানি ও অনানুষ্ঠানিক লেনদেনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। জরুরি চিকিৎসাসেবা থেকে শুরু করে অন্যান্য নাগরিক সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রেও প্রশাসনিক জটিলতা ও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ব্যবসার অনুমোদন, লাইসেন্স সংগ্রহ, জমি নিবন্ধন এবং সরকারি সনদপত্র পাওয়ার ক্ষেত্রেও অনানুষ্ঠানিক অর্থ লেনদেন ও হয়রানির বিষয় উঠে এসেছে গবেষণায়। প্রয়োজনীয় সেবা পেতে বিলম্ব এবং অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের চাপ বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের পরিবারগুলো এমনিতেই উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয় ও আয়ের অনিশ্চয়তায় রয়েছে। জাতীয়ভাবে পারিবারিক ব্যয়ের ৫৪ দশমিক ৯ শতাংশই চলে যায় খাদ্যের পেছনে। অন্যদিকে ৩৭ দশমিক ৭ শতাংশ শ্রমিক সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টার কম কাজ পান, যা অপর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের চিত্র তুলে ধরে।
এই পরিস্থিতিতে সরকারি সেবা পেতে অনানুষ্ঠানিক অর্থ ব্যয় পরিবারগুলোর ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে দেশের ১৭ দশমিক ৯৭ শতাংশ ভঙ্গুর মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী, সংখ্যায় প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ মানুষ, এবং দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা পরিবারগুলো এ ধরনের অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে আরও অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
গবেষণায় প্রশাসনিক অনিয়মের সঙ্গে ব্যবসা ও বিনিয়োগের সম্পর্কও তুলে ধরা হয়েছে। পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিলুর রহমান ও গবেষক নামিরা শামীমের বিশ্লেষণে প্রশাসনিক আনুকূল্য, অনানুষ্ঠানিক লেনদেন এবং জবাবদিহির ঘাটতিকে ‘রাজনীতি ও সুশাসনের ফাঁদ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
গবেষকদের মতে, সেবা পেতে ঘুষ বা অনানুষ্ঠানিক অর্থ দেওয়ার সংস্কৃতি শুধু নাগরিকদের ভোগান্তিই বাড়ায় না; ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়ও বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ, উদ্যোক্তা কার্যক্রম এবং মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে পাঁচ স্তম্ভবিশিষ্ট ‘ট্রানজিশন কম্প্যাক্ট’-এর আওতায় দ্রুতগতির সুশাসন প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করা হয়েছে। সরকারি সেবায় নির্দিষ্ট সময়সীমা, স্বচ্ছ প্রক্রিয়া, জবাবদিহি এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন গবেষকেরা।
তাঁদের মতে, নাগরিকদের সরাসরি ও নির্ধারিত সময়ে সেবা নিশ্চিত করা গেলে অনানুষ্ঠানিক লেনদেনের সুযোগ কমবে। একই সঙ্গে মানুষের অর্থ ও সময় সাশ্রয় হবে এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা বাড়বে।
গবেষণার মূল বার্তা হলো, প্রশাসনিক হয়রানি শুধু সুশাসনের সমস্যা নয়; এটি পরিবারগুলোর জীবনযাত্রার ব্যয়, ব্যবসার খরচ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।















