ডিএসজে কোলাজ
কাগজপত্রে বিপুল পরিমাণ পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানির হিসাব। কিন্তু সেই উৎপাদনের সঙ্গে মিল নেই কারখানার বিদ্যুৎ ব্যবহারের। এই অসংগতি অনুসরণ করেই নারায়ণগঞ্জের একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ৮৫ কোটি ২১ লাখ টাকার বেশি শুল্ক-কর ফাঁকির অভিযোগ উদ্ঘাটন করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা।
সরেজমিনে গিয়ে কর্মকর্তারা দেখতে পান, উৎপাদনের যন্ত্রপাতি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। অথচ প্রতিষ্ঠানটি বন্ড সুবিধায় শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানি করে রপ্তানি দেখিয়ে আসছিল।
অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান ইউএজিএম বিডি লিমিটেড। নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের মিজিমিজি দক্ষিণ পাড়ায় অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটি কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা (দক্ষিণ)-এর আওতাধীন একটি প্রচ্ছন্ন রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মোট ৮৫ কোটি ২১ লাখ ৪৬ হাজার ৪৯৫ টাকা রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে এ-সংক্রান্ত মামলা প্রতিবেদন কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা (দক্ষিণ)-এ পাঠানো হয়েছে।
কাস্টমস গোয়েন্দার তথ্য অনুযায়ী, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত ৯ সেপ্টেম্বর সিদ্ধিরগঞ্জের বি/২৪০, মিজিমিজি দক্ষিণ পাড়ায় ইউএজিএম বিডি লিমিটেডের কারখানায় অভিযান চালায় অধিদপ্তরের একটি দল।
অভিযানের সময় প্রতিষ্ঠানটির বিদ্যুৎ বিল সংগ্রহ করেন কর্মকর্তারা। পরে ঘোষিত উৎপাদনের সঙ্গে বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য মিলিয়ে বড় ধরনের অসংগতি পাওয়া যায়। যে পরিমাণ পণ্য উৎপাদনের তথ্য নথিতে দেখানো হয়েছে, বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।
কারখানায় বিকল্প বিদ্যুৎ সংযোগ, সৌরবিদ্যুৎ কিংবা গ্যাসচালিত কোনো উৎপাদনব্যবস্থাও পাওয়া যায়নি। ফলে ঘোষিত উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি কোথা থেকে সরবরাহ করা হয়েছে, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়।
বিদ্যুৎ বিলের এই অসংগতির পাশাপাশি কারখানার বাস্তব অবস্থাও পরীক্ষা করেন কর্মকর্তারা। তাঁরা দেখতে পান, উৎপাদনের জন্য স্থাপিত যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। এমনকি কারখানার উৎপাদনকক্ষে নিয়মিত উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনার উপযোগী জায়গাও ছিল না।
অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটির নথিতে যে উৎপাদনের তথ্য রয়েছে, তার সঙ্গে কারখানার যন্ত্রপাতি, বিদ্যুৎ ব্যবহার ও উৎপাদনকক্ষের অবস্থার মিল পাননি তদন্তকারীরা।
কাস্টমস গোয়েন্দা জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধায় পিভিসি ফ্লেক্স, পিভিসি ফিল্ম, পেট ফিল্ম, কৃত্রিম চামড়া, ডুপ্লেক্স বোর্ড ও কালার বোর্ডসহ বিভিন্ন ধরনের কাঁচামাল শুল্কমুক্ত আমদানি করত। এসব কাঁচামাল দিয়ে পণ্য তৈরি করে ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্রের মাধ্যমে রপ্তানি দেখানো হতো।
বন্ড সুবিধার আওতায় আমদানি করা কাঁচামাল অনুমোদিত রপ্তানিমুখী উৎপাদনে ব্যবহারের কথা। এ জন্য প্রতিষ্ঠানটি সংশ্লিষ্ট বন্ড কমিশনারেট থেকে ইউটিলাইজেশন পারমিশন বা ইউপি গ্রহণ করেছিল।
কিন্তু কাস্টমস গোয়েন্দার প্রাথমিক অনুসন্ধানে অভিযোগ উঠেছে, প্রতিষ্ঠানটি অনুমোদিত উৎপাদনে ব্যবহার না করে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল স্থানীয় খোলাবাজারে বিক্রি করেছে। অন্যদিকে কাগজপত্রে সেসব কাঁচামাল ব্যবহার করে পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানির তথ্য দেখানো হয়েছে।
অভিযানের পর প্রতিষ্ঠানটির আমদানিসংক্রান্ত তথ্য, বিদ্যুৎ বিল, উৎপাদনক্ষমতা, ইউটিলাইজেশন পারমিশন এবং অন্যান্য নথি পর্যালোচনা করেন তদন্তকারীরা। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে ৮৫ কোটি ২১ লাখ ৪৬ হাজার ৪৯৫ টাকা রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ নির্ধারণ করা হয়।
তবে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে প্রতিষ্ঠানটি কত পরিমাণ কাঁচামাল আমদানি করেছিল, কত টাকার রপ্তানি দেখিয়েছে কিংবা কোন সময়ের লেনদেনের ভিত্তিতে রাজস্ব ফাঁকির অঙ্ক নির্ধারণ করা হয়েছে, তার বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি। বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রকৃত পরিমাণ এবং ঘোষিত উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুতের তুলনামূলক হিসাবও প্রকাশ করা হয়নি।
বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা মূলত রপ্তানিমুখী শিল্পের উৎপাদন ব্যয় কমানোর একটি ব্যবস্থা। এর আওতায় নির্ধারিত শর্তে শুল্ক-কর ছাড়ে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু সেই কাঁচামাল অনুমোদিত উৎপাদনের বাইরে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হলে সরকার প্রাপ্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
এ ধরনের অনিয়ম বৈধ ব্যবসায়ীদের জন্যও ক্ষতিকর। কারণ নিয়ম মেনে শুল্ক-কর পরিশোধ করে কাঁচামাল আমদানি করা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শুল্কমুক্ত পণ্য অবৈধভাবে বাজারজাতকারীদের অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হয়।
কাস্টমস গোয়েন্দার অনুসন্ধানটি আমদানি-রপ্তানির কাগজপত্রের বাইরে কারখানার বাস্তব উৎপাদনক্ষমতা যাচাইয়ের গুরুত্বও সামনে এনেছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য, যন্ত্রপাতির অবস্থা এবং উৎপাদনকক্ষের সক্ষমতা পর্যালোচনা করে ঘোষিত উৎপাদনের সত্যতা যাচাইয়ের সুযোগ রয়েছে।
অধিদপ্তর জানিয়েছে, রাজস্ব সুরক্ষা ও বন্ড সুবিধার অপব্যবহার প্রতিরোধে তাদের নজরদারি এবং অভিযান অব্যাহত থাকবে।















