ডিএসজে
আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পকে ক্রমেই পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের দিকে যেতে হচ্ছে। কিন্তু নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের ঘাটতি, উচ্চ ব্যয় ও নীতিগত প্রতিবন্ধকতা সেই রূপান্তরকে কঠিন করে তুলছে। এতে ভবিষ্যতে রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি দেখছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাজধানীর হোটেল শেরাটনে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) আয়োজিত নীতিসংলাপে এসব উদ্বেগ উঠে আসে। বক্তারা বলেন, সবুজ প্রবৃদ্ধিকে দেশের উন্নয়নকৌশলের কেন্দ্রে আনতে না পারলে জ্বালানি নিরাপত্তা, সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান চাপে পড়তে পারে।
সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সানেমের নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক সেলিম রায়হান। তিনি বলেন, পেট্রোলিয়াম, গ্যাস ও কয়লার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সরবরাহব্যবস্থায় প্রতিবন্ধকতা থাকায় বিকল্প উৎসে রূপান্তরও প্রত্যাশিত গতি পাচ্ছে না।
তাঁর মতে, জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার বাড়িয়ে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা কমানো গেলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মানুষের ভোগব্যয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ পরিবর্তনের ব্যয় ও সুফল বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে কীভাবে বণ্টিত হবে, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে। আন্তর্জাতিক জলবায়ু প্রতিশ্রুতির সঙ্গে দেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকারের সমন্বয় এবং খাতভিত্তিক বাস্তবায়ন পরিকল্পনার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
রপ্তানি খাতের জন্য পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক পরিবেশগত শর্তের বিষয়টি তুলে ধরেন জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) বাংলাদেশ কার্যালয়ের প্রকল্প অর্থনীতিবিদ মেহেরুনা আই চৌধুরী।
তিনি বলেন, সবুজ প্রবৃদ্ধির সঙ্গে বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজমের (সিবিএএম) মতো পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য দেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রস্তুত করতে হবে।
এ ধরনের ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট পণ্যের উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় কার্বন নিঃসরণের হিসাব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে বাংলাদেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য শুধু উৎপাদন ব্যয় কমানো নয়, পরিবেশগত মান বজায় রাখার সক্ষমতা অর্জনও প্রয়োজন। তবে সিবিএএম বর্তমানে বাংলাদেশের সব রপ্তানি পণ্যের ওপর সমানভাবে প্রযোজ্য নয়।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতাগুলোর একটি প্রাথমিক মূলধনের প্রয়োজনীয়তা। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম শফিকুজ্জামান জানান, নিজস্ব মূলধনে এক মেগাওয়াট ক্ষমতার ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে প্রায় ছয় থেকে আট কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে।
তাঁর মতে, শুধু স্থাপন ব্যয় নয়, অর্থায়ন ও পরিচালনসংক্রান্ত সমস্যার সমাধানও জরুরি। পর্যাপ্ত অর্থায়নের সুযোগ না থাকলে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পক্ষে সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ করা কঠিন হবে।
নিউএজ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান আসিফ ইব্রাহিম বলেন, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জ্বালানি ব্যয় কমানোর সুযোগ রয়েছে। কিন্তু উচ্চ প্রাথমিক বিনিয়োগ, ঋণপ্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা, করসংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতা এবং নীতির দুর্বল প্রয়োগ এর সম্প্রসারণ আটকে দিচ্ছে।
বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, বিকল্প জ্বালানি নির্বাচনের ক্ষেত্রে সাশ্রয়ী মূল্য, সহজলভ্যতা এবং উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ বিবেচনায় নিতে হবে। সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে আগ্রহ বাড়লেও জমির স্বল্পতা বড় সমস্যা।
নীতি বাস্তবায়নের দুর্বলতা বোঝাতে তিনি চামড়াশিল্পের কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগারের উদাহরণ দেন। দীর্ঘ দুই দশকেও কার্যকর কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে না পারাকে বাস্তবায়নসংকটের দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।
এদিকে ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সচিব) মনজুর হোসেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এ লক্ষ্য প্রায় ছয় হাজার মেগাওয়াটের সমতুল্য।
তিনি বলেন, ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সহজ শর্তে সবুজ অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
সংলাপে জলবায়ু অর্থায়নের বণ্টন নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ফাহমিদা খাতুন। তিনি জানান, আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের প্রায় ৬৫ শতাংশ জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমনে এবং ৩৫ শতাংশ অভিযোজনে ব্যয় হচ্ছে। বাংলাদেশের মতো জলবায়ুঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য অভিযোজন খাতে অর্থায়ন বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
বাংলাদেশ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ গবেষণা কাউন্সিলের উদ্ভাবন বিভাগের পরিচালক হাসান মাহমুদ জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার, সাশ্রয় এবং দেশীয় প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ওপর গুরুত্ব দেন।
আলোচনায় সৌর প্যানেল ও ইনভার্টারের মান, নেট মিটারিংয়ের প্রতিবন্ধকতা, সৌর সেচ এবং জাতীয় গ্রিডে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের সংযুক্তির সমস্যাও উঠে আসে।
স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তিত চাহিদা মোকাবিলায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তুতি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন অংশগ্রহণকারীরা।
সমাপনী বক্তব্যে সেলিম রায়হান বলেন, সবুজ খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে বৃহত্তর শিল্পনীতির কাঠামো প্রয়োজন। নতুন উদ্যোক্তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ও আমলাতান্ত্রিক বাধা দূর করার ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
সংলাপের আলোচনায় স্পষ্ট হয়েছে, বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো নয়; সেই বিদ্যুৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য করাও জরুরি। অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও নীতি বাস্তবায়নে সমন্বয় না এলে সবুজ উৎপাদনের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।















