ডিএসজে
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একই সঙ্গে প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া ও মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি আরও প্রকট হচ্ছে। চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে ৩ দশমিক ২ শতাংশে। বিপরীতে গড় মূল্যস্ফীতি পৌঁছাতে পারে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে, যা বাস্তবায়িত হলে হবে প্রায় ১৬ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নতুন পূর্বাভাসে এমন আশঙ্কা উঠে এসেছে।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) প্রকাশিত আইএমএফের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতির এ পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের যৌথ বার্ষিক সভা চলাকালে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
আইএমএফের হিসাবে, সদ্য সমাপ্ত ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে তা আরও শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ পয়েন্ট কমতে পারে। অন্যদিকে গত অর্থবছরের সম্ভাব্য গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে চলতি অর্থবছরে ২ দশমিক ২ শতাংশ পয়েন্ট বেড়ে যেতে পারে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাসে নাটকীয় পরিবর্তন নিয়ে। মাত্র ছয় মাস আগে চলতি অর্থবছরের জন্য আইএমএফ মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস দিয়েছিল ৬ শতাংশ। নতুন পূর্বাভাসে তা বাড়িয়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ করা হয়েছে। অর্থাৎ অল্প সময়ের ব্যবধানে মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস বেড়েছে ৪ দশমিক ৯ শতাংশ পয়েন্ট।
এত বড় সংশোধন মূল্য পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় এবং সরবরাহব্যবস্থার প্রতিবন্ধকতা দীর্ঘস্থায়ী হলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০১০–১১ অর্থবছরে দেশে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ৯২ শতাংশ। আইএমএফের নতুন পূর্বাভাস বাস্তবায়িত হলে চলতি অর্থবছরের গড় মূল্যস্ফীতি সেই পর্যায়ের কাছাকাছি পৌঁছাবে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও বাংলাদেশ উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ০৩ শতাংশ। পরবর্তী অর্থবছরে তা কমে ৮ দশমিক ৭ শতাংশে আসার হিসাব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু চলতি অর্থবছরের পূর্বাভাস বলছে, মূল্যস্ফীতি কমার সেই ধারা উল্টে যেতে পারে।
অবশ্য অর্থবছরের প্রথম তিন মাসের প্রকৃত মূল্যস্ফীতির চিত্র এখনো আইএমএফের পূর্বাভাসের তুলনায় অনেক নিচে রয়েছে। বিবিএসের হিসাবে, জুলাইয়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ, আগস্টে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ এবং সেপ্টেম্বরে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
এই তিন মাসের সরল গড় ৮ দশমিক ৩১ শতাংশ। অর্থাৎ পুরো অর্থবছরের গড় মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাতে হলে পরবর্তী নয় মাসে মূল্যস্ফীতির চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে হবে।
প্রথম তিন মাসের প্রকাশিত হারকে সমান ওজন দিয়ে হিসাব করলে বাকি নয় মাসে গড় মূল্যস্ফীতি প্রায় ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ হতে হবে। এটি আইএমএফের পূর্বাভাসের সঙ্গে সাম্প্রতিক বাস্তব পরিস্থিতির ব্যবধান তুলে ধরে। তবে এ হিসাব একটি গাণিতিক তুলনা; মূল্যস্ফীতি কোন মাসে কত হবে, তার পূর্বাভাস নয়।
আইএমএফের পূর্বাভাসের সঙ্গে অন্য উন্নয়ন সহযোগীদের হিসাবেও বড় পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) সেপ্টেম্বরে চলতি অর্থবছরের গড় মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। জুলাইয়ে সংস্থাটির পূর্বাভাস ছিল ৮ দশমিক ৮ শতাংশ।
অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের অক্টোবরের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেটে চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৬ শতাংশে থাকার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
ফলে একই অর্থবছরের জন্য তিনটি আন্তর্জাতিক সংস্থার পূর্বাভাসের মধ্যে সর্বোচ্চ ২ দশমিক ৩ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধান রয়েছে। এই পার্থক্য ভবিষ্যৎ মূল্য পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তাকেই সামনে আনছে।
এডিবির বিশ্লেষণে সম্ভাব্য এল নিনোর বিলম্বিত প্রভাব, জ্বালানিসংকট, উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনে বিঘ্নের আশঙ্কাকে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি মুদ্রানীতির কড়াকড়ি শিথিল হওয়া এবং বাজারে তারল্য সরবরাহ বাড়লে মূল্যচাপ বৃদ্ধির আশঙ্কার কথাও বলেছে সংস্থাটি।
বিশ্বব্যাংকও জ্বালানির সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহসংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতা, সম্প্রসারণমূলক রাজস্বনীতি এবং অপেক্ষাকৃত শিথিল মুদ্রানীতিকে মূল্যস্ফীতির সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখছে।
অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি কমার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় নীতিনির্ধারকদের সামনে কঠিন সমন্বয়ের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ঋণ ও অর্থপ্রবাহের ওপর কড়াকড়ি বজায় রাখলে বিনিয়োগের পুনরুদ্ধার বাধাগ্রস্ত হতে পারে। আবার বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়াতে দ্রুত ঋণপ্রবাহ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিলে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষ করে বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্প উৎপাদন দুর্বল থাকায় প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ার প্রভাব কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধির ওপর পড়তে পারে। একই সময়ে নিত্যপণ্যের দাম বাড়লে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা আরও সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাংকের নতুন বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেটেও অর্থনীতির কয়েকটি কাঠামোগত দুর্বলতা তুলে ধরা হয়েছে। সংস্থাটির মূল্যায়নে বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান দুর্বল, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগ তৈরি করছে।
বিশ্বব্যাংক মনে করে, ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা ফেরানো, জ্বালানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সুশাসন জোরদার এবং কর-রাজস্ব বৃদ্ধি অর্থনৈতিক সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
একই সঙ্গে ভর্তুকি ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কার্যকারিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি। তাদের বিশ্লেষণে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সারের মতো খাতে সাধারণ ভর্তুকির সুবিধা সব ক্ষেত্রে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে যথাযথভাবে পৌঁছায় না। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বাইরেও থেকে যায় অনেক দরিদ্র পরিবার।
এ জন্য সাধারণ ভর্তুকি পর্যায়ক্রমে কমিয়ে দরিদ্র ও ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
এদিকে আইএমএফের বৈশ্বিক পূর্বাভাসেও মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি উঠে এসেছে। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ দশমিক ১ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। একই সময়ে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ২০২৬ সালে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ২০২৭ সালে ৪ দশমিক ১ শতাংশে নামতে পারে।
আইএমএফের মূল্যায়নে যুদ্ধজনিত নেতিবাচক সরবরাহ অভিঘাত বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি কমার গতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। বিশেষ করে জ্বালানি আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলো বেশি চাপের মুখে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের জন্য এ পরিস্থিতি আরও জটিল। একদিকে জ্বালানি ও আমদানিনির্ভর উৎপাদনব্যবস্থার ব্যয় বৃদ্ধির ঝুঁকি, অন্যদিকে দুর্বল বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথ সংকুচিত করতে পারে।
সব মিলিয়ে আইএমএফের নতুন পূর্বাভাস বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির বিপরীতমুখী চাপের আশঙ্কা সামনে এনেছে। এই ঝুঁকি কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা নির্ভর করবে আগামী মাসগুলোতে জ্বালানির দাম, পণ্য সরবরাহ, বিনিয়োগ পরিস্থিতি এবং সরকারের অর্থনৈতিক নীতির কার্যকারিতার ওপর।















