ঢাকা,  শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, কার্তিক ৭ ১৪৩৩

কৃষি থেকে বন্দর, পাঁচ খাতে ডাচ প্রযুক্তি চায় বাংলাদেশ

দেশ ও প্রবৃদ্ধি

ডিএসজে প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৭:১৪,১৩ অক্টোবর ২০২৬

সর্বশেষ

কৃষি থেকে বন্দর, পাঁচ খাতে ডাচ প্রযুক্তি চায় বাংলাদেশ

ছবি- বাণিজ্য মন্ত্রনালয়

কৃষি উৎপাদন বাড়ানো থেকে শুরু করে পাটশিল্পের আধুনিকায়ন, সার কারখানার সক্ষমতা বৃদ্ধি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বন্দর ব্যবস্থাপনা—অর্থনীতির পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে নেদারল্যান্ডসের প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ কাজে লাগাতে চায় বাংলাদেশ। এ লক্ষ্যে ডাচ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও গবেষণা সহযোগিতা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়ে দুই দেশের মন্ত্রী পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে নেদারল্যান্ডসের বৈদেশিক বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতাবিষয়ক মন্ত্রী স্যোয়ার্ড স্যোয়ার্ডসমার সঙ্গে বৈঠক করেন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।

বৈঠকে বাংলাদেশের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং শিল্পের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা উন্নয়নের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এগিয়ে নিতে নেদারল্যান্ডসের সহযোগিতা চায় বাংলাদেশ।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, নেদারল্যান্ডস বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগী। দুই দেশের সম্পর্ককে প্রচলিত পণ্য বাণিজ্যের বাইরে প্রযুক্তি হস্তান্তর, শিল্পায়ন ও টেকসই বিনিয়োগের মাধ্যমে শক্তিশালী অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে রূপ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতার সঙ্গে ডাচ প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতার সমন্বয় ঘটানো গেলে উভয় দেশ লাভবান হবে।

কৃষি খাতে সহযোগিতার আলোচনায় উন্নত বীজ, গবেষণা, উৎপাদনশীলতা এবং খাদ্য প্রক্রিয়াকরণের বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পায়। নেদারল্যান্ডসের আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি ব্যবহার করে আলু ও অন্যান্য সবজির উৎপাদন ও গুণগত মান বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী কৃষিপণ্য উৎপাদনের সম্ভাবনা তুলে ধরেন বাণিজ্যমন্ত্রী।

বিশেষ করে সিলেটসহ সম্ভাবনাময় অঞ্চলে বিশেষায়িত সবজি চাষ সম্প্রসারণ, কৃষকদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও পরিবহনে আধুনিক সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে আলোচনা হয়।

বাংলাদেশের কৃষিপণ্য রপ্তানি বাড়ানোর ক্ষেত্রে শুধু উৎপাদন বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক মান, নিরাপদ সংরক্ষণ, পরিবহন এবং ক্রেতা দেশের বিধিবিধান মেনে পণ্য সরবরাহের সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে ডাচ প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে।

পাটশিল্পের আধুনিকায়নেও নেদারল্যান্ডসের সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ। উন্নত পাটবীজ উদ্ভাবন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, যৌথ গবেষণাগার স্থাপন এবং বহুমুখী পাটপণ্য তৈরিতে প্রযুক্তিগত সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বিশ্ববাজারে পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা বাড়ায় বাংলাদেশের পাটশিল্পের সামনে নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে পরিবেশবান্ধব মোড়ক ও মিশ্র তন্তুর কাপড় উৎপাদনের মাধ্যমে প্রচলিত পাটপণ্যের বাইরে অধিক মূল্য সংযোজনের সম্ভাবনা রয়েছে।

শিল্প খাতে সহযোগিতার আলোচনায় দেশের বিদ্যমান সার কারখানাগুলোর আধুনিকায়নের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। ডাচ প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান স্ট্যামিকার্বনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সার কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়ে দুই মন্ত্রী আলোচনা করেন।

এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে কারখানার প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও উৎপাদন সক্ষমতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট প্রকল্প, বিনিয়োগের পরিমাণ কিংবা বাস্তবায়নের সময়সূচি বৈঠকের বিবরণে উল্লেখ করা হয়নি।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতেও সহযোগিতা সম্প্রসারণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে দুই দেশ। সৌরবিদ্যুৎসহ পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উৎপাদন, প্রযুক্তি বিনিময় এবং বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।

বন্দর ও সামুদ্রিক পরিবহন খাতে বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে ডাচ প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণের বিষয়টিও বৈঠকে উঠে আসে। বিশেষ করে লালদিয়া টার্মিনালসহ বন্দর অবকাঠামো উন্নয়ন, আধুনিক পণ্য পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে মতবিনিময় করেন দুই মন্ত্রী।

বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে বন্দর ব্যবস্থাপনার দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ। পণ্য খালাস ও পরিবহনে সময় এবং ব্যয় কমানো গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়তে পারে। ফলে বন্দর অবকাঠামোয় প্রযুক্তিগত উন্নয়ন সরাসরি রপ্তানি খাতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

নদী ও খাল খনন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনায় নেদারল্যান্ডসের গবেষণা সংস্থা ডেল্টারেসের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

এদিকে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি সুবিধা ধরে রাখার বিষয়টি বৈঠকে গুরুত্ব পায়। 

বাণিজ্যমন্ত্রী ইইউর সঙ্গে প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির কারিগরি আলোচনা এগিয়ে নেওয়া এবং শুল্কবহির্ভূত বাধা দূর করতে নেদারল্যান্ডসের সহযোগিতা চান।

ইউরোপ বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি বাজার। এলডিসি উত্তরণের পর বিদ্যমান বাণিজ্য সুবিধায় পরিবর্তনের সম্ভাবনা থাকায় দীর্ঘমেয়াদি বাজার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে ইইউর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু বা চুক্তি সম্পাদনের কোনো সময়সূচি বৈঠকে ঘোষণা করা হয়নি।

নেদারল্যান্ডসের মন্ত্রী বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের সম্ভাবনাময় খাতগুলোতে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি কৃষিপ্রযুক্তি, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, শিল্পের আধুনিকায়ন, সামুদ্রিক পরিবহন ও পানি ব্যবস্থাপনায় ডাচ অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেন।

বৈঠকে মেধাস্বত্ব ও পেটেন্ট সুরক্ষা, শুল্ক প্রক্রিয়ার আধুনিকায়ন, ব্যবসার প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আলোচনায় দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়েও মতবিনিময় হয়। পাশাপাশি তরুণ ও নারী কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন দুই মন্ত্রী।

বৈঠকে বাণিজ্যসচিব মো. আতাউর রহমান খান, বাংলাদেশে নিযুক্ত নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত জোরিস ভ্যান বোমেল এবং দুই দেশের প্রতিনিধিদলের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

সর্বশেষ