ঢাকা,  মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, কার্তিক ১২ ১৪৩৩

মিউচুয়াল ফান্ডে কারসাজির নেপথ্যে কে এই আশরাফুল

অন্দরমহল

আলতাফ মাসুদ

প্রকাশিত: ০২:২৩,২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপডেট: ০০:৪১,২৭ অক্টোবর ২০২৬

মিউচুয়াল ফান্ডে কারসাজির নেপথ্যে কে এই আশরাফুল

ডিএসজে কোলাজ

লোকসানে থাকা বিনিয়োগ পোর্টফোলিও, কমতে থাকা নিট সম্পদমূল্য ও নিম্নমুখী পুঁজিবাজার—কোনোটিই থামাতে পারেনি এক্সিম ব্যাংক ফার্স্টসহ চারটি মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিটদরের উত্থান। মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে এই লোকসানি ফান্ডগুলোর দর বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি, আর এর পেছনে বারবার উঠে এসেছে একটি নাম—মো. আশরাফুল ইসলাম।

ফেসবুকে সরব এই ব্যক্তি এক্সিম ফার্স্ট, পিএফ ফার্স্ট, এমবিএল ফার্স্ট ও ফার্স্ট প্রাইম—এই চার মিউচুয়াল ফান্ড কেনার পক্ষে চালিয়ে গেছেন লাগাতার প্রচারণা। নিজস্ব পেইড গ্রুপে সদস্যদের দেওয়া হয়েছে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা: কোন ফান্ড, কোন দরে, কবে কিনতে হবে।

ফল মিলেছে হাতেনাতে। মাত্র ২১ কার্যদিবসে এক্সিম ব্যাংক ফার্স্টের দর বেড়েছে ১০২ শতাংশের বেশি। পিএফ ফার্স্ট দুই মাসে বেড়েছে ১১০ শতাংশ—এখন বিক্রি হচ্ছে ইউনিটপ্রতি প্রকৃত সম্পদমূল্যের দ্বিগুণেরও বেশি দামে। আড়াই মাসেরও কম সময়ে এমবিএল ফার্স্টের দর বেড়েছে ১৪৭ শতাংশ, আর ফার্স্ট প্রাইম ফাইন্যান্স ফার্স্ট বিক্রি হচ্ছে প্রকৃত মূল্যের প্রায় চার গুণ দামে। এই চারটির মধ্যে এমবিএল ফার্স্ট বাদে বাকি তিনটিই এখনো লোকসানে।

আশরাফুলের পরিচয় নিয়ে কৌতূহল বাড়ে আরেকটি তথ্যে। ডিএসজেকে তিনি নিজেই দাবি করেছেন, উত্তরায় এরিনা সিকিউরিটিজসহ দুটি ব্রোকারেজ হাউসের শাখা তাঁর নিয়ন্ত্রণে। হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামে তাঁর পেইড গ্রাহকসংখ্যা ২ হাজার ৭০০ ছাড়িয়েছে। তার নিয়ন্ত্রনে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার ফান্ড রয়েছে বলেও দাবি করেছেন।

২০১৮ সালে পুঁজিবাজারে পা রাখা আশরাফুলের আগের ফেসবুক পেজ (২৬ হাজার অনুসারী) বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর গত ১ সেপ্টেম্বর নতুন পেজ খোলেন তিনি, যেখানে এরই মধ্যে যোগ দিয়েছেন ১১ হাজার অনুসারী। এই পেজ ও পেইড গ্রুপকে হাতিয়ার করেই তিনি ফান্ডগুলোর দাম বাড়িয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (রিসার্চ অ্যানালিস্ট) বিধিমালা, ২০১৩ অনুযায়ী যথাযথ নিবন্ধন ছাড়া বিনিয়োগ পরামর্শ প্রকাশ করা অবৈধ। বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের অনিয়ন্ত্রিত পরামর্শদাতাদের প্রচারণা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ভুল সিদ্ধান্তে প্ররোচিত করে ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

এদিকে ডিএসইর তদন্ত প্রতিবেদনে মিউচুয়াল ফান্ডের কারসাজি নিয়ে আরও চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে। এক্সিম ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিটের অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি নিয়ে ডিএসইর তদন্ত প্রতিবেদনে সম্পর্কযুক্ত হিসাবে পাল্টাপাল্টি লেনদেন, অর্থ ছাড়াই বড় কেনার সুযোগ এবং কয়েকটি হিসাবে বিপুল ইউনিট কেনার ঘটনা চিহ্নিত হয়েছে।

ডিএসইর তদন্তে দেখা যায়, গত ৫ জুলাই থেকে ২ আগস্ট—এই সময়ে এক্সিম ফার্স্টের শীর্ষ ক্রেতা-বিক্রেতার বড় অংশই ছিল এরিনা সিকিউরিটিজের গ্রাহক, যে প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণের দাবিদার আশরাফুল নিজেই। শীর্ষ সাত ক্রেতার সবাই ছিলেন তাঁর প্রভাববলয়ে, আর আশরাফুল নিজে ছিলেন ফান্ডটির ষষ্ঠ বৃহত্তম ক্রেতা ও সপ্তম বৃহত্তম বিক্রেতা।

সংখ্যায় এই চিত্র স্পষ্ট। এরিনা সিকিউরিটিজে এসআর ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি হিসাবে ৬৮ লাখ ৩৬ হাজার ৮০ ইউনিট কেনা ও ১৯ লাখ ৯৪ হাজার ১৬৮ ইউনিট বিক্রি। একই শাখায় আফরোজা আক্তার আজমিনের হিসাবে ২৮ লাখ ৯২ হাজার ৬০০ ইউনিট কেনা ও সমপরিমাণ বিক্রি। রহমান ইকুইটি ম্যানেজমেন্টে থাকা আরেকটি এসআর ইন্টারন্যাশনাল হিসাবে ১৯ লাখ ৯০ হাজার ৬৫৯ ইউনিটের অভিন্ন কেনাবেচা।

আরও চমকপ্রদ তথ্য—এই দুই গ্রাহকের নগদ হিসাবে টাকাই ছিল না, তবু প্রায় ১৭ লাখ টাকার ইউনিট কেনার সুযোগ পেয়েছেন তাঁরা এরিনা সিকিউরিটিজ থেকে। প্রয়োজনীয় মার্জিন চুক্তি ছাড়াই এই সুবিধা দেওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বিএসইসির মার্জিন বিধিমালা, ২০২৫-এর বিধি ৬ লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে তদন্ত দল।

একই সময়ে ভিন্ন এক অনিয়মও ধরা পড়ে। ১৩ জুলাই গ্রিন ডেল্টা সিকিউরিটিজের একই লেনদেন টার্মিনাল থেকে অ্যাবাসী ইনভেস্টমেন্টস-সংশ্লিষ্ট তিনটি বিও হিসাব পরস্পরের প্রতিপক্ষ সেজে তিন দফায় কেনাবেচা করে মোট ১ লাখ ১৯ হাজার ইউনিট—বাজারে সক্রিয়তার একটি কৃত্রিম চিত্র তৈরি করে, যা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অধ্যাদেশ, ১৯৬৯-এর ধারা ১৭(ই)(২)-এর সরাসরি লঙ্ঘন বলে চিহ্নিত হয়েছে প্রতিবেদনে।

‘বড় গেম হবে’—ফেসবুকেই নির্দিষ্ট দরের ইঙ্গিত

আশরাফুলের ফেসবুক পেজের বার্তাগুলো নিছক আলোচনা ছিল না—ছিল সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা। একটি বার্তায় অনুসারীদের পিএফ ফার্স্ট ও আইসিবি সোনালী–১ কেনার পরামর্শ, আরেকটিতে এক্সিম ফার্স্ট, এমবিএল ফার্স্ট ও ফার্স্ট প্রাইমের দর বাড়ার প্রত্যাশা। পিএফ ফার্স্ট ১৮ টাকার নিচে আর এমবিএল ফার্স্ট সাড়ে ১০ টাকার নিচে কিনতে বলা হয় নির্দিষ্টভাবে।

গতকাল এক অনুসারী এমবিএল ফান্ড আরও কিনবেন কি না জিজ্ঞেস করলে আশরাফুলের জবাব ছিল, ‘এটা বড় গেম হবে ইনশাআল্লাহ’। তাঁর পেইড গ্রুপে অর্থের বিনিময়ে বাজার বিশ্লেষণ, শেয়ারতালিকা ও ফোনে পরামর্শের সেবা দেওয়া হয়—বছরে ৫ হাজার টাকা, ছাড়ে ২ হাজার ৫০০ টাকা। গ্রুপে তাঁর নির্দেশ ছিল স্পষ্ট: ‘যারা আমাদের এখানে অ্যাকাউন্ট খুলেছেন তারা দ্রুত টাকা জমা দেন... নেক্সট গেম হবে মালিক পক্ষসহ ১০ গুণ আপ করার মতো কোনো শেয়ার’।

নিবন্ধিত রিসার্চ অ্যানালিস্ট ছাড়া বিনিয়োগ পরামর্শ প্রকাশ আইনত অবৈধ কি না—এই প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেননি আশরাফুল। বরং তিনি ডিএসজেকে বলেন, মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের সম্ভাবনা আছে, আর বিএসইসি চেয়ারম্যানও এই খাতের উন্নয়নের কথা বলেছেন।

‘সবাই মুনাফায়’—আশরাফুলের সাফাই, নিয়ন্ত্রকের হুঁশিয়ারি

আশরাফুল ডিএসজেকে দাবি করেন, কয়েক মাস আগে বেশির ভাগ মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট সম্পদমূল্যের অর্ধেক দরে বিক্রি হতো, যা তৈরি করেছিল বিনিয়োগের সুযোগ। নিজের পেইড গ্রুপের কথা স্বীকার করে বলেন, আড়াই হাজারের বেশি গ্রাহক সবাই ভালো মুনাফায় আছেন, আর উত্তরার দুই ব্রোকারেজ শাখার নিয়ন্ত্রণও তাঁর হাতে।

বিএসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবুল কালাম ডিএসজেকে জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অননুমোদিত বিনিয়োগ পরামর্শের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে এবং কয়েকটি ফান্ডের অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি ও লেনদেন খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

নীরবে বেরিয়ে গেলেন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা

এই কারসাজির আসল সুবিধাভোগী কারা—তার একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত মেলে মালিকানার পরিবর্তনে। গত জুনে যে ইউনিট প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা কিনেছিলেন গড়ে ৩ টাকা ৪০ থেকে ৩ টাকা ৫০ পয়সায়, সেই একই ইউনিট পরে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি হয়েছে ৬ টাকা ১০ থেকে ৬ টাকা ৯০ পয়সায়—প্রায় দ্বিগুণ দামে।

জুন শেষে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ছিল এক্সিম ফার্স্টের ২৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ ইউনিট, জুলাই শেষে তা বেড়ে হয় ৪০ দশমিক ২৬ শতাংশ। কিন্তু আগস্টে চিত্র পাল্টে যায়—জুলাই শেষের ৫ কোটি ৭৬ লাখ ৭৫ হাজার ইউনিট থেকে আগস্ট শেষে প্রাতিষ্ঠানিক মালিকানা নেমে আসে ২ কোটি ৭৭ লাখ ৫ হাজার ৭৭৬ ইউনিটে—এক মাসেই হাতছাড়া হয় ২ কোটি ৯৯ লাখ ৬৯ হাজার ২২৪ ইউনিট। বিপরীতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মালিকানা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৮ দশমিক ৬৯ শতাংশে। পিএফ ফার্স্ট, এমবিএল ফার্স্ট ও ফার্স্ট প্রাইমেও একই সময়ে দেখা গেছে প্রাতিষ্ঠানিক অংশ কমার প্রবণতা।

সংখ্যার আড়ালে বাস্তবতা: লোকসানেই ডুবে আছে ফান্ড

দরবৃদ্ধির এই হইচইয়ের বিপরীতে ফান্ডের প্রকৃত চিত্র ভিন্ন কথা বলে। এক্সিম ফার্স্টের ৩১ মার্চের পোর্টফোলিও অনুযায়ী ৩৩টি কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ ছিল ১৩১ কোটি ৬২ লাখ টাকার। সেই একই শেয়ারসংখ্যা ধরে ২০ সেপ্টেম্বরের বাজারদরে হিসাব করলে মূল্য দাঁড়ায় মাত্র ৭৯ কোটি ২২ লাখ টাকা—অর্থাৎ ঘাটতি ৫২ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ৩৩টি শেয়ারের মধ্যে ৩১টিতেই এখন লোকসান।