ঢাকা,  রোববার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, কার্তিক ১০ ১৪৩৩

সরকারি ঋণে ৩২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি, বেসরকারি ৫ শতাংশের নিচে

দেশ ও প্রবৃদ্ধি

ডিএসজে প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৩:৪৩,১২ অক্টোবর ২০২৬

সরকারি ঋণে ৩২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি, বেসরকারি ৫ শতাংশের নিচে

ডিএসজে

ব্যাংক খাতে সরকারি ও বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধিতে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে। গত আগস্টে সরকারি খাতে ঋণ বেড়েছে ৩২ দশমিক ৪৫ শতাংশ, বিপরীতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমেছে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে। একই সময়ে ব্যাংকে আমানত বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকে অর্থের জোগান বাড়লেও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সেই অনুপাতে বাড়ছে না।

সোমবার (১২ অক্টোবর) প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সেপ্টেম্বর মাসের ‘ইকোনমিক আপডেট অ্যান্ড আউটলুক’ প্রতিবেদনে অর্থনীতির এই বিপরীতমুখী চিত্র উঠে এসেছে।

জিইডির তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট শেষে সরকারি খাতে ব্যাংকঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে এ খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩২ দশমিক ৪৫ শতাংশ। গত বছরের একই সময়ে সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৪ দশমিক ৮১ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সরকারি খাতে ঋণ বৃদ্ধির হার দ্বিগুণের বেশি হয়েছে।

অন্যদিকে বেসরকারি খাতে ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এ খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি গত বছরের আগস্টের ৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ হয়েছে। এক বছরে প্রবৃদ্ধির হার কমেছে ১ দশমিক ৬০ শতাংশীয় পয়েন্ট।

হিসাব অনুযায়ী, আগস্টে সরকারি ও বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ২৭ দশমিক ৭০ শতাংশীয় পয়েন্টে। সরকারি খাতে ঋণ বৃদ্ধির হার বেসরকারি খাতের প্রায় ৬ দশমিক ৮৩ গুণ। তবে ঋণের মোট স্থিতির হিসাবে এখনো বেসরকারি খাতের পরিমাণই বেশি।

সরকারি ঋণের দ্রুত সম্প্রসারণ বেসরকারি খাতের অর্থায়নে চাপ তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছে জিইডি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের বিপুল ঋণ গ্রহণ ব্যাংকগুলোর বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়ার সুযোগ সীমিত করতে পারে। অর্থনীতিতে এ পরিস্থিতি ‘ক্রাউডিং আউট’ নামে পরিচিত।

তবে বেসরকারি ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ার পেছনে শুধু সরকারি ঋণ বৃদ্ধিই দায়ী নয়। উচ্চ সুদহার, ব্যবসায়িক আস্থা পুনরুদ্ধারে ধীরগতি এবং ঋণঝুঁকি বেড়ে যাওয়াকেও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে জিইডি। এসব পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে স্বল্প মেয়াদে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি দুর্বল থাকতে পারে বলে প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

এদিকে ব্যাংক খাতে আমানত বৃদ্ধির চিত্র তুলনামূলক ইতিবাচক। আগস্ট শেষে ব্যাংকগুলোর মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৩১ হাজার ১০০ কোটি টাকার বেশি। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় আমানত বেড়েছে ১১ দশমিক ৯৬ শতাংশ। গত বছরের আগস্টে আমানত বৃদ্ধির হার ছিল ১০ দশমিক ০১ শতাংশ।

জিইডির মূল্যায়নে, আমানত বৃদ্ধির গতি বাড়া ব্যাংক খাতে তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি এবং আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দেয়। তবে আমানতের প্রবৃদ্ধির তুলনায় বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি অনেক কম থাকায় ব্যাংক খাতে অর্থের জোগান উৎপাদনশীল বেসরকারি বিনিয়োগে প্রত্যাশিত হারে প্রবাহিত হচ্ছে না।

প্রতিবেদনে ঋণপ্রবাহ পুনরুদ্ধারে অর্থায়নের ব্যয় কমানো, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা এবং ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জিইডির মতে, সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে আমানতের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি বেসরকারি ঋণ সম্প্রসারণে সহায়ক হতে পারে।

ঋণপ্রবাহের এই বৈপরীত্যের পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আদায়েও বড় ঘাটতি রয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮১ হাজার ৫৩ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ৫৫ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা। ফলে জুলাই-আগস্টে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা।

লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রাজস্ব আদায়ের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ। শুধু আগস্টে ৪২ হাজার ১৭২ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ২৯ হাজার ৩০১ কোটি টাকা। ওই মাসে ঘাটতি হয়েছে ১২ হাজার ৮৭১ কোটি টাকা। তবে আগের বছরের আগস্টের তুলনায় রাজস্ব আদায় বেড়েছে ৭ দশমিক ৬০ শতাংশ।

সরকারের উন্নয়ন ব্যয়েও ধীরগতি রয়েছে। অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ব্যয় হয়েছে ৫ হাজার ৭০৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে ব্যয় হয়েছিল ৫ হাজার ৭১৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ব্যয় কমেছে ৫ কোটি ১৩ লাখ টাকা।

এ সময়ে এডিপি বাস্তবায়নের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ১ দশমিক ৮৫ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২ দশমিক ৩৯ শতাংশ। ফলে সরকারি খাতে ব্যাংকঋণ দ্রুত বাড়লেও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের গতিতে একই ধরনের অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। অবশ্য সরকারি ঋণের কতটা উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে, তা জিইডির আলোচ্য তথ্য থেকে নির্ধারণ করা যায় না।

অর্থনীতির বৈদেশিক খাতে কিছু ইতিবাচক প্রবণতা রয়েছে। আগস্টে দেশে প্রবাসী আয় এসেছে ২৯৬ কোটি ৭৫ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ২২ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। একই সময়ে মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ৩৭ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আইএমএফের বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ ছিল ৩২ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার।

তবে রপ্তানি আয়ে দুর্বলতা দেখা গেছে। আগস্টে আগের মাসের তুলনায় মোট রপ্তানি আয় ৬ দশমিক ৩ শতাংশ কমে ৪৪২ কোটি ৯৪ লাখ ডলারে নেমেছে। তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে ৭ দশমিক ১ শতাংশ এবং অন্যান্য পণ্যের রপ্তানি আয় কমেছে ২ দশমিক ৪ শতাংশ।

মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ রয়েছে। আগস্টে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ, যা জুলাইয়ে ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ২২ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ হয়েছে।

ফলে আগস্টে মূল্যস্ফীতি মজুরি বৃদ্ধির চেয়ে শূন্য দশমিক ২১ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি ছিল। খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে ৭ দশমিক ০২ শতাংশ হলেও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ হয়েছে।

জিইডির প্রতিবেদনে বেসরকারি ঋণপ্রবাহের পুনরুদ্ধারকে আগামী দিনের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সংস্থাটির মতে, ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধিকে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে কাজে লাগাতে অর্থায়নের ব্যয়, ব্যবসায়িক আস্থা এবং ব্যাংকগুলোর ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় উন্নতি প্রয়োজন।