ডিএসজে কোলাজ
দেশের ব্যাংক খাত পুনর্গঠন ও মূলধন ঘাটতি পূরণে আগামী পাঁচ থেকে আট বছর প্রতিবছর প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। এই বিপুল অর্থের সংস্থানে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী ও বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের সহায়তা চাইছে সরকার। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক অর্থ করপোরেশন (আইএফসি) ব্যাংকের মূলধন পুনর্গঠনে সহায়তার আগ্রহ দেখিয়েছে।
সোমবার (১২ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভার ফাঁকে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তথ্য বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস)।
অর্থমন্ত্রীর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ব্যাংক খাত পুনর্গঠনে পাঁচ বছরে প্রায় ৮০ হাজার কোটি এবং আট বছরে ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে। সরকার প্রয়োজনীয় তহবিল বরাদ্দের ব্যবস্থা করলেও শুধু সরকারি অর্থায়নে এই চাহিদা পূরণ করা কঠিন।
এ কারণে আইএফসির পাশাপাশি বেসরকারি ইকুইটি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকেও অর্থায়নের চেষ্টা চলছে। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকেও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে।
ব্যাংক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমানতকারীদের মধ্যে আগে যে উদ্বেগ ছিল, তা অনেকটাই কেটে গেছে। ব্যাংকে আমানত ফিরছে এবং নিট আমানত বাড়ছে। পুঁজিবাজারেও ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নতুন করে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করছেন।
এদিকে আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির সংস্কার শর্ত নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, সংস্কারের মৌলিক লক্ষ্য নিয়ে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের বড় ধরনের মতপার্থক্য নেই। তবে কিছু সংস্কার বাস্তবায়নের সময় ও পর্যায় নিয়ে আলোচনা চলছে। সরকার একসঙ্গে অনেকগুলো সংস্কার বাস্তবায়নের পরিবর্তে অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় পর্যায়ক্রমে এগোতে চায়।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের কান্ট্রি পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্ক চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। এর মাধ্যমে আগামী দিনের উন্নয়ন সহযোগিতা ও অর্থায়নের একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরি হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে বাড়তি ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়েছে। এ চাপ মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংকের নিয়মিত সহায়তার পাশাপাশি অতিরিক্ত ঋণসহায়তা প্রত্যাশা করছে সরকার। আগামী দুই থেকে তিন বছরের জন্য একটি আর্থিক সুরক্ষাবলয় তৈরিতেও বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতা চাওয়া হচ্ছে।
রাজস্ব আহরণ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী জানান, সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে আয়কর আদায়ে প্রায় ১৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। সময়ের সঙ্গে কর-জিডিপি অনুপাতও বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানিয়েছেন, সরকারের অর্থনৈতিক সংস্কার পরিকল্পনার মৌলিক লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের নীতিগত ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ এবং শিল্পায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এই পরিকল্পনার প্রধান অগ্রাধিকার।
ড. তিতুমীর বলেন, সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশলের সঙ্গে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সংস্কার প্রস্তাবের বেশ কিছু বিষয়ে মিল রয়েছে। তবে সংস্কার কর্মসূচির সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নের মূল দায়িত্ব সরকারের হাতেই থাকবে। দেশের
বাস্তবতা ও নিজস্ব অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
বন্ধ কলকারখানা চালু এবং নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়াতে বিশেষ অর্থায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনে আইএফসিসহ বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে আলোচনা চলছে।
সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণে ফ্যামিলি কার্ডের মতো কর্মসূচির পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং অবকাঠামো উন্নয়নে আন্তর্জাতিক অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশে বিনিয়োগ সম্প্রসারণের বিষয়ে থাইল্যান্ডের ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে। ড. তিতুমীর জানান, কৃষিজাত পণ্য, ফল, দুগ্ধজাত পণ্য ও হালাল খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে থাই বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ দেখিয়েছেন। চট্টগ্রাম ও থাইল্যান্ডের রেনং বন্দরের মধ্যে সামুদ্রিক যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে আসিয়ানের সদস্যদেশগুলোর সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি এবং আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের (আরসিইপি) সুযোগ কাজে লাগানোর ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া চীন, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যোগাযোগের পাশাপাশি বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ চলছে।
ব্যাংককের কুইন সিরিকিত জাতীয় সম্মেলন কেন্দ্রে ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হচ্ছে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভা। অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. তিতুমীর, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, অর্থসচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব।
সভায় বাংলাদেশের প্রধান অগ্রাধিকার হচ্ছে ব্যাংক ও রাজস্ব খাতের সংস্কার, উন্নয়ন অর্থায়ন এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ সম্প্রসারণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা।















