ঢাকা,  রোববার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, কার্তিক ১০ ১৪৩৩

যুক্তরাষ্ট্র-তুরস্কে পোশাক রপ্তানির উল্লম্ফন, জার্মানি-ফ্রান্সে পতন

দেশ ও প্রবৃদ্ধি

ডিএসজে প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২০:৩২,১০ অক্টোবর ২০২৬

আপডেট: ১৯:৩১,১১ অক্টোবর ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র-তুরস্কে পোশাক রপ্তানির উল্লম্ফন, জার্মানি-ফ্রান্সে পতন

প্রতীকী ছবি (এআই দ্বারা তৈরী)

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ৬ দশমিক ১০ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৫৭ কোটি ৮৬ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, নেদারল্যান্ডস ও তুরস্কের বাজারে রপ্তানি বৃদ্ধির সুবাদে সামগ্রিক আয় বাড়লেও ইউরোপের কয়েকটি বড় বাজারে বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে। জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি ও ডেনমার্কে রপ্তানি কমেছে। এমনকি চীন ও ভারতের বাজারেও বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আশানুরূপ বাড়েনি।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের (বিএভি) প্রকাশিত দেশভিত্তিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে এ চিত্র পাওয়া গেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসের তথ্যের সঙ্গে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনা করা হয়েছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছিল ৯৯৭ কোটি ৪ লাখ ডলার। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫৭ কোটি ৮৬ লাখ ডলারে। অর্থাৎ এক বছরে রপ্তানি আয় বেড়েছে প্রায় ৬০ কোটি ৮১ লাখ ডলার।

রপ্তানির প্রধান গন্তব্য হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) অবস্থান অক্ষুণ্ণ রয়েছে। জুলাই-সেপ্টেম্বরে ইইউর ২৭ দেশে পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৪৯০ কোটি ৪০ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেশি। তবে মোট পোশাক রপ্তানিতে ইইউর অংশ ৪৭ দশমিক ৬০ শতাংশ থেকে কমে ৪৬ দশমিক ৩৬ শতাংশে নেমেছে। অর্থাৎ ইউরোপে রপ্তানি বাড়লেও অন্যান্য বাজারের তুলনায় প্রবৃদ্ধি কম হওয়ায় সামগ্রিক রপ্তানিতে অঞ্চলটির অংশীদারত্ব সংকুচিত হয়েছে।

ইউরোপের বৃহত্তম একক বাজার জার্মানিতে রপ্তানি প্রায় স্থবির। দেশটিতে গত অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ১১২ কোটি ৪৭ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছিল। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা সামান্য কমে ১১২ কোটি ৩০ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ১৫ শতাংশ।

ফ্রান্সে রপ্তানি ৪৭ কোটি ২৬ লাখ ডলার থেকে কমে ৪৪ কোটি ৯৪ লাখ ডলারে নেমেছে। কমেছে ৪ দশমিক ৯১ শতাংশ। ইতালিতে রপ্তানি ৫ দশমিক ৮২ শতাংশ কমে ৩১ কোটি ৬৩ লাখ ডলারে এবং ডেনমার্কে ১৫ দশমিক ৪০ শতাংশ কমে ২০ কোটি ১৫ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। পর্তুগালেও রপ্তানি কমেছে ১৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ।

তবে ইউরোপের সব বাজারে মন্দা নেই। স্পেনে রপ্তানি ১৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ বেড়ে ১১৪ কোটি ৮৫ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। নেদারল্যান্ডসে ৯ দশমিক ০২ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৫৯ কোটি ৭৫ লাখ ডলার। পোল্যান্ডে ৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ বেড়ে ৪০ কোটি ১৯ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। সুইডেনে প্রবৃদ্ধি ১৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ। তুলনামূলক ছোট বাজার রোমানিয়ায় রপ্তানি বেড়েছে ৬০ দশমিক ০৩ শতাংশ।

এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির গতি একরকম নয়। কয়েকটি দেশে রপ্তানি কমলেও স্পেন ও নেদারল্যান্ডসের মতো বাজারের প্রবৃদ্ধি সামগ্রিক আয় ধরে রাখতে সহায়তা করেছে। 

অন্যদিকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে দেশটিতে ২২২ কোটি ৯ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে রপ্তানি ছিল ২০১ কোটি ১২ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরে আয় বেড়েছে প্রায় ২০ কোটি ৯৭ লাখ ডলার বা ১০ দশমিক ৪০ শতাংশ।

মোট পোশাক রপ্তানিতে যুক্তরাষ্ট্রের অংশও ২০ দশমিক ১৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০ দশমিক ৯৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। দেশের সামগ্রিক পোশাক রপ্তানি প্রবৃদ্ধির তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবৃদ্ধি বেশি হওয়ায় বাজারটির গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

যুক্তরাজ্যে রপ্তানি ৫ দশমিক ৯৪ শতাংশ বেড়ে ১২৯ কোটি ২১ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। তবে মোট রপ্তানিতে দেশটির অংশ ১২ দশমিক ২৩ শতাংশ থেকে সামান্য কমে ১২ দশমিক ২১ শতাংশ হয়েছে। কানাডায় রপ্তানি ৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪ কোটি ৯৭ লাখ ডলারে।

বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে কয়েকটি অপ্রচলিত বাজারে। বিশেষ করে তুরস্কে তিন মাসে রপ্তানি ৬ কোটি ৫৭ লাখ ডলার থেকে বেড়ে ১৪ কোটি ৬৬ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। প্রবৃদ্ধি ১২৩ দশমিক ১৪ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে দেশটিতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি দ্বিগুণের বেশি হয়েছে।

ব্রাজিলেও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। দেশটিতে রপ্তানি ৪১ দশমিক ৫৮ শতাংশ বেড়ে ৬ কোটি ৩১ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৮ দশমিক ৬৭ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৭ কোটি ৪৩ লাখ ডলার। মেক্সিকোতে ১৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় ৮ দশমিক ৮১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

তবে অপ্রচলিত বাজারেও প্রবৃদ্ধি সমান নয়। রাশিয়ায় রপ্তানি ২১ দশমিক ৩০ শতাংশ কমে ৩ কোটি ৭১ লাখ ডলারে নেমেছে। নিউজিল্যান্ডে কমেছে ১২ দশমিক ৪৯ শতাংশ। ভারতে রপ্তানি ৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ কমে ২০ কোটি ৫০ লাখ ডলার হয়েছে। চিলিতেও ৫ দশমিক ২০ শতাংশ কমেছে।

চীনে রপ্তানি প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। গত অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে দেশটিতে রপ্তানি হয়েছিল ৭ কোটি ১১ লাখ ডলার। এবার হয়েছে ৭ কোটি ১২ লাখ ডলার। প্রবৃদ্ধি মাত্র শূন্য দশমিক ০৯ শতাংশ।

সব মিলিয়ে অপ্রচলিত বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানি ৯ দশমিক ৪০ শতাংশ বেড়ে ১৮১ কোটি ১৯ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে এই বাজারগুলোতে রপ্তানি হয়েছিল ১৬৫ কোটি ৬৩ লাখ ডলার। মোট পোশাক রপ্তানিতে অপ্রচলিত বাজারের অংশ ১৬ দশমিক ৬১ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৭ দশমিক ১৩ শতাংশ হয়েছে।

এই প্রবণতা রপ্তানি বাজার বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিলেও বড় কয়েকটি বাজারে রপ্তানি কমে যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে। বিশেষ করে তুরস্কে দ্রুত প্রবৃদ্ধির বিপরীতে রাশিয়া ও ভারতে সংকোচন দেখাচ্ছে, নতুন বাজারের সম্ভাবনা ও ঝুঁকি দেশভেদে ভিন্ন।

পণ্যের ধরন অনুযায়ী, নিট পোশাক রপ্তানিতে তুলনামূলক বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। জুলাই-সেপ্টেম্বরে নিট পোশাক রপ্তানি ৫৫৮ কোটি ডলার থেকে বেড়ে ৫৯৬ কোটি ৩৮ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ। অন্যদিকে ওভেন পোশাক রপ্তানি ৪৩৯ কোটি ৪ লাখ ডলার থেকে বেড়ে ৪৬১ কোটি ৪৮ লাখ ডলার হয়েছে। প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ১১ শতাংশ।

ইউরোপীয় ইউনিয়নে নিট পোশাক রপ্তানি ৪ দশমিক ২৯ শতাংশ বাড়লেও ওভেন পোশাকে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ১ দশমিক ৭০ শতাংশ। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রে নিট পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ১১ দশমিক ৬১ শতাংশ এবং ওভেন পোশাক ৯ দশমিক ৬১ শতাংশ।

তবে যুক্তরাজ্যের বাজারে পণ্যভেদে বিপরীত প্রবণতা দেখা গেছে। দেশটিতে নিট পোশাক রপ্তানি ১০ শতাংশ বাড়লেও ওভেন পোশাক রপ্তানি কমেছে ২ দশমিক ২৭ শতাংশ। একইভাবে জার্মানিতে নিট পোশাকের রপ্তানি ২ দশমিক ০৮ শতাংশ বাড়লেও ওভেন পোশাকে ৪ দশমিক ১২ শতাংশ পতন হয়েছে।

সামগ্রিকভাবে অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে পোশাক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক থাকলেও বাজারভিত্তিক পরিসংখ্যান একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও কয়েকটি উদীয়মান বাজারে চাহিদা বাড়ার সুফল মিলছে, কিন্তু ইউরোপের সব বড় বাজারে একই গতি নেই। ফলে রপ্তানির এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে শুধু নতুন বাজারে প্রবেশ নয়, প্রতিষ্ঠিত বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।